‘দেখার হাওর’ ও ‘বড়দই’ বিলে একদিন

প্রকাশিত: 2:29 PM, December 23, 2019

‘দেখার হাওর’ ও ‘বড়দই’ বিলে একদিন

মোহাম্মদ মনির উদ্দিন: ‘দেখার হাওর’র উত্তর-পূর্ব প্রান্তে আমার বাড়ি।দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সুরমা নদী।সুরমা নদী ও দেখার হাওরের এক অংশের মধ্যবর্তী স্থানে আমবাড়ী অঞ্চল।নদী তীরে প্রাচীন আমবাড়ীবাজার।নদী ও হাওরের বুকে এই জনপদের মানুষের জীবনধারা বহমান।নদী ও হাওর কেন্দ্র করে মানুষের জীবন একাকার।জীবন-জীবিকা নদী ও হাওরেই আবর্তন।’দেখার হাওর’র একপারের একটি অংশে আমার বাল্য ও কৈশোর কাল পার করেছি।হাওর আমবাড়ী থেকে দুইআড়াই কিলোমিটার হবে।সুরমার তীরেই আমার গ্রাম।নদী তীর থেকে ভারতের মেঘালয় পাহাড় দেখা যায় ।দুরত্ব পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার হবে।আকাশ পরিস্কার থাকলে এই পাহাড় অপূর্ব লাগে।রাতে মেঘালয় পাহাড়ের কোনো কোনো স্থানে বাতি ঝলমল করে।অপলক দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।মিটিমিটি আলোর ঝলকানি হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়।মন ভরে যায়,ভালো হয়ে যায়।ভারত বর্ষ ভাগের পূর্বে নৌকাযোগে ‘কানলার হাওর’ পারি দিয়ে মেঘালয় পাহাড়ে গিয়ে কাঠ,লাকড়ি,অন্যান্য বনজ-ফলজ সামগ্রী নিয়ে আসতেন এ অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ।

লাকড়ি দিয়ে সুরমাপারে চুনাপাথর পোড়ে চুন তৈরি করতেন।চুনের ব্যবসা জমজমাট ছিলো।নদীর তীরে অনেক ‘পাইজ্জুয়া’ ছিলো।চুন পোড়ার জন্যে যে উঁচু স্থান তৈরি হতো তাকেই বলা হতো ‘পাইজ্জুয়া’।এখন আর এসব নেই।শীত মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে চুন পোড়ানোর কিছু অবশিষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়।মেঘালয় পাহাড়ে গিয়ে এক সময় হরিণ শিকার করা হতো।উৎসব করেই হরিণ শিকারে যাওয়া হতো।এক সময় সুরমা নদীতে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন হতো।এখন এসব নেই।কালের পরিক্রমায় বিলিন হয়ে গেছে।এই অঞ্চলের মানুষের অধিকাংশের পেশা ছিলো কৃষি।এখন ধরণ বদলে গেছে।শিক্ষা-দীক্ষায় কিছুটা অগ্রসর হয়েছে।এখানকার মানুষ সীমাহীন পরিশ্রমী এবং আত্মপ্রত্যয়ী।অপরাজনীতির কিছু টাউট-মাউট ও বাটপার ছাড়া বাকীসব সহজ-সরল মানুষ।আর্থিকভাবে অবস্থাসম্পন্ন না হলেও আত্মসম্মান রয়েছে।

এ অঞ্চলের মানুষ অবস্থার পরিবর্তনে দৃঢ়চেতা।এবং সাহসী ও পরিবর্তনে সংগ্রামী।ফলে আশি ও নব্বইয়ের দশক অনেক কিশোর-যুবক দেশান্তর হয়েছে।জীবন-জীবিকার তাগিদে।জমি-জমা বিক্রয় করে মধ্য প্রাচ্যে চলে যায় একাংশ।অতিদরিদ্র অংশ পাসপোর্ট ছাড়াই ইন্ডিয়া হয়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরান-তুর্কি হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করেছে।এই সংগ্রামী প্রবাসীরাই বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করছে।প্রবাসী শ্রমিকরাই পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে নিচ্ছে।এই শ্রমিকই পরিবারের জন্যে জীবনবাজী রেখে অমানুষিক পরিশ্রম করে যাচ্ছে।এখন অনেকটা আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হয়েছে।

এককালে এলাকার পঁচানব্বই ভাগ মানুষ কৃষি ও মৎস্যজীবী ছিলো।ফলে হাওর ও বিলে বোরো ধান রোপন ও মৎস্য আহরণ করার উপর নির্ভর চলতে হতো।এখনও অনেকেই ধান রোপন ও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে।আমার বাল্য ও কৈশোরকাল কেটেছে এই সবের মধ্যেই।তখন ও এখনের উপলব্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।বাড়িতে আসলে এখন আবারও হাওর,বিল,নদী,পাহাড়,জীব-বৈচিত্র্য,অন্যভাবে পরখ করে দেখি।বিশেষ করে মানুষের জীবনধারা।

সুনামগঞ্জ বিস্তৃর্ণ হাওরবেষ্টিত নিম্নাঞ্চল।বর্ষাকালে হাওর জলের বিশাল প্রান্তর।নীল আকাশ উপরে, সমতলে সমান জলের আস্তরণ।বর্ষাসময়ে হাওরপারের গ্রাম দেখলে একেকটা দ্বীপের মতো লাগে।শীতকালে জল ও কাদায় পরিপূর্ণ।একেক সময় হাওরের একেক রূপ।প্রাণ-প্রকৃতি ও জীব-বৈচিত্র্যে হাওর অনন্যসাধারণ এক অঞ্চল।হাওর মন কেড়ে নেয় অসীম সৌন্দর্যে।ফলে মুগ্ধতায় মনের গহীনে পুলক লাগে।হাওর যেনো নৈসর্গিক রূপে অপরূপ ক্ষেত্র।না দেখলে বিশ্বাস হবে না।হাওরাঞ্চল মৎস,পাথর,ধান ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর।দেশের অর্থনীতিতে এর অবদান অপরিসীম।

সুনামগঞ্জে প্রায় ১২৪ টি হাওর ও বিল রয়েছে।এ সব হাওরগুলোর মধ্যে অন্যতম হাওর হলো ‘দেখার হাওর’।সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার পূর্বদিক এবং সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের উত্তরপার্শ্বে এই হাওরের অবস্থান।সুনামগঞ্জ সদর-দক্ষিণ সুনামগঞ্জ-দোয়ারা-ছাতক এই চারটি উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে এই হাওর।এর আয়তন ৮৯১০ হেক্টর।বোরো ধানের এক বিশাল ভাণ্ডার।প্রায় ৯০ কোটি টাকার বোরো ধান উৎপন্ন হয় প্রতিবছর।এখানে রয়েছে বিশাল মৎস্যসম্পদ।হরেকরকমের মাছ।হাওরে কৈ,পুঁটি,কাতলা, মাগুর,আইড়, টেংরা, বাইম, চিতল, ভেদা, পাবদা, গজার, শোল,চাপিলা, কাইক্কা,বোয়াল, রুই, কালবাউস ইত্যাদি। বাংলাদেশে ২৬০ প্রজাতির মাছ রয়েছে।একসময় হাওরে ১৩০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেতো।এই মাছের মধ্যে প্রায় ৬২ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তি হয়েছে।

দেখার হাওরে নানা প্রজাতির জীব-বৈচিত্র্যের সমারোহ।এক সময় এই হাওরে শীতকালে পরিযায়ী অতিথি পাখির বেশ আনাগোনা ছিল।এখনও কিছুটা রয়েছে।দেশি পাখিদের মধ্যে বক, শালিক, চিল, শকুন, পানকৌড়ি, ডাহুক,মাছরাঙা ও অন্যান্য জাতের পাখির দেখামেলে।তবে দেশীয় প্রচুর সাদা বক দেখা যায়।এককালে না-কি অসংখ্য পাখির অবাধ বিচরণ ছিল।নানা ঝুঁকি ও শিকারদের আক্রমণ এবং পাখিবান্ধব পরিবেশ বিনষ্টের ফলে,এখন আর আগের মতো সেইসব পাখি নেই।অভয় আশ্রম তো নেই।ফলে দিনদিন কমে গিয়ে,এখন এই অবস্থা।আগামিতে হয়তো আরও বেহাল হবে।

লেখক : আইনজীবী, জর্জকোর্ট, সিলেট

  •  

সর্বশেষ ২৪ খবর