কানাইঘাটের সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডাঃ মোঃ নিজাম উদ্দিনের খোলা চিঠি

প্রকাশিত: 11:13 PM, December 2, 2019

কানাইঘাটের সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডাঃ মোঃ নিজাম উদ্দিনের খোলা চিঠি

ডেস্ক প্রতিবেদন : সিলেটের প্রকৃতিকন্যা খ্যাত কানাইঘাট উপজেলা। এই অঞ্চল থেকে খনিজ সম্পদ লোভা পাথর কোয়ারী থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জমা হয় সরকারি কোষাগারে। কিন্তু এই অঞ্চলটি এখনও একটি পশ্চাদপদ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সরকারি উন্নয়নের ছোঁয়া বঞ্চিত হয়ে এই অঞ্চলের লোকজন বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। উন্নয়ন বঞ্চিত কানাইঘাটের কিছু দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে সমস্যা সমাধানে মামনীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন উপজেলার ১ নং লক্ষীপ্রসাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা ও চিকিৎসক ডাঃ মোঃ নিজাম উদ্দিন। সমস্যা, সম্ভাবনা এবং প্রস্তাব সম্বলিত দীর্ঘ এই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, লাল সবুজের ডিজিটাল রূপকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা আপনার ডিজিটাল বাংলাদেশের সিলেট জেলার সিলেট-০৫ (পাঁচ কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) সংসদীয় আসনের কানাইঘাট উপজেলার ১নং লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের বড়চাতল, কাড়াবাল্লা, বাকুঁডি, বালিছড়া, বাংগালিপাড়া, খাসিয়পুঁঞ্জি, দনা, লোহাজুরি, মমতাজগন্জ, নারাইনপুর, সোনার খেওড়, নক্তিপাড়া, ডেয়াটিলা, ডাউকেল গুল, কেরকেরী, ভাটি বারা ফৈইত, বাল্লুকমারা, মেচা, কান্দলা, বাজেখেল, বাগান, সাউদগ্রাম ও বড় গ্রামের বাসিন্দা। সীমান্ত ঘেষা আমাদের ইউনিয়নের পশ্চিমে লোভা নদীর পাথর কোয়ারী ও মুলাগুল বাজার, দক্ষিণে সুরমা নদী, উত্তর পূর্বে ভারতের আসাম রাজ্যের হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ি টিলার সীমানা প্রাচীর। প্রাকৃতিকভাবে স্থল পথ যোগাযোগ থেকে বিচ্ছন্ন বন্ধি দ্বীপে স্বাধীনতা উত্তর আটচল্লিশ বছর থেকে পনেরো ষোল কিলোমিটার বিদ্যুৎহীন কাদা মাখা রাস্তা খাল বিল নদী সাতরিয়ে মানবেতর জীবন নিয়ে বসবাসকারী আমরা ইউনিয়ন বাসীর মনের কথা আজ আপনাকে জানাতে চাই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সিলেটের প্রকৃতি কন্যাখ্যাত আমাদের ইউনিয়নের পর্যটন এলাকা বড়চাতল গ্রামের পেট্রোবাংলার খনিজ সম্পদ তৈল উত্তোলন ১৯৭৯ সালে শুরু হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় : দুই বছর তৈল উত্তোলনের পর ১৯৮২ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে ভারতের নাতানপুর তৈল কূপে তৈলের চাপ কমে যাওয়ার অজু হাতে রহস্যজনক ভাবে আমাদের পেট্রোবাংলাটি বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আজও তার সুরাহা হয়নি। আমাদের অপর খনিজ সম্পদ লোভা পাথর কোয়ারী থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আপনার সরকারের কোষাগারে জমা হয়। অথচ একমাত্র আমরাই হলাম দেশের ইতিহাসে যোগাযোগ বঞ্চিত অবহেলিত ইউনিয়নের দীর্ঘ বাসিন্দা। নিরুপায় হয়ে আপনার কাছে খোজছি উত্তোরণের পথ।

শিক্ষিত জাতি গঠনের অভিভাবক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের স্থল পথ যোগাযোগ বিছিন্ন বন্দি ইউনিয়নে সরকারি বেসরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ না থাকায় আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কারিগর লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আর যারা হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে লেখাপড়া করে তাঁরা সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে হাতে বই কলম নিয়ে পনেরো ষোলো কিলোমিটার বন জঙ্গলে ঘেরা কাঁদা মাখা রাস্তায় রোদ, বৃষ্টি উপেক্ষা করে পায়ে হেঁটে সুরমা নদী নৌকায় কিংবা বাঁশের সাকোঁ পাড়ি দিয়ে অন্য উপজেলা জকিগঞ্জের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ মাদ্রাসায় অধ্যায়ন করে পুনরায় বাড়িতে ফিরতে অনেক রাত হয়। তারপরও আমাদের সোনার ছেলে মেয়েরা উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত যুদ্ধের মাঠে আছে।

প্রিয় দেশনেত্রী, আমাদের ইউনিয়নের সর্বত্র বানর, বনমোরগ, খরগোশ, শিয়াল, শাপ, বাঘ, ভাল্লুকের বিচিত্র অভয়ারণ্যের মাঝে সারা বছর ভরপুর সকল প্রকার প্রাকৃতিক ফল ফসল ও খাসিয়া পুঁঞ্জির পান সিলেটের স্থানীয় মানুষের চাহিদা মেঠাতে সম্ভব হলেও পনেরো ষোল কিলোমিটার হেঁটে সুরমা নদীতে বাঁশের সাকু পাড়ি দিয়ে জকিগঞ্জ উপজেলা সদরের পাইকারী বাজারে পান বিক্রির হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম ও কষ্ট দিন দিন সাধারণ শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও খাসিয়া সম্প্রদায়কে হাঁপিয়ে তুলছে।

সারা বিশ্বের রোল মডেল প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার বিচক্ষণতা আর সুদক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনায় সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নের জুয়ারে ভাসছে। অথচ আমরা আজও পাহাড় জঙ্গলে কাদা মাখা রাস্তায় রাত দিন চলাফেরা করি। ব্রিজ ও বিদ্যুতের অভাবে আমাদের মা বোন ও আমরা প্রতিদিন এক দুই কিলোমিটার পাহাড়ি টিলা বেয়ে নিচে নেমে ঝরণার পানিতে গোসল করি, রান্নার থালা-বাসন ধোই, নির্মম কষ্টে খাবার পানি সংগ্রহ করি। আমরা আমাদের মা, শিশু ও মুক্তিযোদ্ধাদের জরুরি চিকিৎসা সেবা দেই বাঁশের খাঁচায় কিংবা কাঠের চৌকিতে শুয়ায়ে কাঁধে করে পনেরো ষোল কিলোমিটার কাঁদামাখা রাস্তায় পায়ে হেঁটে সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে কানাইঘাট উপজেলা সদর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও দূরে হওয়ায় জকিগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে। আমাদের মা বোনদের প্রসব ব্যাথা হলে সিজার তো দূরের কথা স্থানীয় অদক্ষ দাই মা ছাড়া অন্য কোন সেবা তাদের কপালে জুটেনা। এভাবে প্রসব জটিলতায় সেবার অভাবে স্বাধীনতা উত্তর আটচল্লিশ বছরে অসংখ্য মা, বোন, শিশু শহীদ হয়েছেন যা এখনও চলমান অবস্থায় আছে। আমাদের এলাকার পাঁচ ছয় হাজার প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধা দেশের মাটিতে এসে জকিগঞ্জ উপজেলায় গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেটে পনেরো ষোল কিলোমিটার কাঁধে ব্যাগ বহন করে বাড়িতে যাওয়ার চিত্র আমাদের নিরবে কাঁদায়। আমরা নির্বাচনে পাহাড়ি টিলা বন-জঙ্গলে কাঁদা মাখা রাস্তায় পায়ে হেঁটে আপনার প্রসংশা মুখর মিছিল মিটিং করি। আমাদের মা বোন ও আমরা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে বাড়িতে ফিরতে অনেক রাত হয়। তবুও আটচল্লিশ বছর থেকে আমরা কলেজ, পাকা রাস্তা ও নদীর উপর ব্রীজের বুকভরা আশা আর সুদিনের স্বপ্ন নিয়ে বেশী সংখ্যকবার আপনার ও আমাদের প্রিয় দলের এমপি মহোদয়কে সংসদে যেতে ভোট দিয়ে সহায়তা করেছি এবং বর্তমানে তিনি স্বপদে বহাল তবিয়তে ভালই আছেন এবং ভবিষ্যতেও ভাল থাকার প্রত্যয় ও দোয়া অব্যাহত রাখবে অবহেলিত ইউনিয়নবাসী।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সুরমা ও লোভা নদীর উপর দুটি ব্রীজ নির্মাণ না হওয়ার কারণে স্থল যোগাযোগ বিচ্ছন্ন বন্ধি ইউনিয়নবাসীর দৈনিক হাট-বাজার, আত্মীয় স্বজনে যাওয়া আসা, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা পড়–য়া লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী ও বড়চাতল প্রেট্রোবাংলার দৈনিক হাজার হাজার পর্যটকের পায়ে হাঁটার দুর্ভোগ দেখলে খুব কষ্ট লাগে। আটচল্লিশ বছরের কষ্ট আর র্দুভোগের কথা বুকে চেপে রাখতে রাখতে আজ আপনার কাছে প্রকাশ করলাম। এই হল স্বাধীনতা উত্তর আমাদের উন্নয়নের হিসাব।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অবহেলিত ইউনিয়নবাসি, ছাত্র-শিক্ষক, আমজনতা সবাই চায় আপনার সহায়তায় এলাকার অতি জরুরি দাবিগুলো পূরণ করে বঞ্চিত, অবহেলিত ইউনিয়নবাসীকে দ্রুত দেশের উন্নয়নের জোয়ারে সম্পৃক্ত করতে। তাই-
১। লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈনিক চলাচলের পথ বড়চাতল পেট্রোবাংলা রাস্তা বরাবর কাড়াবাল্লা, আটগ্রাম বাজারে সুরমা নদীর উপর আল্লামা ফুলতলী (রহ:) সেতু নির্মাণ।
২। বছরে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়া মুলাগুল বাজার ও নয়া বাজারে আমাদের ইউনিয়ন বিচ্ছন্নকারী লোভা নদীতে শেখ সজিব ওয়াজেদ জয় সেতু নির্মাণ।
৩। কানাইঘাট বাজার থেকে পূর্বদিকে মুলাগুল বাজার ও নয়া বাজারে লোভা নদীর উপর দিয়ে দনা বাজার বিজিবি ক্যাম্প হয়ে বড়চাতল কাড়াবাল্লা বিজিবি ক্যাম্প পর্যন্ত এলাকার সকল গ্রামের লক্ষ লক্ষ মানুষের একমাত্র চলাচলের কাঁদা মাখা প্রধান রাস্তা দ্রুত পাকা করণ।
৪। মমতাজগঞ্জ বাজারে বঙ্গবন্ধু সরকারী কলেজ নির্মাণ ও বড়চাতল পেট্রোবাংলায় বঙ্গমাতা শেখ হাসিনা মহিলা সরকারী কলেজ নির্মাণ।
৫। ভারতের নাতানপুর বিএসএফ স্থল ক্যাম্প ও বাংলাদেশের পূর্ব কাড়াবাল্লা বিজিবি ক্যাম্পের দূরত্ব কাছাকাছি হওয়ায় এবং শিলং ও সিলেট পর্যটন মুখর এলাকা হওয়ায় বছরে শত কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষে দ্রুত কাস্টমস অফিস স্থাপন।
৬। বন্ধ থাকা বড়চাতল পেট্রোবাংলার খনিজ সম্পদ দ্রুত উত্তোলনের ব্যবস্থা করে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ধনে দখল হওয়া সরকারী ভূমি প্রায় চল্লিশটি হেলি পেড সহ উদ্ধার করে সীমানা চিহ্নিত করে ডিজিটাল পার্কে অবমুক্ত করণ।
৭। পূর্ব কাড়াবাল্লায় সুরমা নদীর তীরে পূর্ব ঘোষিত নদী বন্দর দ্রুত স্থাপন।
৮। খাসিয়া পুঁঞ্জির পান চাষের জন্য সরকারী সার অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

