তীরশিলং জুয়ায় সয়লাব সিলেট নগরী : যদি একবার লাইগা যায়

প্রকাশিত: 12:52 PM, February 6, 2020

তীরশিলং জুয়ায় সয়লাব সিলেট নগরী : যদি একবার লাইগা যায়

নিজস্ব প্রতিবেদন :
ক্যাসিনোকান্ড ও অভিযানের সময় সিলেটেও ঘনঘন অভিযান চললে কিছুটা ভাটা পড়ে তীরশিলং নামের ডিজিটাল ও মোবাইলিং জুয়ায়। আটককৃতরা জেল-জরিমানা দিয়ে বের হয়ে আবারো শুরু করেন জুয়া। এই তীরশিলং জুয়া আবারো ছেয়ে গেছে সিলেট নগরী। ভ্রাম্যমান এজেন্টরা মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে জুয়ার আসর চালিয়ে যাচ্ছে জমজমাট। লুটে নিচ্ছে কোটি টাকা পাচার করছে দেশের বাইরে। নগরীর এমন কোন পয়েন্ট ও পাড়া মহল্লা নেই যেখানে চলছে না তীরশিলং। আইন শৃংখলাবাহিনী ও নামধারী সাংবাদিকরাও পেয়ে যাচ্ছেন তারে বখরা। নগরীর শেখঘাট, সুরমা মর্কেট, কাজিরবাজার, বন্দরবাজারের রংমহল পয়েন্ট, মেথরপট্টি, ছড়ারপার, লামাবাজার, বাগবাড়ি, কানিশাইল-সহ সবকটি স্থানে রয়েছে তীরশিং জুয়ার ভ্রাম্যমান এজেন্ট ও আসর। সম্প্রতি তীরশিলং জুয়া সিলেটে সয়লাব হয়ে পড়েছে।
অভিযোগে প্রকাশ, সিলেট নগরীর ১০নং ওয়ার্ড সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকাধীন মল্লাগুলোতে শিলং তীর এর অনলাইন গেইম অপারেটর এর মূলহোতা কলাপাড়া নিবাসী মোস্তাক আহমদ ও তার বিশ্বস্ত সহযোগী তুহিন, কামাল, জহির, রুবেল, সুমন, জাকির, মিজা ও কসাই নিজাম। এদের পরিচালনায় সিলেটের সর্বত্র শিলং তীর জুয়া খেলার ছয়লাব। এই চক্র অনলাইন অপারেটিং এর মাধ্যমে সিলেটের বিভাগের সর্বত্রই তাদের দৌরাত্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা অনলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় তাদের নিয়োগকৃত এজেন্টদের মাধ্যমে এসব খেলা পরিচালনা করে থাকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সিলেট নগরীর কলাপাড়াস্থ ১০নং ওয়ার্ডের পিছেরমুখে বিদ্যুৎ অফিস ও সরকারী কুষ্ঠ হাসপাতালের মাঠের ভিতরের খাস জমি অবৈধভাবে দখলে রেখে শিলং তীর ও শিলং নাইট তীর এবং ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদকের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। মোস্তাক আহমদের নেতৃত্বে এই তীর খেলা পরিচালিত হয়ে থাকে। তার বিশ্বস্ত সহযোগী তুহিন সিলেটের সকল এজেন্টদের কাছ থেকে দিন শেষে খেলার টাকা কালেকশন করে থাকেন। যার পরিমান দৈনিক প্রায় ১২-১৫ লক্ষ টাকা।
তার আরেক সহযোগী কামালের নেতৃত্বে ১০নং ওয়ার্ডের সর্বত্রই শিলং তীরের এই খেলা পরিচালিত হয়। শিলং তীর জুয়ার অনলাইন অপারেটর মোস্তাক দীর্ঘদিন থেকে লোকচক্ষুর আড়ালে আছে। সে অদৃশ্যভাবে তার বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে অনলাইনে এসব খেলা সর্বত্রই পরিচালিত করে। এলাকাবাসী তাদের এহেন কর্মকান্ডে অতীষ্ট। যার কারণে এলাকায় চুরি ডাকাতি ছিনতাই বেড়ে গেছে। এলাকাবাসীর দাবী এই শিলং তীরের অনলাইন মাস্টার মোস্তাককে আটক করতে পারলে শিলং তীর খেলা বন্ধ হয়ে যাবে এবং যুব সমাজ মাদক ও জুয়া থেকে মুক্তি পাবে।
গত বছরের ২৩ জুলাই ১০নং ওয়ার্ডের পিছেরমুখ স্থানে অবস্থিত বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৗশলী কার্যালয়ের ভিতর থেকে শিলং তীরের টুকেন কাটা অবস্থায় তুহিন আহমদ (২৮) কে পুলিশ গ্রেফতার করে। স্থানীয় সূত্রে আরো জানা যায়, মোস্তাকের নিজস্ব দুটি ওয়েবসাইট আছে। গুগলে ডুমেইন কিনে নিজস্ব এই ওয়েবসাইট দুটি পরিচালনার মাধ্যমে অনলাইন অপারেটিং করে শিলং তীর ডে ও শিলং তীর নাইট ওয়েবসাইট পরিচালনা করে গেইমলিং এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এবং উচ্চ পর্যায়ের মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
এলাকায় মদ জুয়া, ইয়াবা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় দিন দিন এলাকার যুব সমাজ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি এলাকায় চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা অহরহ বেড়ে চলেছে। এসবের পিছনে শিলং তীর জুয়াড়ী ও মাদকসেবীদের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এলাকাবাসীর দাবী শিলং তীর জুয়া এই মহানায়ক অনলাইন অপারেটর মোস্তাক আহমদ ও তার চক্রকে গ্রেফতারের মাধ্যমে সিলেটে তাদের এই মহাযজ্ঞ শিলং তীর জুয়া খেলা বন্ধ করতে আহবান জানান।
বিগত ১৯৯০ সালে সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকা ভারতের শিলং ও গৌহাটি থেকে চালু হয় এই তীর খেলা। গত ২৮ বছরে এই খেলাটির নাম এখন স্থানীয় ভাষায় ‘তীরশিলং’। শুরুর দিকে এই খেলার প্রচলন ছিল কেবল ভারতের কোলঘেঁষা সিলেটের সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় কথাগুলো বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়াইনঘাটের এক সাংবাদিক। তার ভাষ্য, সরাসরি সীমান্তে বসেই টাকার বিনিময়ে খেলায় অংশ নিতেন কিছু মানুষ। এরপর ধীরে ধীরে এই খেলা ছড়িয়ে পড়ে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন প্রান্তে।
জাফলংয়ের তীরশিলং জুয়ার এজেন্ট রাজ (ভুয়া নাম ব্যবহার করে থাকেন তিনি, ফেসবুকে তিনি সুলতান খান নামে রয়েছেন) একটি গণমাধ্যমকে জানান, ভারত থেকে শিলংয়ের জুয়াড়িরা দেশীয় এজেন্ট নিয়োগ করে দেয়। এতে বাড়তে থাকে সাধারণ ক্রেতার সংখ্যা। ইন্টারনেটে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জুয়া খেলার সুযোগে সাধারণ মানুষেরা এতে যুক্ত হতে শুরু করে।
দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে ১-৯৯ পর্যন্ত নম্বর বিক্রয় করা হয় যেকোনও টাকায়। যত মূল্যে বিক্রি হবে, তার ৭০ গুণ লাভ দেওয়া হবে বিজয়ী নম্বরের গ্রাহককে। অর্থাৎ, ১ টাকায় পাওয়া যাবে ৭০ টাকা। তিনি জানান, ১৯৯০ সালের দিকে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী জাফলং এলাকায় খেলাটির প্রচলন হয়। স্থানীয় ভাষায় টুকা খেলা, নম্বর খেলা, বোটকা খেলা, ভাগ্য পরীক্ষা খেলা, ডিজিটাল নম্বর খেলা ইত্যাদি নামেও পরিচিত ছিল এই জুয়া।
জাফলংয়ের একটি সংবাদসূত্র জানায়, ‘তীর খেলা সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে। দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে নম্বর কিনে আসতে হয়। সপ্তাহে ছয় দিন খেলাটি পরিচালিত হয়। ফলাফল ঘোষণা করা হয় প্রতদিন বিকাল ৫টায়। ভারতের ছুটির দিন রোববারে খেলাটি বন্ধ থাকে।’
সূত্রটি আরো জানায়, ‘তিন স্তরের লোকদের মাধ্যমে তীরশিলং খেলা হয়। দিনে দু’বার ড্র হয়। একবার বিকাল সাড়ে ৪টায়, দ্বিতীয় ড্র হয় সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে। এতে ভারতের শিলং থেকে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রতিদিনের শুরুতেই অনেকগুলো কমন নম্বর দেওয়া হয়। এই নম্বরগুলোকে কেন্দ্র করেই সারাদিন ছুটে বেড়ান তীরশিলং খেলতে আগ্রহীরা।’
