প্রসঙ্গ : স্বরস্বতি পূজো, নির্বাচন এবং মালাউন

প্রকাশিত: ২:৫৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০২০

প্রসঙ্গ : স্বরস্বতি পূজো, নির্বাচন এবং মালাউন

দেবব্রত রায় দিপন : স্বরস্বতি পূজার দিনে নির্বাচন হবে রাজধানীতে। নির্বাচনী উৎসব চলছে মহাসমারোহে। প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন জনগণের। কিন্তু বাঁধ সেধেছে এক শ্রেণীর হিন্দুরা। তাদের দাবি-পূজোর দিনে স্কুল-কলেজ গুলোতে সাড়ম্বরে পূজো অনুষ্ঠিত হয়। তাই পূজোর দিন বাদ দিয়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে। তাদের দাবির পক্ষে কিংবা বিপক্ষে কিছু না বলে আমি বিষয়টি শেয়ার করতে চাই একটু অন্যভাবে।

বাংলালিংকের একটি এ্যাড এই মুহুর্তে বেশ মনে আসছে। ‘চায়ের দামে চিনি পাইলাম, ভালো না, ভালো তো”। আজ থেকে প্রায় ১০/১২বৎসর আগের ঘটনা। আমি তখন দৈনিক করতোয়ার সিলেট প্রতিনিধি। স্বজন টাওয়ার সেগুন বাগিচায় অফিসে যাবো। ভাবলাম, অফিসে উঠার আগে এক কাপ চা খেয়ে নিই। অফিসের পাশে ডান দিকের মোড় পেরিয়ে একটি চায়ের দোকানে গিয়ে চা খাচ্ছি। হঠাৎ চায়ের মধ্যে চোখ পরতেই দেখি চায়ের মধ্যে পোকা। চায়ের কাপ যথাস্থানে রেখেই আমি কাউন্টারে গিয়ে অভিযোগ জানালাম। ম্যানাজারের বক্তব্য শুনেই আমার চোখ কপালে উঠলো। ম্যানাজার বললো-‘৫ টাকা দিয়ে চা খাবেন, তো চায়ের মধ্যে পোকা পরবে নাতো হাতি পরবে নাকি?’ আমি বাইরের মানুষ,তাই কথা না বাড়িয়ে চলে আসলাম। আজ এদেশের সংখ্যালগু সম্প্রদায়ের অবস্থাদৃষ্টে একই কথা মনে হচ্ছিলো বারবার। এই সম্প্রদায়টি বড্ড লোভী হয়ে উঠছে আজকাল। এরা ভুলেই গেছে এদেশে তাদের থাকার কথা নয়। তবুও তারা থেকে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সুযোগ সূবিধা ভোগ করছে। সরকারী বড় বড় চাকুরিতে অংশ নিচ্ছে। আবার কেউ কেউ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনগনের প্রতিনিধিত্বও করছেন। কি দূঃসাহস রে বাবা! আমি বলি-আর কতো সুযোগ পেলে যে এই সম্প্রদায়ের চাহিদার ইতি ঘটবে। কিন্ত তার জন্য তো আপনাদেরকেও কিছুটা ত্যাগ করতে হবে। তাই না? আজ ‘মালাউন’ বলে গালি দিলেই আপনারা রেগে উঠেন। আরে বাবা, একজন মন্ত্রী বলে তো কথা।আওয়ামীলীগ নেতারা আপনাদের বাড়ি-ঘর দখল করে নিলেই আপনারা মানব-বন্ধন, সমাবেশসহ প্রতিবাদী হয়ে উঠেন।। চোখের সামনে না হয় আপনাদের মা-বোন একটু ধর্ষনের শিকারই হলো। তাতে কি ? আমি বলি বেঁচে থাকার বদৌলতে এই একটু যদি সহ্য করতে না পারেন, তাহলে বাবারা আপনারা দু’চোখ বন্ধ করে রাখেন। এই যে আমাকে দেখেননা, আমি ছাড়া আমার পরিবারের সবাই আওয়ামীলীগের খাস্ বান্দা (মাশ্আল্লাহ)! আওয়ামী বেহেশত তাদের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে।

আমি জানি,আমার কথা শুনে অপনাদের গা চুলখাচ্ছে। কিন্তু কি করি বলুনতো ? লিখতে গেলে তো আর টাকা খরচ হয়না। যখন এর নাম ছিল পূর্ব পাকিস্থান, তখনতো আপনাদের সম্প্রদায় সর্বস্ব বাজি রেখে মুখোমুখি হয়েছিলো এক নির্মম বাস্তবতার। স্বাধীনতার সোনালী সূর্য যখন সেই আপনাদের দেহ মনের ক্ষতে শান্তির প্রলেপ দিতে চাইলো পরম মমতায়, তখন এদেশ অস্বিকার করলো আপনাদের। রাগ করবেন না। আসলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রাষ্ট্রযন্ত্রকে বড় আগ্রাসী করে তোলে, ভয়াবহ রকম ধার্মিক করে তোলে-এই সত্য জানার পর থেকেই নিজেদের অস্তিত্ব লুকানোর মন্ত্র মুখস্থ করতেই ব্যস্থ হয়ে পড়েন আপনারা। প্রাণভয়ে নিজেদের যতই গুটাতে লাগলেন, রাষ্ট্র ততোই আপনাদের দিকে ধাবিত হতে থাকলো আঘাতে-আঘাতে। আপনাদের কণ্ঠ মৃত্যুভয়ে যতই রুদ্ধ হতে থাকলো, রাষ্ট্রীয় কণ্ঠ ততোই হুঙ্কার দিতে লাগলো। আপনাদের প্রার্থনা রাষ্ট্র এবং এদেশের মানুষের নৃশংসতাকে আরও উসকে দিলো।

সংখ্যালঘু মানুষেরা, ব্যর্থ মানুষেরা, আপনাদের জন্য করুণা হয়। শোক হয়। এতো নির্যাতনের পরেও কেন আপনারা বাছুরের মতো আঁকড়ে রইলেন এই ভূখন্ডকে মা ভেবে? কেন আপনারা বিশ্বাস করতে পারলেন না; দয়া আমাদের কেউ নয়, ভালোবাসা আমাদের কেউ নয়, মানুষ আমাদের কেউ নয়। আমরা আসলে আপাদমস্তক ধার্মিক। আমরা মাতাল, আমরা জুয়ারি, আমরা বিশ্বাসঘাতক। আমরা দুর্নীতি করি, ধর্ষণ করি, প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ খুন করি, কিন্তু দিন শেষে আমরা আবারও ধার্মিক হয়ে ওঠি। বিশুদ্ধতম ধার্মিক। ধর্ম আমাদের মা, ধর্ম আমাদের বাপ, ধর্ম আমাদের সব। বোকা মানুষগুলো মিছে রক্ত দিয়েছিল একাত্তরে। এখনও পাকিস্তানের জন্য আমাদের হৃদয় সিক্ত হয়ে ওঠে। আমাদের রক্ত ধুকপুক তাদের জন্য।

আমরা কখনোই আপনাদেরকে চাই নি। না পাহাড়ে, না সমতলে, না মন্দিরে, না প্যাগোডায়, না গীর্জায়। সংখ্যালঘু মানুষেরা, তবুও কেন আপনারা রয়ে গেলেন, আমাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে? এমন অমার্জনীয় অপরাধের জন্য এই বদ্বীপ কখনোই আপনাদেরকে ক্ষমা করবে না, কোনদিনও না।
আপনাদের প্রধান সমস্যা, নিজ নিজ ধর্ম আর জীবন নিয়েই মগ্ন থাকতে চেয়েছিলেন আপনারা। অন্যের ধর্ম নিয়ে কখনোই কোনরকম এলার্জি ছিলো না আপনাদের। কিন্তু এদেশের মানুষ আপনাদের মতো নিরীহ নয়। আপনারা তো মানুষ নন। আপনারা হিন্দু অথবা সংখ্যালঘু অথবা পশুমন্ত্রীর মালাউন। আমরা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করি। ধর্মকে রাষ্ট্রীয় করি। আপনাদের দেবালয় দেবতাসহ নিশ্চিহ্ন করে দেয়াকে ফরজ মনে করি। কি এমন আবশ্যকতা রয়েছে আপনাদের ধর্ম পালনের। কতোটুকুই বা বুঝেন আপনারা ধর্মের। গো-মাতাকে পবিত্র মানেন বলেই আপনাদের প্রার্থনালয়ের সামনে তাকে জবাই করে রেখে আসি।

তাই আপনাদের বলছি, নিরীহ মানুষেরা, ব্যর্থ মানুষেরা, আপনাদের জন্য কষ্ট হয়, শোক হয় । আপনাদেরকে ভোটকেন্দ্রে দেখলেই আমাদের অস্বস্থি হয়। আপনাদের মূর্খতায় আমরা বিনোদিত হই। আমরা ভেবে পাই না, আপনারা কাকে, কোন উদ্দেশ্যে নির্বাচিত করার জন্য ভোটকেন্দ্র অবধি যান। এই ভূখন্ডের স্বৈরাচারী, গণতন্ত্রী, একনায়কতন্ত্রী কোন শাসকই তো আপনাদের স্বার্থে, আপনাদের পক্ষে ছিলো না কখনো। তবুও আপনারা কাকে নির্বাচিত করেন? মুক্তিযুদ্ধের মুকুট মাথায় পরেও যারা রাষ্ট্রীয় ধর্মের কাছে জিম্মি হয়ে আছে, তাদেরকে ধর্মের তোষামোদ করে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই যাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত, ক্ষমতার মিনারে বসে যারা আপনাদেরকে মালাউন বলে গালি দেয়, তাদেরকে? কতবার মরে যাবার পরে আপনারা বুঝবেন, আপনাদের জন্মের মূল্যই চুকাচ্ছেন এভাবে রাষ্ট্রের এবং এদেশের সৃষ্ট নরকের বাসিন্দা হয়ে। কাদম্বিনী মরিয়া প্রমান করিলো সে মরে নাই।তাই যদি হয়, আমার বলার কিছুই নেই।

অতএব এই সাম্প্রদায়িক দেশে পূজো করতে পারার জন্য বরং সরকারকে একটা ধন্যবাদ দিন। স্বরস্বতি পূজো চুলোয় যাক, আগে তো সরকারকে বন্ধনা করতে শিখুন।

লেখক : সংবাদকর্মী

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর