গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে জেলা ও মহানগর আ’লীগ নেতাদের সাক্ষাৎ

প্রকাশিত: ১২:৫৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৯

গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে জেলা ও মহানগর আ’লীগ নেতাদের সাক্ষাৎ

ডেস্ক প্রতিবেদন : আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ইলেকশন করতে চান, ভোট চান, সংগঠন করতে চান, নেতা হতে চান তো আগে মানুষের কাছে যান। মানুষের কী সমস্যা আছে দেখেন। মানুষের জন্য কী কী করতে পারেন করেন, তাহলে মানুষই আপনাদের সব সুযোগ করে দেবে। আপনাদের কারো কাছে গিয়ে ধরনা দিতে হবে না।

রোববার (২২ ডিসেম্বর) প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত কাউন্সিলরদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।

এ সময় অন্য জেলার পাশাপাশি নেত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান, মহানগরের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেনসহ দলীয় কিছু নেতাকর্মী।

মতবিনিময়কালে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭৫ এর ঘটনার পরে আবার আওয়ামী লীগের ওপর যে আঘাত আসল, তখন এটাই ধারণা করেছিল যে, আওয়ামী লীগ আর কখনও ক্ষমতায় যেতে পারবে না। এটাই ছিল সবার পরিকল্পনা। যাই হোক, আমাকে নিয়ে আসা হয়। আমি চেষ্টা করেছি সংগঠন গোছাতে। আপনাদের মনে আছে এই সংগঠন গোছাতে কম কষ্ট করতে হয়নি।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে দুঃখজনক হলো আমি ৮১ সালে আসলাম ৮৩ সালে একবার পার্টি ভাঙল। এই ভাঙাটা আমার জন্য খুব ক্ষতিকর ছিল। আমার দুঃখ লাগে যে যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি আমি… আমার সঙ্গে যারা যখন যোগাযোগ করেছেন, আমি বাইরে থাকতে, ইন্ডিয়াতে থাকতে বা লন্ডনে থাকতে, যে তাদের সঙ্গে কাজ করবো।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘এখানে যাতে সংগঠন করতে পারে, ১৯৭৯ সালে মুক্তি পাওয়ার পর, সবাই আওয়ামী লীগের নেতারা যখন মুক্তি পেল এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি। ৮০ সালে লন্ডনে আমার সঙ্গে দেখা করেছে… আর ৭৯ সাল থেকে ইন্ডিয়াতে যখন আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তখন সব সময় আমাকে জিজ্ঞেস করতো তখন আমি সব সময় যার কথা বলে দিতাম, তিনি যাতে দলটা চালাতে পারেন তার কিছু ব্যবস্থাও আমি করে দিয়েছিলাম।

তিনি বলেন, ‘যাদের জন্য করে দিয়েছি আমি ফিরে আসার পর তারাই আমার সঙ্গে বিট্রে করে চলে গিয়েছে। এটা হচ্ছে আমাদের দুর্ভাগ্য। সবকিছু গুছিয়ে দিলাম, তখন আওয়ামী লীগের যারাই নেতা ছিলেন সবাই আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করতেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কাকে নিয়ে কাজ করবো, এত গ্রুপিংয়ের মধ্যে কোথায় যাব।

…৮২ সালে পার্টিটা ভেঙে চলে গেলেন। ওই ভাঙনটা যদি না হতো তাহলে হয়তো আশির দশকে সরকার গঠন করতো পারতাম, নির্বাচন করে জয়ী হতে পারতাম। তখন আর এরশাদ (হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ) ওভাবে মার্শাল ল দিয়ে ওভাবে গেড়ে বসতে পারতেন না।’