‘নির্দিষ্ট এজেন্টরা মুহুরীর (সংগ্রাহক) মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ করে। মুহুরীর ড্র’ ছাড়া কোনও ব্যক্তিই সরাসরি তীরশিলংয়ে অংশ নিতে পারে না। এক্ষেত্রে যেটি দাঁড়ায়, প্রথমে এজেন্ট, এরপর মুহুরী, এরপর গ্রাহক।’জৈন্তার দরবস্তবাজারের এই-চায়ের দোকানটিতে তীরশিলং জুয়াড়ীরা অবস্থান করে।
এ তিন স্তরের বাইরে প্রথম গ্রুপটি ভারতের শিলং থেকে অনলাইনে জুয়াটি ছাড়ে। এরপর একটি অংশ এই জুয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশে। যারা সিলেটে জুয়া থেকে আয় করা টাকা সংগ্রহ করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যেহেতু গ্রাহকের সরাসরি ওয়েবসাইটে গিয়ে তীরশিলং খেলার সুযোগ কম, সেহেতু প্রথমে নির্দিষ্ট সংখ্যার বিপরীতে গ্রাহককে টোকেনের বিনিময়ে খেলায় অংশ নিতে হয়। এই টোকেন কেনায় একটি ফাঁক রয়েছে। এজেন্টরা নিজেরাই ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট কতগুলো সংখ্যার ওপর বাজি ধরে। সেই বাজির ওপর ভিত্তি করে যে সংখ্যাগুলোর ওপর বাজি আসে, ভারতের শিলংয়ে যোগাযোগ করে পেমেন্ট করে রেজাল্ট আনানো হয় অন্য নম্বরে। পরে যাদের বাজির দর কম, সে গ্রাহকদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
জাফলং বাজারের জনৈক পান ব্যবসায়ী বলেন, ‘শিলং বাজারে মামার বাজার নামে একটি স্থানে আছে। সেখানে রহস্যজনক ম্যানেজার আছে একজন। তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।’ তার দাবি, এই ম্যানেজারের সঙ্গে বিশ্বস্ত কেউ ছাড়া সাক্ষাৎ করতে পারে না। তার সঙ্গে থাকে কয়েকজন এজেন্ট। এই এজেন্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ মিলে কেবল বিশেষ কয়েকজন খেলোয়াড় বা গ্রাহকের।
জাফলংয়ের আরেক ব্যবসায়ী জানান, ‘জাফলংয়ে ১০-১২ বছর ধরে এ জুয়া চলে আসছে। সম্প্রতি এই খেলাটি সম্পর্কে জানাজানি হয়।’ বছর দুয়েক ধরে এতে অনেক মানুষ জড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
জুয়া খেলায় অংশ নেওয়া গ্রাহকদের তিনি জানান, ‘অনেকে একটিমাত্র সংখ্যায় বাজি ধরে। আবার অনেকে সমপরিমাণ টাকায় টানা ১০টি সংখ্যার ওপরে বাজি ধরে। টাকার হার এক টাকায় ৭০ টাকা পাওয়া যায়।’ কেউ কেউ ১৫ হাজার পর্যন্ত বাজি ধরে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, পরদিনের জুয়া ধরতে আগের দিন রাত থেকে সিরিয়াল দেওয়া শুরু হয়। এভাবে দিনে সর্বোচ্চ একটি নম্বরের কিছুসংখ্যক মানুষ বিজয়ী হয়। আর বাকি সব নম্বরের টাকা এজেন্টরা নিয়ে যায়।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ধারণা করা হচ্ছে, পুরো সিলেটে দিনে প্রায় ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার তীরশিলং বাজি ধরা হয়। কোনোদিন টাকার পরিমাণ আরও বেশি হয় বলে জানান অনেকে। আর এর মধ্যে কেবল কিছুসংখ্যক মানুষই বিজয়ী হয়, বাকিরা নিজেদের লগ্নিকৃত টাকা হারিয়ে দিনের পর দিন জুয়ায় ব্যস্ত থাকে এই আশায় যে, ‘যদি একবার লাইগ্যা যায়’।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর