তুমি জোছনার ছায়া কবি সঞ্জীবদা

প্রকাশিত: 12:54 PM, December 25, 2019

তুমি জোছনার ছায়া কবি সঞ্জীবদা

মিহির মোহন : আমি তোমাকেই বলে দেবো/ কী যে একা দীর্ঘ রাত / আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে/ আমি তোমাকেই বলে দেবো/সেই ভুলে ভরা গল্প/ কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়/ছুঁয়ে কান্নার রঙ, ছুঁয়ে জোছনার ছায়া/ছুঁয়ে কান্নার রঙ, ছুঁয়ে জোছনার ছায়া ।। -দাদা এ জোছনায় হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত আমি। ঘুরে ফিরে যাই প্রকৃতির মাঝে। এ সমাজে আমরা শুধু ভুল পথে যাই নিজের জন্য। মুখে বলি এক-আর করি আরেক। সরলতা মানুষ ভাবে দুবল। আমি মুক্ত হতে চাই –বিহঙ্গের মত উড়তে চাইেএ নীলাকাশ পানে।

দাদা তুমি ছিলে তারুণ্যের প্রাণ। প্রতিবাদী কন্ঠ। আর তোমার সাদাসিদে চলন-তোমার অহংকার। যেকেউ তোমার আপন হয়ে যেতো সহজে। তুমি ছিলে আড্ডাপ্রিয় মানুষ। তোমার মতো আরেকজন কবির সান্নিধ্যে আমি পেয়েছিলাম্ তিনি হলেন কবি দেলয়োরা হোসেন মঞ্জু। তিনি চলে গেলেন বছর খানেক আগে অতি অল্প বয়সে। মনে মনে ভাবি কেন এমন হয়। কেন তোমরা সুকান্ত অনুসারি? রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সঞ্জীব চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুরা কেন অকালে হেরে যান। না কি স্বামীজির মতো অল্প সময়ে সৃষ্টিশীল কাজ করে সবার মনে দাগ কেটে চলে যাওয়া।

দুদশক আগে তোমার সাথে দেখা। তোমার কথা মন মুগ্ধ হয়ে শোনা। জাফলং এর জলে যেন আজো যেন তোমার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। ইখতিয়ার ভাই এর মতো তারুণ্যে প্রাণে আজো আমরা চিরসবুজ। শ্রীপুরে তোমার সাথে আমাদের শেষবিকেলের ধামাইল আজো স্মৃতি কোটায়। বায়োস্কোপের গানটির লাইন কত যে গুনগুন করে গেয়েছি তার সীমা নেই।ৃহঠাৎ তোমায় মন দিয়েছি/ফেরৎ চাইনি কোন দিন/মন কি তোমার হাতের নাটাই/তোমার কাছে আমার ঋণ/মন হারালেও মনের মানুষ হারে না।
দাদা ছিলেন এক বিরাট প্রতিভা।দলছুট’ ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন একাধারে একজন খ্যাতিমান গায়ক, গীতিকার, সুরকার, নাট্য অভিনেতা, সাংবাদিক ও কবি। বিপ্লবী ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ। দাদা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। প্রকৃত অর্থে যারা বিপ্লবী, তারা এমন স্বভাবের হতেই দেখা যায়। তারা জানে, বিপ্লবীদের কখনো মৃত্যু হয় না। বিপ্লবীরা ফিনিক্স পাখির মতো বারবার জন্ম নিয়ে পৃথিবীর বুকে ফিরে আসে। তিনি সেই বিশ্বাস থেকেই হয়তো বলেছিলেন, ‘টিএসসি চত্বরে কিংবা আজিজ সুপার মার্কেটে আমি থাকবো না, সেটা কী কখনো কল্পনা করা যায়! গিয়ে দেখবেন, আমি সেখানে মস্ত আড্ডা জমিয়ে বসে আছি। জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটির আদলে আমি আউড়ে যাই, আবার আসিব ফিরে, টিএসসির মোড়ে, হয়তো কোন এক বিপ্লবীর বেশে।’ সঞ্জীব চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে চত্বরের নামকরণ করা হয় ‘সঞ্জীব চত্বর’। যদিও তিনি ছিলেন একজন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী কিন্তু তার ধ্যানে জ্ঞানে ছিল বিপ্লব। তাই তিনি গানটাকেই করেছিলেন প্রতিবাদের হাতিয়ার। ছাত্র জীবনে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে পড়েন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গেই সম্পৃক্ত ছিলেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে মিছিলে প্রতিবাদী গান গেয়ে আন্দোলনকে চাঙ্গা করে রাখতেন। বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়েও তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে বুক চেতিয়ে প্রতিবাদের গান গাইতেও কুন্ঠাবোধ করেননি। তার প্রতিবাদের ধরন তরুণ প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে উজ্জীবিত করে। তাই সঞ্জীব চৌধুরীকে প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

দাদা এ সিলেটেরই সন্তান। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে একটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু জমিদার পরিবারে সঞ্জীব চৌধুরীর জন্ম। তার বাবা গোপাল চৌধুরী এবং মা প্রভাষিণী চৌধুরী। তিনি তার পিতামাতার নয় সন্তানের মধ্যে ছিলেন সপ্তম। ছোটবেলায় হবিগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন ও এরপরে ঢাকার বকশী বাজার নবকুমার ইনস্টিটিউটে নবম শ্রেণীতে এসে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৯৭৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ১২তম স্থান অর্জন করেন। ১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেও মেধা তালিকায় স্থান করে নেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ভর্তি হন কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা শেষ না করে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। সাংবাদিকতায় পড়ার দরুন পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে গ্রহণ করেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে আশির দশকের শুরুর দিকে তিনি পেশাগতভাবে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। প্রথমেই দৈনিক উত্তরণে কাজ করা শুরু করেন তিনি। এরপর ‘ভোরের কাগজ’, ‘আজকের কাগজ’, ‘যায় যায় দিন’ প্রভৃতি দৈনিক পত্রিকায়ও কাজ করেছেন দাদা।

  •  

সর্বশেষ ২৪ খবর