৯। খাসিয়া শিশুদের ভাষা বৈচিত্র রক্ষায় সরকারী প্রাথমিক স্কুল স্থাপন।
১০। দৈনিক লোভা নদীর পাথর বিক্রির কোটি কোটি টাকা নৌকায় ষোল কিলোমিটার বহন করে কানাইঘাট বাজারের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা করা ব্যবসায়ীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় স্থানীয় নয়াবাজারে দ্রুত সরকারী ব্যাংকগুলোর শাখা স্থাপন।
১১। লোভা নদীর পাথর কোয়ারীর পাথর শ্রমিকদের সঠিক মজুরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করণ ও দূর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের পরিবারের পূর্ণবাসনের সরকারি ব্যবস্থা করণ।
১২। ভারত থেকে আসা লোভা ও বরাক নদীর পাহাড়ি ঢল সুরমার পানিতে মিশে কৃষকের বোরো ধান ও মাছ চাষ তলিয়ে না যাওয়ার জন্য সুরমা নদীতে বেড়িবাধ নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় পয়েন্টে সুইচ গেইট স্থাপন।
১৩। রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষে পাথর কোয়ারী, খাস জলমহাল ও মৎস ইজারা প্রক্রিয়া প্রতি সনে সনে নতুনভাবে ইজারা স্বচ্ছ করণ।
১৪। পাহাড়ে বসবাসকারী জনগনের সেবার লক্ষে স্থানীয় দনা বাজারে দ্রুত মা ও শিশু হাসপাতাল নির্মাণ।
১৫। উপজেলা প্রকৌশলী দিয়ে ইউনিয়নের সর্বত্র পাহাড় পরির্দশন পূর্বক বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাসনের জন্য প্রয়োজনীয় স্থানে কালভাট ও সুইচ গেইট নির্মাণ।
১৬। বড়চাতল পেট্রোবাংলার হেলিপেডে পর্যটকের জন্য দ্রুত রেস্ট হাউজ নির্মাণ।
১৭। কাড়াবাল্লা বিদ্যানিকেতনকে সরকারী করে, দ্রুত কলেজে উন্নিতকরণ সহ অবহেলিত ইউনিয়নবাসীর প্রাণের অতী জরুরি দাবিগুলো পূরণে আপনার সু-দৃষ্টি চায় এলাকার জনগণ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কর্ম ও রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল এবং জনগণের সেবায় প্রকৃত মনোভাব সামাজিক যোগাযোগের সুবাধে আজ সারা পৃথিবীময় বিস্তৃত ও প্রশংসিত। তাই সর্বোপরি ডিজিটাল বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অবহেলিত এলাকাবাসীর প্রাণের দাবিগুলো পূরণ করে এলাকাবাসীর সার্বিক সমস্যা সমাধানে দ্রুত বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আপনার কাছে আকুল আবেদন। পরিশেষে আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় ইউনিয়নবাসীর পক্ষে- ডাঃ মোঃ নিজাম উদ্দিন সদস্য,সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, ১নং লক্ষী প্রসাদ পূর্ব ইউনিয়ন, কানাইঘাট, সিলেট, বাংলাদেশ।

  •  

সর্বশেষ ২৪ খবর