তিনি বলেন, ‘তারপরও এরশাদের বিরুদ্ধে আমরা যখন আন্দোলন করি তখনও একটা ষড়যন্ত্র ছিল, এক জেনারেলের পরিবর্তে আরেক জেনারেল। আর আমার স্ট্যান্ড ছিল নো, এক জেনারেলের পরিবর্তে আরেক জেনারেল না, আমরা গণতন্ত্র চাই। আমরা নির্বাচন চাই, গণতন্ত্র চাই। এর জন্য অনেক সমালোচনা সম্মুখীন আমাকে হতে হয়েছে এটা ঠিক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকে অনেক কথা বলেছে, অনেক ষড়যন্ত্র করেছে। কিন্তু আমি আমার বাবার কাছ থেকে যেটা শিখেছি যে যেটা নীতি হিসেবে জানব, সেটা মেনে নেব। সেখানে কে কী বললো সেটা বড় কথা না। আলটেমেটলি দেখা গেছে যে, যেটা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটা ঠিক ছিল। দলের ভেতরে বাইরে সমালোচনা অনেক কিছু ছিল। ভাঙন হলো। কারণ আমি তখন কেবল আসছি। কেবল আসার পর যখন এ রকম একটা ধাক্কা খেলাম… তারপর সারা বাংলাদেশ আমাকে ঘুরতে হয়েছে, সংগঠন তৈরি করতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘দিনের পর দিন মিটিং, রাতের পর রাত সবার সঙ্গে বসে আলোচনা করে করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ সংগঠনগুলোকে নতুনভাবে তৃণমূল থেকে গড়ে তুলতে হয়েছিল। ওভাবে সংগঠন করে করে আজকে সংগঠনটা একটা পর্যাায়ে এসে গেছে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশ বেঁচে দেবে, আজান হবে না, মসজিদে উলুধ্বনি হবে। এ রকম নানা অপপ্রচার কিন্তু করা হতো। সেগুলো আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে, জবাব দিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘৮২ সালে রাজ্জাক সাহেব পার্টি ভেঙে গেল। এই যে মতিয়া আপা এখানে আছেন তার পাও ধরে ছিলেন যে আপনি পার্টিটা ভেঙে যাইয়েন না। জলিল ভাই গিয়ে পা ধরে ছিলেন যে, পার্টিটা ভেঙে যাইয়েন না। আমি নিজে বলেছিলাম যে আপনি পার্টি ভেঙে যাচ্ছেন কেন? রাজনীতি তো আপনার সঙ্গে করে আসছি। আপনি ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, আমি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ভিপি হলাম আপনি পার্টি ভাঙবেন কেন? উনি তখন বাকশাল করবেন এই বলে পার্টি ভাঙলেন। আর এই ভাঙাটা হয়ে গেল আমাদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারপরও ৯১ সালে উনি আসলেন জোটের সঙ্গে নির্বাচন করতে। তাকে দুই সিট দিতে হবে। মাদারীপুর ও শরিয়তপুরে দুইটা সিট নিলেন, আর সব জায়গা একজন করে ক্যান্ডিডেট (প্রার্থী) দাঁড় করায়ে দিয়ে, সেটা আবার কাঁচি মার্কা দিয়ে। মানে ওই কাঁচি মার্কা আওয়ামী লীগের কাঁচি কাটা করা। ২-৪ হাজার করে ভোট কেটে নিল।

তিনি বলেন, ‘যদিও আমি বলেছিলাম এখানে ওমুক দিলে জিতবে। ইলেকশন জেতা কিন্তু আলাদা। অনেকে অনেক বড় নেতা হতে পারে কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়াটা কিন্তু আলাদা। কে মানুষের কাছে বেশি যেতে পেরেছেন, কে মানুষের সবচেয়ে বেশি আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন, কে ভোট আনতে পারবেন এটা কিন্তু অঙ্কের মতো হিসাবের ব্যাপার। ইলেকশন করাটা কিন্তু একদম অঙ্কের মতো হিসাব। ওই বৈরি পরিবেশে জনগণের সমর্থন ছিল আমাদের একমাত্র শক্তি।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘জোটের মধ্যে যদি বেইমানি না হতো, নমিনেশনগুলো দিতে পারতাম তাহলে আমরা জয়ী হতে আসতে পারতাম। ভোট চলে গেল জোটে। তার মধ্যে ৩৫টি সিট জোটকে দিয়ে দেয়া হল। যাদের কোনো ভোটই নাই। নইলে আওয়ামী লীগের ভোট কখনও জামানাত বাজেয়াপ্ত হয় না। সেটাও হলো। এভাবে একটা হ য ব র ল করে করা হলো। যার জন্য আপনারা জানেন ৯১ সালে নির্বাচনের পর আমি পদত্যাগ করলাম, যে আমি করবো না।

তিনি বলেন, ‘আমার যদি স্বাধীনতাটুকু না থাকে, নমিনেশন দিয়ে যদি জিততেই না পারি তাহলে পদে থেকে লাভটা কী? আমি পদত্যাগপত্র দিয়ে দিয়েছিলাম তখন। যাই হোক আমাদের নেতাকর্মী সবাই, কবি সুফিয়া কামাল আমাকে চিঠি লিখলেন যে, না তোমার এটা ছাড়া ঠিক হবে না। আমাদের পার্টির সবাই উঠেপড়ে লাগল, যাই হোক আমি আবার দায়িত্ব নিলাম।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারপর থেকে চেষ্টা করলাম যে এবার নিজেদের মতো করে করবো। ৯৬ সালে সরকার গঠন করবো। এত বাধার পরেও আমরা আসতে পারলাম। ২০০১ সালে আসতে পারলাম না। ওই গ্যাস বিক্রি নিয়ে আমার ওপর প্রচণ্ড চাপ। আমি বললাম যে দেশের স্বার্থ বিক্রি করবো না। এটা আওয়ামী লীগের নীতি না।

তিনি আরও বলেন, ‘২০০১ সালে হারার পর কোন কোন কেন্দ্রে আমরা হেরেছি তার একটা হিসাব করে আমাদের যত পার্থী ছিল- জেতা আর হারা না, যত প্রার্থী ছিল তাদের সঙ্গে বসি। দিনের পর দিন বসি। ইউনিয়ন নেতাদের নিয়ে এসে দশটা প্রশ্ন দিয়ে, কোয়েশ্চন পেপার (প্রশ্নপত্র) নিয়ে সায়েন্টিফিক্যালি (বৈজ্ঞানিকভাবে) প্রস্তুতি নেই, যার ফলটা পেয়েছি ২০০৮ সালে। কাজেই হঠাৎ আমার সঙ্গে অনেক লোক ঘুরে বেড়ায়, আর ভাল ভাল স্লোগান দেয়, আমি বড় নেতা, আমি জিতে যাব, নির্বাচনটা কিন্তু তা নয়। এটা আমি সব নেতাদের বলি। মনোনয়ন না পেলে মন খারাপ করেন, ঘটনা সেটা না। এটা কিন্তু অঙ্কের মতো হিসাব করে বের করা যায় কার পজিশন কী। আমরা এখন কিন্তু সেটাই করি।

এবারের নির্বাচনে আমরা কিন্তু তাই করেছি।’
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একবার এমপি হয়ে গেলে পরে তার পরের বা জেতে না। কেন জেতে না। কারণ সে জনগণের আস্থাটা ধরে রাখতে পারে না।

তিনি বলেন, ‘জনগণের আস্থাটা ধরে রাখতে হবে। আপনাকে যে ভোট দিল আপনি যে এমপি হলেন- আর যদি মনে করেন এবারই হইছি বানায়ে-বুনায়ে খাইয়ে বসে থাকি। অনেক টাকা হলে জিতে আসব। সেটা কিন্তু হয় না।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘তারেক জিয়া গর্ব করে বলতো, ২ হাজার কোটি টাকা যদি সে বানাতে পারে তবে জীবনেও কেউ বিএনপিকে হারাতে পারবে না। তো ২ হাজারের জায়গায় ৫ হাজার কোটি টাকা বানায়ে কিন্তু থাকতে পারেনি। ৫ হাজার কোটি টাকার ওপর বানিয়েছে তারা। ক্ষমতায় কিন্তু থাকতে পারে নাই। তাদের দুর্নীতি, তাদের সন্ত্রাস, তাদের জঙ্গিবাদ, আওয়ামী লীগের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন।

তিনি বলেন, ‌‘দেশটার যে আওয়ামী লীগই উন্নতি করে সেটা প্রমাণিত। এটা মানুষের কাছে গেছে। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, আমরা খুব উন্নয়ন করেছি বলেই সবাই ঢেলে ভোট দেবে তা না। মানুষের চাওয়ার কোনো সীমা থাকে না। যত পাবে তত চাইবে। এটা মাথায় রাখতে হবে।… আমরা যে উন্নয়ন করে যাচ্ছি সে কথা মানুষকে বার বার বলতে হবে। এটা আপনাদের দায়িত্ব। আপনারা বিভিন্ন জেলা, বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন। এটা আপনাদের দায়িত্ব, মানুষকে বলে দিতে হবে যে আপনাদের জন্য আমরা এ কাজ করেছি। আগে ছিল না এখন হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষ সুখ পেলে দুঃখের কথা ভুলে যায়। আর সুখটা যে কারা দিল সেটাও মনে রাখতে চায় না। সেই কারণে তাদেরকে বার বার স্মরণ করাতে হবে। বলতে হবে, আজকে বাংলাদেশ যে পর্যায়ে এসেছে সেটা আওয়ামী লীগ করেছে।

তিনি আরও বলেন, ‌‌‘আমাদের দারিদ্র্যের হার আজকে ২০ ভাগে নেমেছে। আমি তো মনে করি আমরা সবাই যদি উদ্যোগ নেই- আমাদের নেতাকর্মীদের বলবো আপনাদেরও উদ্যোগ নেয়া উচিত। যে আপনার এলাকায় কয়টা লোক দরিদ্র আছে। কয়টা লোক ভূমিহীন আছে নিজেরাই খুঁজে বের করে বলেন, আমাদেরকে দেন। হিসাব বের করা দল হিসেবে আমাদের একটা কর্তব্য। আমরা করতে পারি, আমাদের দলই পারে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা তাদের ঘরবাড়ি করে দিতে, থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। সবই করে দিতে পারি। আমাদের তরফ থেকে উদ্যোগটা থাকতে হবে। তাহলে আর দরিদ্র থাকবে না। সরকার বসে সব করবে তা না, আমাদের নেতাদের যদি একটু সক্রিয় থাকে, খু্ব দ্রুত আমরা এই দারিদ্র্য বিমোচন করতে পারবো। যেটা আমি বিশ্বাস করি।’

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর