উন্নয়নের রোলমডেলে লজ্জার নাম ‘বরমচাল ডাকঘর’

প্রকাশিত: ৩:০১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৬, ২০২১

উন্নয়নের রোলমডেলে লজ্জার নাম ‘বরমচাল ডাকঘর’

ফাইল ছবি


এনামুল আলম, কুলাউড়া
কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ডাকঘর। দেখলে মনে হয় যেন প্রাচীন এক পরিত্যক্ত ভবন! বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে রোলমডেল হিসেবে পরিগণিত হলেও সেই রোলমডেলের জন্য এক লজ্জার নাম ‘বরমচাল ডাকঘর’।

 

দিন বদলেছে, বদলেছে অনেক কিছু। ডিজিটালাইজেশনের যুগে ডাকঘরে এখন চিঠি আদান-প্রদান অনেক কমে আসলেও এসেছে নতুন নতুন নানা সেবা কার্যক্রম। আছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কিংবা জামানত সেবাও। এতে প্রয়োজন মেটাতে এখনও সেই ডাকঘরের দ্বারস্থ হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। কিন্তু নড়বড়ে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হয়- কখন জানি মাথায় পড়ছে ভাঙা ছাঁদ। যেকারণে এখানে কাজে আসলে ভয়ে সময় কাটে সেবা গ্রহীতাদের। আর যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের তো মৃত্যুঝুঁকির মাঝেই বসবাস।

 

দেশের ডাক বিভাগের অধিনে চিঠি, টেলিগ্রাম, মানি অর্ডার করার পুরোনো পদ্ধতির প্রয়োজন এখন অনেকটা বিলুপ্তপ্রায়। খুব কম সময়ে অধিক সহজতর উপায়ে আধুনিক বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কারণে এখন বিলুপ্ত প্রায় দেশের ডাক বিভাগের কার্যক্রম। যদিও বর্তমান আওয়ামী সরকারের পক্ষ থেকে এই অচলাবস্থা থেকে ডাক বিভাগকে আধুনিককরণ করার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু সময়োপযোগী করা হয়নি বরমচাল ডাকঘরের ভবন।

 

সরেজমিনে বরমচার ডাকঘরের ভিতরে প্রবেশের সাথে সাথে চোখে পড়ে ছাদ থেকে দেয়াল ধ্বসে পড়া খন্ড খন্ড চিত্র। কক্ষগুলোর অবস্থা নাজেহাল। কক্ষের ফ্লোরগুলোর প্লাস্টার উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে গর্তের। দেয়ালের অবস্থা আরো নাজুক। উঠে গেছে পলেস্তারা। ছাদের বিভিন্ন স্থানে ঢালাই উঠে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে জং ধরা রড। কক্ষগুলোর দরজা জানালা অনেক পুরনো হওয়ায় নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বৈদ্যুতিক ওয়ারিং একেবারে নাজুক যা বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টি হলেই পাকা ভবনের ছাদ চুয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে ২টি কক্ষে। এতে প্রয়োজনীয় চিঠিপত্র সংরক্ষণে চরম সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ডাক বিভাগের লোকজনদের।

 

এছাড়া বৃষ্টিপড়া ভেতর-বাইরের দেয়াল আবরিত সবুজ শেওলায়। ছাদ ধ্বসে পড়ার খন্ডাংশ থেকে রক্ষা করতে ডিজিটাল ডাকঘর কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত কম্পিউটারসহ ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র প্লাস্টিক কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে সেগুলো সরিয়ে কাজ সারছেন ডিজিটাল ডাকঘরের (ই-সেন্টার) পরিচালক মো. মিজানুর হোসেন খান।

 

তিনি জানান- ডিজিটাল ডাকঘরের (ই-সেন্টার) মাধ্যমে চিঠিপত্র, পার্সেল, মানিঅর্ডার, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, পোস্টাল ক্যাশ কার্ড, ডাক জীবন বীমা, সঞ্চয় ব্যাংক, পোস্টেজ ও রাজস্ব স্ট্যাম্প বিক্রিসহ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি সনদ প্রদানসহ বহুমুখী সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। বর্তমানে ১৫ জন ছাত্র-ছাত্রীকে কম্পিউটার প্রশিক্ষন দেয়া হচ্ছে।

 

দূর-দূরান্ত থেকে আসা ডাকগুলো বস্তা থেকে খুলে বিলি করার জন্য সাজাচ্ছেন ইডিডিএ হারাধণ চক্রবর্তী।

 

উপস্থিত গ্রাহকদের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপচারিতায় ব্যস্ত এস.পি.এম মো. আমিন আলী। গ্রাহকরা কেউ দাঁড়িয়ে নিজেদের চিঠি কিংবা মানি অর্ডার বুঝে নিচ্ছেন। তবে একটি দৃশ্য অবাক করার মতো। নিজেদের কাজে ব্যস্ততার মাঝেও সবার লক্ষ্য ঘরের ছাদের দিকে। কখন যে সিলিং ধ্বসে মাথার উপরে দেয়ালের খন্ডাংশ পড়ে ঠিক নাই।

 

এসময় জানতে চাইলে উপস্থিত গ্রাহক বরমচাল আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা জুন্নারা বেগম জানান, আমার সঞ্চয় আছে তবে, ডাক অফিসের যে অবস্থা তাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি। যখন-তখন ভেঙ্গে পড়তে পারে ডাকঘর। এতে অনেক প্রাণহাণী ঘটতে পারে এবং অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।

 

ডিজিটাল ডাকঘরে (ই-সেন্টার) সেবা নিতে আসা গ্রাহক শিক্ষার্থী রাজন আহমদ, তাসলিমা আক্তার, ববিতা ডিও, মিলি মারচিয়াং, রিভান্তি ধার, তানজিম আক্তার তানজি বলেন, সরকার কর্তৃক ডাকঘরের বিভিন্ন আধুনিকায়নের ফলে কম্পিউটার প্রশিক্ষন এবং ব্যাংকিং সেবাসহ বিভিন্ন সেবা আমরা এখান থেকে নিতে পারছি। যদিও দেশে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে দ্রুত যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম থাকলেও এখনো ডাকঘরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে আমরা সেবা নিতে এসে আতংকে থাকি কখন জানি বিল্ডিং ধ্বসে পড়ে। তাই, ডাকঘরটির সংস্কার প্রয়োজন।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরমচাল ডাকঘরের এস.পি.এম মো. আমিন আলী বলেন, ডাকঘরটির যাবতীয় সমস্যা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হলেও এর কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

 

ডাকঘরটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সিলেট বিভাগের ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেল মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি সিলেট ভয়েসকে জানান, ইতোমধ্যে আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরমচাল ডাকঘরকে গুরুত্ব দিয়েছি। এটা প্রজেক্ট আছে খুব শিঘ্রই কাজ শুরু হবে।

 

উল্লেখ্য, দেশের ৮ হাজার পাঁচশত ডাকঘরের কার্যক্রমকে নতুনভাবে সাজাতে বানিজ্যিক ব্যাংকিংসহ গ্রামীণ ডিজিটাল ডাকঘর (ই-সেন্টার) সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, দরিদ্র নারীদের মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিধবা ভাতা, পরিত্যাক্ত মহিলা ভাতাসহ আরও কিছু ভাতা ডাকঘর থেকে তুলার ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর