সিলেটে পুলিশ টোকেন দিয়েই চলছে হাজার হাজার অবৈধ অটোরিকশা

প্রকাশিত: ৪:৫১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০২১

সিলেটে পুলিশ টোকেন দিয়েই চলছে হাজার হাজার অবৈধ অটোরিকশা

খলিলুর রহমান
নিবন্ধন তথা রেজিস্ট্রেশন নেই, ‘মাসোহারা টোকেন দিয়েই সিলেটে চলছে হাজার হাজার অবৈধ অটোরিকশা। শুধু পেছনে লেখা রয়েছে আবেদিত বা অনটেস্ট। এইটুকু লিখেই সিলেটে বছরের পর বছর ধরে চলছে সহস্রাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা।

 

এতে লাভবান হচ্ছেন কিছু শ্রমিক নেতা আর পুলিশের কিছু লোক। মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রাজপথে এগুলো চলার বৈধতা দিয়েছেন তারা। এছাড়া এসব অটোরিকশার চালকদেরও নেই কোন লাইসেন্স। সমিতির সদস্য হলেই গাড়ি চালানো যায়, এতে তাদের কোন ভোগান্তি পোহাতে হয়না। সিলেট নগর থেকে শুরু করে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ – গোয়াইনঘাট, সালুটিকর, বিছনাকান্দি, সিলেট-গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, ঢাকাদক্ষিণ, সিলেট-মোগলাবাজার -ফেঞ্চুগঞ্জ, ওসমানীনগর, সিলেট-কামালবাজার -বিশ্বনাথ, সিলেট-তেমূখী -টুকের বাজার -বাদাঘাট, সিলেট -খাদিম- বটেশ্বর- হরিপুর- তামাবিল জাফলং, সিলেট-কানাইঘাটসহ বেশ কিছু এলাকায় এভাবেই চলছে এসব অবৈধ অটোরিকশা।

 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সিলেট অফিস সূত্রে জানা যায়, সিলেটে বৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে ২১ হাজার ২৩২ টি। এরমধ্যে প্রায় ৫ বছর আগে দেড়হাজারের উপরে সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধনের জন্য আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদনের কোন সুরাহাও হয়নি। এছাড়া এর বাইরে, কোনও আবেদন না করেই আরও দুই সহস্রাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলছে।

 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিলেট জেলা সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের ছত্রছায়ায় নগরে ও নগরের বাইরে বিভিন্ন রোডে চলাচল করছে এসব অবৈধ অটোরিকশা। পুলিশ, সমিতির নেতা, বিআরটিএ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশে বিবিন্ন রোডে এসব সিএনজি অটোরিকশা চলছে। অবৈধ অটোরিকশাকে ‘বৈধতা’ দেওযার বিনিময়ে তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত একটি সংগঠনের শাখা রয়েছে আম্বরখানা ও সালুটিকরে। এই শাখার অধীনে অবৈধ অটোরিকশা রয়েছে হাজারখানেক। প্রতিটি গাড়ির নম্বর প্লেটে লেখা রয়েছে ‘সিলেট-থ -১২ -আবেদিত’। প্রতিটি অটোরিকশা থেকে প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা করে আদায় করেন অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। ওই টোকেনে চলা যায় এক মাস। প্রতি মাসে টোকেন না নিলে সমস্যায় পড়তে হয় চালকদের।

 

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, অবৈধ অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন আম্বরখানা-সালুটিকর শাখার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এক সদস্য। এখানকার অবৈধ ‘সিলেট-থ -১২ -আবেদিত’ অটোরিকশাগুলো। নিবন্ধনহীন সহস্রাধিক সিএনজি অটোরিকশা বাবদ প্রতিমাসে উত্তোলন করা হয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। আম্বরখানা-মদিনা মর্কেট কুমারগাঁও- টুকের বাজার সড়কে চলাচলরত অবৈধ াচোরিকশারও নিয়ন্ত্রণ করেন ওই নেতা।

 

চালকরা জানান, উত্তোলিত টাকার ভাগ পান সমিতির নেতা, এয়ারপোর্ট থানা, আম্বরখানা পুলিশ ফাঁড়ি, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ। সিলেট সুনামগঞ্জ সড়কের তেমূখীতে রয়েছে আরেকটি সমিতি। এ সমতির দেওয়া টোকেনে অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করে বাদঘাট শিবেরবাজার, শাহজালাল বাজার, ইসলামগঞ্জ বাজার ও মোগলগাঁও কারখানা বাজার হয়ে লামাকাজি পর্যন্ত। শ্রমিক ইউনিয়ন টুকেরবাজার শাখার টোকেনে লামাকাজি, বানাগাঁও প্রতিটি রাস্তায় অবৈধ অটোরিক্শা চলাচল করে। অনটেস্ট অটোরিক্শা প্রতি প্রতিমাসে দিতে হয় এক হাজার টাকা।এই টোকেনের টাকা স্থানীয় সমিতির নেতারা ও জালালাবাদ থানা পুলিশ ভাগ করে নেয়।
দক্ষিণ সুরমার কদমতলী হুমায়ুন রশিদ চত্ত¡র শ্রমিক শাখার দেওয়া টোকেনে দক্ষিণ সুরমা এলাকার বিভিন্ন সড়কে চলাচল করে অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা।

 

গত কয়েকদিন নগরের আম্বরখানা, টিলাগড়, গোলাপগঞ্জ, ওসমানীনগর, টুকেরবাজার ও দক্ষিণ সুরমাসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিআরটিএ’র অনুমোদন ছাড়াই (সিএনজি অনটেস্ট) আবারো কোনটি আবেদিত লিখেই চলছে নগরে ও নগরের আশপাশ উপজেলায়। টিলাগড় শ্রমিক শাখার টোকেনে এসব রাস্তায় অবৈধ সিএনজি অটোরিক্শা চলাচল করে থাকে।

 

চালকরা জানান, মাসোহারা টোকেন দিয়েই রাস্তায় চলছে এসব গাড়ি। আর এই টোকেন পুলিশ টোকেন হিসাবে পরিচিত। প্রশাসনের যথাযথ তদারকির অভাব আর কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তার অসাধুতার কারণে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না অনটেস্ট সিএনজি অটোরিকশা বাণিজ্য।

 

স্থানীয় কয়েকজন চালকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ওই রোডে চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশার চালকদের নেই কোন লাইসেন্স। কারো কারো লাইসেন্স রয়েছে। সেটি জাল বলেও জানান অনেক চালক।

 

মজুমদারী এলাকার এক চালক জানান, তার গাড়ির কোন রেজিস্ট্রেশন নেই। তার যে লাইসেন্স সেটিও জাল।

 

জাল লাইসেন্স কেন এমন প্রশ্নের জবাবে ওই চালক জানান, ওই রোডে চলাচল করতে কোন লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। এছাড়া বিআরটিএ অফিসে গেলে তাদের ঘিরে ধরে দালালরা। লেখাপড়া কম জানার কারণে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয় বেশি টাকা। একটি লাইসেন্স করতে দালালরা ১০ হাজার টাকা নেয়।
সিলেট সালুটিকর রোডে চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশার একজন মালিক জানান, তার দুটি সিএনজি অটোরিকশা রয়েছে। যেগুলোর কোন রেজিস্ট্রেশন নেই। সিলেট বিআরটিএ অফিসে আবেদন করেছেন বছর চারেক আগে। এখনো তার আবেদনের কোন সুরাহা হয়নি। প্রতিমাসে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই তার গাড়ি চলছে। অনেক সময় পুলিশ গাড়ি আটক করলেও টোকেন দেখামাত্রই ছেড়ে দেয়।
তিনি আরও জানান, ওই রোডে চলাচলকারী অনটেস্ট সিএনজি অটোরিকশার মালিকরা পুলিশ টোকেন দিয়ে রাস্তায় এসব গাড়ি চালাচ্ছে। আবার অনেক সিএনজি অটোরিকশার মালিক এ ধরণের ঝুঁকি না নিয়ে অপেক্ষার পর কম দামে গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। তার দুটি গাড়ির মধ্যে এধরনের একটি গাড়ি অনেক কমদামে কেনেন বলে জানান।

 

অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন আম্বরখানা সালুটিকর শাখার অফিস সূত্রে জানা যায়, এই শাখার অধীনে হাজার খানেক আবেদিত অটোরিকশা রয়েছে। এই শাখার আওতায় রয়েছে আম্বরখানা স্ট্যান্ড, এয়ারপোর্ট স্ট্যান্ড, কোম্পানীগঞ্জ স্ট্যান্ড, গোয়াইনঘাট স্ট্যান্ড, সালুটিকর স্ট্যান্ড, ভোলাগঞ্জ স্ট্যান্ড, পারুয়া স্ট্যান্ড, দয়ারবাজার রাধানগর স্ট্যান্ড। এ সকল এলাকার সকল পুলিশ ফাঁড়ি ও থানার সঙ্গে মৌখিক চুক্তি রয়েছে শ্রমিক ইউনিয়নের। প্রতিটি চেকপোস্টে জনৈক তেরা মিয়ার স্বাক্ষরিত টোকেন দেখালেই অবৈধ অটোরিকশা ছেড়ে দেয় পুলিশ। কয়েক বছর ধরে এভাবেই ‘আবেদিত’ লেখা গাড়িগুলো চলছে।

 

সিলেট-থ -১২ -আবেদিত নম্বর প্লেটধারী গাড়ির চালক রইছ আলী বলেন, তার গাড়ির কোনও কাগজপত্র নেই। প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা দিয়ে পুলিশ টোকেনের মাধ্যমে গাড়ি চালাচ্ছি।

 

এ ব্যাপারে আম্বরখানা সালুটিকর শাখার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক তেরা মিয়া বলেন, তিন মাসের জন্য অন্তরবর্তীকালীন দায়িত্ব তিনি পেয়েছেন। এর আগেও তিনি ওই সমিতির দায়িত্ব পালন করেন। তার স্বাক্ষরিত একটি টোকেন দেওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রতিদিন ১৫ টি গাড়ি পুলিশ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। যাতে তাদের অন্য রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বা রেজিস্ট্রেশনভুক্ত গাড়িগুলো হয়রানির শিকার না হয়।

 

এ ব্যাপারে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) নিকোলিন চাকমা সাংবাদিকদের বলেন, সালুটিকর এলাকায় কোন সিএনজি পাম্প না থাকায় চৌকিদেখী এলাকায় কিছু সিএনজি অটো রিকশা চলাচল করে। যেগুলোর কোন রেজিস্ট্রেশন নেই। আমরা প্রায়ই রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশা ধরতে অভিযান চালাই। তবে টোকেন দিয়ে অবৈধ অটোরিকশা চালানোর বিষয়টি তার জানা নেই।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর