প্রধান নির্বাহীর বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্তঃনেই : জেলা পরিষদ সিলেট অফিস যেন এক নিরব শশ্মানঘাট

প্রকাশিত: ৭:২৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৯, ২০২০

প্রধান নির্বাহীর বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্তঃনেই : জেলা পরিষদ সিলেট অফিস যেন এক নিরব শশ্মানঘাট

খলিলুর রহমান
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সেবামূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জেলা পরিষদ। জেলার অন্য সব প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সমন্বয়ে থাকে এ প্রতিষ্ঠানের মূখ্য ভ‚মিকা। একটি জেলার মধ্যে থাকা সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন এবং জেলার অধীন বহুবিধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক দফতর সমূহের প্রতিনিধিত্বমূলক উন্নয়ন সমন্বয়ী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জেলা পরিষদ। কিন্তু জেলা পরিষদ সিলেট’র হালফিল অবস্থা সম্পূর্ণ এর বিপরীত মেরুতে। বস্তুতঃ জেলা পরিষদ সিলেট অফিসে উন্নয়ন ও সমন্বয়ী কোন কর্মকান্ডই নেই। আছে শুধু অবজ্ঞা, কর্তব্যে অবহেলা, অনিয়ম-আত্মসাত ও বঞ্চনামূলক কাজকর্ম। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় এটা কোন জেলা পরিষদ নয়, জেলা পরিষদ সিলেট অফিস যেন নিরব নিস্তব্ধ এক শশ্মানঘাট। সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে অফিসের চেইন অব কমান্ড। ক্ষুব্ধ এ অফিসের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম। ফলে ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের। আর জেলা পরিষদ সিলেট’র এ নাজুক অবস্থা সৃষ্টির মূলে রয়েছেন জেলা পরিষদ সিলেট-এর বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেবজিৎ সিংহ।

 

সিলেট সিটি করপোরেশন থেকে বদলী হয়ে জেলা পরিষদে যাওয়া দেবজিৎ সিংহ এখন সম্পূর্ণ বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার যেন তার নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। তার কাছে কোন জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, মিডিয়া, এমনকি জেলা পরিষদ মেম্বার ও চেয়ারম্যানের নুন্যতম মূল্যায়ন নেই। তারা যেন তার কাছে হবুচন্দ্রের রাজ্যের গবুচন্দ্র প্রজা। একজন স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান যেন তার প্রশাসনিক ক্ষমতার কাছে বসে থাকা ঠুঁটো জগন্নাথ।

 

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কোনো সুপারিশ, আর্থিক অনুদান ও সহায়তা প্রশাসনিকভাবে কার্যকর করতে চান না প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেবজিৎ সিংহ। তাইতো দেখা যায় চেয়ারম্যানের সুপারিশ নিয়ে দেখা ও কার্য সম্পাদন করতে মাসের পর মাস এমনকি বছর পর্যন্ত ধরণা দিতে হয় প্রধান নির্বাহী দেবজিৎ সিংহের অফিস বারান্দায়। যখনই তার সাথে দেখা করতে যাবেন-দেখবেন অফিসের দরজা বন্ধ। এ সময় হয়তো অধঃস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে বসে আছেন কোনো বিষয়ে গোপন ও রূদ্ধদ্বার বৈঠকে। প্রধান নির্বাহী তার প্রয়োজন ও ব্যক্তিস্বার্থে দিনরাত রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে থাকেন অধঃস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে।

 

অভিযোগ পাওয়া গেছে, কোন মতে কেউ যদি দেখা করতে তার অফিস কক্ষে ঢুুকে যায়, তাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হয় দেবজিৎ সিংহের সাথে। কোন প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিথি বা মিডিয়াকর্মী ও কর্তাব্যক্তিতের বসে বসে কথা বলার সুযোগ জেলা পরিষদ সিলেট’র নির্বাহী কর্মকর্তা দেবজিৎ সিংহের অফিসে নেই। এমনকি জাতির সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধারাও অফিসে বসে কথা বলতে পারেন না তার সাথে। কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে অনুদান বা আর্থিক সহায়তা পেতে মাসের পর মাস দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় জেলা পরিষদ সিলেট’র নির্বাহী কর্মকর্তা দেবজিৎ সিংহের ।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মঙ্গলবার (৮ ডিসেম্বর) দুপুরে এক মুক্তিযোদ্ধা এ প্রতিবেদককে জানান, একটি অনুদানে টাকা নিতে দেবজিৎ সিংহের কাছে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরণা দিতে হয়েছে তাকে।

 

একজন মিডিয়াকর্মী জানান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কর্তৃক সুপারিশ করা তার রোগের চিকিৎসা সহায়তার টাকা নিতে দেবজিৎ সিংহের কাছে দীর্ঘদিন ধরণা দিতে হয়েছে।

 

অপর এক পত্রিকা কর্তৃপক্ষ জানান, চেয়ারম্যানের অনুমতিতে ছাপানো দুটি বিজ্ঞাপনের বিল নিতে দীর্ঘ এক বছর ধরে প্রধান নির্বাহী দেবজিৎ সিংহের কাছে ধরণা দিয়েও বিল পাননি। এতে করে মিডিয়ার কাছে লজ্জিত হন চেয়ারম্যান।

 

এত করে প্রতীয়মান হয় সিলেট জেলা পরিষদের রাষ্ট্রীয় অর্থ যেন দেবজিৎ সিংহের পৈত্রিক সম্পত্তি। যাকে ইচ্ছা তাকে দেবেন এবং যাকে ইচ্ছে নয় তাকে দেবেন না।

 

জেলা পরিষদ সিলেট-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেবজিৎ সিংহের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো কোনো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে গোপন দহরম মহরম চালানো, স্বজনপ্রীতি ও আত্মীয় করণের গুরুতর অভিযোগে উঠেছে। নিজের পছন্দসই ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে নানা কুটকৌশল অবলম্বন করে অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্পের টাকা আত্মসাত ও ভাগবাটোয়ারা করে নিতে সিদ্ধহস্ত তিনি। এমন অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে তার যেমন দহরম মহরম, তেমনি মনোমালিন্যও চরমে। কোনো কোনো ঠিকাদার কাজের বা প্রকল্পের বিল পেতে তাকে খুশি করতে হয়। খুশি না করলে বিল পেথে বছরের পর বছর ধরণা দিতে হয়।

 

জেলা পরিষদ সিলেট-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে একসময় ফুঁসে উঠেন ঠিকাদাররা। এবছরের আগস্ট মাসে সিলেট জেলা পরিষদ কন্ট্রাক্টর ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন নগরের জিন্দাবাজারে এক প্রতিবাদ সভা করে।

 

অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি তোজাম্মেল হক তাজুলের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আশফাক উদ্দিন আহমদের পরিচালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন সিলেট জেলা পরিষদ কন্ট্রাক্টর ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ও সিলেট চেম্বারের পরিচালক আব্দুর রহমান জামিল, সুব্রত ধর বাপ্পি, সুদীপ দেব, সাজ্জাদ বখত, কামাল আহমেদ, সোয়েব আহমেদ, আলহাজ এম ইসমাঈল আলী আশিক।

 

সভায় বক্তারা বলেন, সিলেট জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী-সহ কতিপয় কর্মকর্তা তাদের পছন্দমতো গুটিকয়েক ঠিকাদারকে সরকারি নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে টেন্ডার কারসাজির মাধ্যমে কাজ দিয়ে থাকেন। তারা অনিয়মের মাধ্যমে নগরের মেন্দিবাগ মার্কেট নির্মাণ ও জেলা পরিষদের ডাকবাংলোসহ বিভিন্ন কাজ তাদের পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়েছেন। এছাড়া প্রধান নির্বাহী ও তার অধঃস্তন কর্মকর্তারা কোটেশনের মাধ্যমে কাজ না করে বিল তুলে তাদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারাও করে নেন। এর প্রতিবাদে সিলেট জেলা পরিষদ কন্ট্রাক্টর ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি বিগত সময়ে প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিকার বা ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। তাই ঠিকাদার অ্যাসোয়িশনের মধ্যে বিরাজ করছে তীব্র ক্ষোভ। এতে করে প্রতীয়মান হয় জেলা পরিষদ সিলেট অফিস যেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পকেট অফিসে পরিণত হয়েছে।

 

জেলা পরিষদ সিলেট-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেবজিৎ সিংহ ও তার অধঃস্তন কর্তা-ব্যক্তিদের অনিয়ম-দুর্নীতির অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। মিডিয়ার একটি টিম এগুলোর অনুসন্ধানে মাঠে কাজ করে চলেছেন। অচিরেই তারা মিডিয়ায় বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন বলে জানিয়েছেন।

 

অনিয়ম-দুর্নীতি ও কর্তব্যে অবহেলা-অবজ্ঞার ব্যাপারে বক্তব্য নিতে জেলা পরিষদ সিলেট-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেবজিৎ সিংহের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে মঙ্গলবার (৮ডিসেম্বর) রাত ৮টা ৪৬ মিনিট থেকে এ প্রতিবেদক বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাংবাদিকের মোবাইল ফোন রিসিভ করেন নি।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর