নগরে হকার পুনর্বাসন : ক্রেতাশূন্য বাজার নিয়ে চিন্তিত ব্যবসায়ীরা

প্রকাশিত: ৫:২২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৮, ২০২০

নগরে হকার পুনর্বাসন : ক্রেতাশূন্য বাজার নিয়ে চিন্তিত ব্যবসায়ীরা

মো. ফারুক মিয়া
সিলেট নগরকে হকারমুক্ত করতে তৎপর সিলেট সিটি করপোরেশন। প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে হকারদের কবল থেকে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নগরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছোটে চলেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও নগর কর্তৃপক্ষ। তবুও যখন নগরের ফুটপাত হকারমুক্ত করা সম্ভব হয়নি, তখন সিসকের এমন কর্মতৎপরতার সাথে একাত্মতা পোষন করে সিলেট মহানগর পুলিশ। শুরু হয় হকারদের পুনর্বাসন নিয়ে ভাবনা। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হলে হকারদের বসার জায়গা করে দিতে হবে। তাদেরকে পুনর্বাসনের মাধ্যমে রাস্তা থেকে সরাতে হবে। এমন চিন্তা মাথায় রেখে নগরের লাল দিঘীর পাড়ে হকার পুনর্বাসনের জায়গা বরাদ্দ করা হয়। ইতোপূর্বে সেখানে অবস্থান করছেন প্রায় ১১শ’ হকার। যাদেরকে লটারির মাধ্যমে স্থান দেওয়া হয়েছে বলে জনশ্রæতি রয়েছে।

 

জানা যায়, এখন পর্যন্ত মাত্র ১১শ’ হকারের পুনর্বাসন হলেও বাদ পড়েছেন অনেকেই। এই বাদপড়াদের তালিকায় রয়েছেন অনেক পুরনো হকার। যারা নগরের কোনো না কোনো স্থানে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা করছেন। কিন্তু লটারির মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কারণে তারা বাদ পড়ে গেছেন।

 



নগর ভবনের সামনে চা স্টল নিয়ে ব্যবসা করেন জসিম উদ্দিন ওরফে কয়েছ নামের এক হকার। তিনি জানালেন, দীর্ঘ ১৩ বছর থেকে তিনি নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে ভ্যানগাড়ি দিয়ে চা বিক্রি করছেন। হকার পুনর্বাসন করা হবে শুনে তিনিও একটি ফরম সংগ্রহ করে তা জমা দিয়েছেন। কিন্তু লটারি দোহাই দিয়ে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

 

আহবাব হোসেন নামের এক চা বিক্রেতা দীর্ঘ ১০ বছর থেকে মধুবন সুপার মার্কেটের সামনে বসে ব্যবসা করছেন। তিনিও বাদ পড়েছেন ওই লটারিতে। তিনি বলেন, আমাকে ফরম পুরন করে তা জমা দিতে বলা হয়েছে। আমি নিয়মানুসারে তা জমা দিয়েছি। কিন্তু পরে জানতে পারি আমার নামে কোন দোকান/ ভিটে বরাদ্দ হয়নি, আমি লটারিতে বাদ পড়েছি।

 

সরজমিনে নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এমন অনেক হকার এখনও সন্ধ্যা নামতেই রাস্তা জুড়ে ব্যবসা করছেন। তারা কেন পুনর্বাসনের জায়গায় যাননি সে প্রশ্নের উত্তরে তারা জানান, এখানে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে। একটি মহল তাদের পছন্দ লোকদের স্থান পাইয়ে দিয়েছে। আমরা গরীব, আমরা কোনো প্রদান করতে পারিনি বলে আমাদের স্থান দেওয়া হয়নি। বরং, লটারির দোহাই দিয়ে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

 

হকার পুনর্বাসনের স্থান লালদিঘীর পাড় ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাশূন্য বাজারে মশা মারছেন ব্যবসায়ীরা। তরীতরকারি সহ বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসলেও ক্রেতাদের দেখা নেই। সন্ধ্যার পরেও অনেকে বওনি পর্যন্ত করেননি। কেউ আবার ৫শ’ বা ৬শ’ টাকা বিক্রি করে এখন অলস সময় পার করছেন। সেখানকার হকারদের চোখে মুখে চিন্তার রেখা। এভাবে বসে থাকলে তাদের পরিবার চলবে কী করে।

 

নতুন স্থানে হকারদের ব্যবসা কেমন চলছে এমন প্রশ্নের জবাবে তারা জানান, লালদিঘীর পাড়ে যাওয়ার পর থেকেই তাদের কপালে দুর্দশা লেগেই আছে। নগদ টাকা খাটিয়ে লাভতো নেই-ই, তার মাঝে প্রতিদিনই টানতে হচ্ছে লোকসানের ঘানি। ক্রেতাশূন্য বাজার দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, সকাল থেকে বসে এখন সন্ধ্যা। অথচ, অনেকের বওনি পর্যন্ত হয়নি। কেউ আবার ৫-৬শ’ টাকা বিক্রি করতে পারলেও এই টাকায় লোকসান সংকুলান হবে না। কাঁচামাল যেগুলো আছে তাতো আর বেশিদিন ভালো রাখা যাবে না। বিক্রি হোক আর নাই হোক, মালগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। এতে করে আমাদের দ্বিগুন লোকসান গুনতে হবে। বেশিরভাগ দোকানেই রয়েছে শীতের শাক-সবজি। সেই সাথে মাছ ও শুটকিতো আছেই। শীতকে ঘীরে অনেকেই আবার গরম কাপড় নিয়েও বসে আছেন ক্রেতাদের আশায়। কিন্তু, যাতায়াতসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা না থাকায় ক্রেতারা সেখানে যেতে অনাগ্রহী। এর আগ পর্যন্ত বন্দরবাজার এলাকায় রাস্তায় বসে ব্যবসা করা এই হকাররা বলেন, সেখানে বেশ সুবিধা ছিলো। ক্রেতারা গাড়ি পার্কিং করেই তাদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে পারতেন। চাকরীজীবি, ব্যবসায়ী ও পথচারীরা এই রোড দিয়ে যাতায়াত করতেন। তাছাড়া, বাসা বাড়িতে যারা ভাড়াটে আছেন, তাদেরও হাতের নাগালে ছিল বিধায় সহজেই সেখান থেকে বাজার করতে পারতেন। মূলত, যাতায়াত সুযোগ সুবিধা ভালো থাকায় ওই এলাকার বাজার সব সময় সরগরম থাকতো। সেই অর্থে লালদিঘীর পাড়ে সুযোগ সুবিধার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

 



ব্যবসায়ীরা বলেন, হকারদের পুনর্বাসনের প্রথম দিন সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেছিলেন এখানে ক্রেতা আসার জন্য তিনটি রাস্তা করে দেয়া হবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই সিসিক কিংবা মহানগর পুলিশের। তাদের দাবি, দ্রæত এই রাস্তা তিনটি করে দেয়া হলে ক্রেতাদের পদচারণা বাড়বে।

 

পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ ও সিকি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তারা বলেন, ‘নগরের প্রধান সড়কের সাথে লালদিঘীরপাড়ের যোগযোগ ব্যবস্থা উন্নত করে দিন। প্রয়োজনে মেয়রের ঘোষণাকৃত রাস্তা তিনটি খুলে দিন। নয়তো, যেভাবেই হোক ক্রেতা সাধারণের যাতায়াতের উপযোগী করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। আমাদের বাঁচান। ক্রেতা শূন্য বাজারে বসে আমাদের অভাব অনটন দিন দিন বাড়ছে। পরিবার পরিজন নিয়ে আমরা মানবেতর দিন যাপন করছি। ছেলে মেয়েদের লেখা করাবো কীভাবে সেই চিন্তায় আমাদের ঘুম হারাম হতে চলেছে। দয়াকরে আমাদের বাঁচান।’

 

হকার নেতৃবৃন্দ জানান, ‘যতদিন পর্যন্ত এখানে ক্রেতা আসার জন্য রাস্তা এবং উপযোগী করা না হবে, ততদিন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ক্রেতা আসবে কি না এ নিয়ে আমরা চিন্তিত। তাছাড়া, যে জায়গায় পুনর্বাসন করা হয়েছে, সেটাকে আরও সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। এখানে বর্ষা মৌসুমে পানি ওঠে যাবে। টয়লেট বা প্রশ্রাব পায়খানার কোন ব্যবস্থা নেই। পুনর্বাসন সংক্রান্ত কোনো প্রচারণাও চালানো হয়নি। আলোক বাতিরও তেমন ব্যবস্থান নেই। সব মিলিয়ে এখনই ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে না। তবে, মেয়র ও পুলিশ কমিশনার সদয় হলে হয়তো আমাদের দিন পাল্টাতে পারে।’

 

নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘এখানে অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন। কেউবা ব্যাংক থেকে লোন না হয় দাদন ব্যবসায়ীর কাছ টাকা নিয়ে ব্যবসা করছেন। ব্যবসায় এমন মন্দা অবস্থা চলতে থাকলে হকাররা দেউলিয়া হয়ে যাবে। এই পুনর্বাসনের মেয়াদ কত দিন সেবিষয়ে কেউ স্পষ্ট করে বলেননি বিধায় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ মেয়াদি কোনো চিন্তা করতে পারছেন না। ব্যবসায় টাকা খাটানোর আগে তার স্থায়িত্ব নিয়ে ভাবতে হয়, কিন্তু এখানকার পরিস্থিতে এ বিষয়ে ভাববার কোনো জো নেই।’

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিকের ডিসি ফয়সল মাহমুদ বলেন, লালদিঘীর পাড়ে ক্রেতা আসার জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। লটারির মাধ্যমে ফুটপাতে থাকা হকারদের দোকান/ ভিটে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাদ পড়া প্রকৃত হকারদেরও একইভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। যদি কোনো ব্যক্তি একাধিক ভিটে/ দোকান নিয়ে থাকেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর