আতিথেয়তার ফজিলত

প্রকাশিত: 8:16 PM, October 22, 2018

আতিথেয়তার ফজিলত

এ জে ইকবাল আহমদ

বাসায় অতিথি এলে আমরা খুশি হই। মন আনন্দে ভরে উঠে। বাঙালি বরাবরই অতিথিপরায়ণ জাতি। পবিত্র ইসলামেও আতিথেয়তাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমাদের উপমহাদেশের ইসলাম প্রচারকগণও মেহমানদের আদরযতœ করতেন।

অতিথি শব্দটার সাথে সবাই পরিচিত হয়েছি বড় হওয়ার পর। ছোটবেলায় ‘অতিথি’ বুঝতাম না। তখন বলাবলি করতাম বাসায় মেহমান এসেছে। ছোটবেলায় বাসায় নানা, মামা, চাচা, খালারা এলে হইচই লাগিয়ে দিতাম। এ ঘটনা সবার জীবনেই ঘটেছে।

আসলে আতিথেয়তা আমাদের রক্তে মিশে আছে। অতিথিকে সমাদর করতে আমরা পছন্দ করি। আমরা অতিথি আপ্যায়ন করতে পারি যখন কেউ বাসায় আসে। বর্তমানে ফেসবুক, স্মার্টফোনের যুগে নাগরিক সভ্যতার ব্যস্ততার কারণে বেশির ভাগ সময় কেউ কারো বাসায় যেতে চান না। রাস্তাঘাটেই বলেন, ‘আজ না, আরেকদিন আসব।’ সেই সময় আমরা চেষ্টা করি আশপাশের কোনো কনফেকশনারি বা কফিশপ থেকে কিছু খাওয়াতে। তাও যদি অতিথির সময়ে না কুলায় শেষ চেষ্টা হিসেবে বলি, অন্তত এক কাপ চা খান। এ ঐতিহ্য নিয়েই আমাদের বাঙালি সমাজ চলে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। পশ্চিমা বিশ্বে অতিথি আপ্যায়ন নেই বললেই চলে। তারা ‘হাই, হ্যালো’ বলেই কাজ সারতে চায়। অনেকে চায়ের কথা বললেও বেশির ভাগ নাগরিক ‘নো থ্যাংকস’ বলে বিদায় নেয়। এটা তাদের সংস্কৃতির অংশ।

আমরা মুসলিমরা সুন্নাহ পদ্ধতিতে নিজেরা খাই, অন্যকেও খাওয়াই। আর পবিত্র ইসলামে মেহমানদারিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রথমে অতি ছোট্ট একটা ঘটনা তুলে ধরছি পাঠকদের জন্য।

একবার বনু গিফার গোত্রের এক লোক রাসূল সা:-এর মেহমান হলেন। মহানবী সা: আগের দিন অভুক্ত ছিলেন। যেদিন মেহমান এলেন, সেদিন ঘরে ছাগলের দুধ ছাড়া আর কিছু ছিল না। নিজে অনাহারি হয়েও আমাদের রাসূল সা: সেই মেহমানকে ছাগলের দুধটুকু খাওয়ালেন। কিন্তু অতিথিকেও বুঝতে দিলেন না যে, তিনি ুধার্ত।

এ ঘটনাটি আমাদের অনেক কিছু শিা দেয়। আমাদের এটা শিা দেয় যে, মানুষ সব আল্লাহর সৃষ্টি। সবাই সমান। কাউকে অবহেলা করতে নেই। ধনী বা গরিব যেই হোক, সাধ্যমতো তাকে আপ্যায়ন করতে হবে।

আর পবিত্র কুরআনেও অতিথি আপ্যায়ন সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। যদিও বা নিজেরা ুধার্ত থাকে। আর যারা স্বভাবজাত লোভ-লালসা এবং কামনা থেকে রা পেয়েছে, তারাই সফলকাম।’ (সূরা হাশর : ৯)

আসা যাক মুসলিম মনীষীগণ, ইসলাম প্রচারকগণ কিভাবে অতিথি আপ্যায়ন করতেন সে প্রসঙ্গে। তার আগে জানা প্রয়োজন কেন এ দেশে ইসলাম প্রচারকগণ, সুফিগণ আগমন করেছিলেন।

এ উপমহাদেশে ইসলামের প্রচার শুরু হয়েছে শত শত বছর আগে। ইসলাম প্রচারের জন্য এখানে আগমন ঘটেছে অসংখ্য ইসলাম প্রচারকের। স্থানের সঙ্কুুলান না হওয়ায় মাত্র কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি। তা না হলে নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হবেন। ইসলাম প্রচারে ভারতের আজমিরে এসেছিলেন ‘সুলতানুল হিন্দ’ বলে খ্যাত হজরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি র:, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় ফুরফুরা শরিফে হজরত আবু বকর সিদ্দিকী র:, পুণ্যভূমি সিলেটে হজরত শাহজালাল র: ও হজরত শাহ পরান র:, বাগেরহাটে খানজাহান আলী র:, চট্টগ্রামে হজরত বায়েজিদ বোস্তামি র:, বদনা শাহ র:, হজরত আমানত র:সহ আরো অনেকে, পিরোজপুরে হজরত শেখ নেছারুদ্দীন র:, আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ র: এবং নেত্রকোনা জেলার মদনপুরে এসেছিলেন হজরত শাহজালাল র:-এর ৩৬০ জন সঙ্গীর অন্যতম হজরত শাহ সুলতান কমরুদ্দীন রুমি র:।

তারা ইসলাম প্রচার করেছেন, সেই সঙ্গে আতিথেয়তার প্রমাণও দিয়েছেন। অনেক ইসলাম প্রচারক বুজুর্গের খানকার পাশে মুসাফিরখানা আছে। সারা দেশ থেকে বিভিন্ন মানুষ তাদের কাছে হেদায়েতের জন্য যান। কেউ ইসলামের আমল-আখলাক ঠিকমতো কিভাবে পালন করতে হয় তা জানতে এসব মনীষীদের কাছে যান। তাদের অনেকেরই থাকার জায়গা নেই। তারা সেসব সুফিদের মুসাফিরখানায় রাতযাপন করেন। যতদিন ইচ্ছা থাকেন। তাদেরকে কেউ বাড়ি যাওয়ার জন্য তাগাদা দেন না। এর মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটে উঠে। ইসলামে আতিথেয়তা লৌকিকতামুক্ত। সরলতায় পরিপূর্ণ।

বর্তমানে আলেম-ওলামাদের মধ্যেও অতিথিপরায়ণতা আছে, তবে আগের তুলনায় অনেক হ্রাস পেয়েছে। তবুও এতণের আলোচনায় অতিথি আপ্যায়নের যে উদাহরণ পেলাম তার কিছুটা ধরে রাখতে পারলেও ইন্টারনেট, ফেসবুকের যুগে এ সমাজে মানুষে মানুষে আন্তরিকতা, মিল-মহব্বত অনেক বৃদ্ধি পাবে।

  •  

সর্বশেষ ২৪ খবর