প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীব : এক আপোষহীন রাহবার

প্রকাশিত: 1:50 PM, October 22, 2018

প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীব : এক আপোষহীন রাহবার

শাহিদ হাতিমী

বীর মুজাহিদ প্রিন্সিপাল
বেঁচে থাকুন দীর্ঘকাল।
না, এমন ছন্দ স্লোগান আর শোনা যাবে না! তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। যেখানে গেলে কেউ ফিরে আসে না। একদিন সবই সেপথে যেতে হবে। আমরা শোকাহত। আমরা মুহ্যমান। তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি ছিলেন সাহসী বীর। যাঁকে বলা হতো ‘বাংলার সিংহ পুরুষ’। তিনি ছিলেন বাতিলের বিরুদ্ধে আপোষহীন সিপাহসালার। এমন সাহসী আলেম মিলবে কি আর? দিনের বেলা দ্বীনি আর রাতের বেলা তাহাজ্জুদ ও রুনাজারী ছিলো নৈমিত্তিক রুটিন। তিনি আজ নেই, এ কথা কেমনে মেনে নেবো! কিন্তু বাস্তবতা তাই, তিনি মাওলার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। ইন্নালিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহি রাজিউন। সকল প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে, এটা রহিত করার কোনো সুযোগ নেই।

প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান একটি চেতনা। জাগরণের মূর্তপ্রতীক। একটি আলোচিত নাম, একটি দীপ্ত ইতিহাস। বাংলাদেশের অনেক আলোড়ন সৃষ্টিকারি আন্দোলনের স্থপতি। তাঁর সবচে বড় কৃতিত্ব মুরতাদ তসলিমা নাসরিন বিতাড়ন ও সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত জামেয়া মাদানিয়া কাজিরবাজার মাদরাসা। সিলেট শহরের সুরমা নদীর তীরঘেষা পেয়াজহাটা মসজিদে যখন তিনি ইমাম ও খতীব তখন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই মাদরাসা। সময়ের ব্যবধানে তা সম্প্রসারিত হয়ে বিশাল প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। এই মাদরাসাকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে তিনি নিজের জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত ব্যয় করেছেন। লড়েছেন আমরণ। মুখোমুখি হয়েছেন অনেক হামলা এবং মামলার।

প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমানের জন্ম ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুলাই সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের হাজিপুর গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মরহুম মাওলানা মাহমুদ আলী। তিনি সিলেট শহরের হাওয়াপাড়া জামে মসজিদে দীর্ঘদিন ইমাম ছিলেন। মায়ের নাম মরহুমা আছিয়া খাতুন। প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমানের শিক্ষা জীবনের সুচনা ফুলবাড়ির বইটিকর প্রাইমারী স্কুল থেকে। পরে কিছুদিন রুস্তুমপুর কওমি মাদরাসায় পড়ালেখা করে ভর্তি হন ফুলবাড়ি আজিরিয়া আলিয়া মাদরাসায়। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে কৃতিত্বের সাথে ফাজিল এবং ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেট আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল পাশ করেন।

সুরমা নদীর তীরে কাজির বাজার পেয়াজহাটা মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে তিনি ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে কর্মজীবন শুরু করেন। মসজিদের পাশে একেবারে নদীর টানআইলে প্রতিষ্ঠা করেন জামেয়া মাদানিয়া মাদরাসা। প্রথমে তা মক্তব মাদরাসা হলেও পরবর্তীতে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ, সাধনার মাধ্যমে মাদরাসাটি বিরাট আকার ধারণ করে। এখন মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ক্লাস মাস্টার্স পর্যন্ত মাদরাসাটি জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে । বাবার প্রয়ানে জামেয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাঁরই বড় ছেলে মাওলানা ছামিউর রহমান মুসাকে। ইনশাআল্লাহ, বাবার এই আমানতকে তিনি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবেন আমাদের বিশ্বাস।

ছাত্র জীবন থেকেই তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। পরে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরবর্তী হযরত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর কর্তৃক খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হলে এতে যোগ দেন। পরে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক কর্তৃক খেলাফত মজলিস প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি তাতে যোগদিয়ে বিভিন্ন দায়িত্ব আদায় করেন। মৃত্যুোব্দী সময় তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় আমীরের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়াও ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে সিলেট এমসি কলেজের অধ্যাপক সর্দার আলাউদ্দিন কর্তৃক পবিত্র কুরআন অবমাননা, ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গা, ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে সাহাবাদের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলাম কর্তৃক অবমাননা, ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন কর্তৃক ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে কটাক্ক করে বই লেখা ইত্যাদির বিরুদ্ধে গর্জে উঠা আন্দোলনে প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান রাজনীতি এবং শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখিও করতেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অনুমানিক ২০টির মতো বই রয়েছে। অধ্যাত্মিকতায় তিনি ছিলেন শায়খুল ইসলাম আল্লামা সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানীর অন্যতম খলীফা আল্লামা আব্দুল জলিল বদরপুরী রহ. এর গুরুতপূর্ণ শিষ্য।

১৯ অক্টোবর ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ শুক্রবার বিকাল সাড়ে তিনটায় সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসার মাঠে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংসদ সদস্যগণ, সাবেক এমপি, রাজনৈতিক দলের প্রধান ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, দেশের শীর্ষ উলামা মাশায়েখ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুসজনসহ প্রায় লাখো মুসল্লি অংশ নেন। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মাওলানা মুফতি ইউসুফ রহমান।

প্রিন্সিপাল বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে। কীর্তিমানরা বেঁচে থাকে কীর্তিতে। তিনিও বেঁচে থাকবেন অগনন সুকর্মে। দ্বীনি বিষয়ে ভূমিকা রাখায় তাঁর আখেরাতও হবে কীর্তিময়। আমাদের যখন একজন প্রিন্সিপাল হাবীবের খুবই প্রয়োজন ঠিক তখনই তিনি চলে গেলেন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের উচ্চাসন দান করুন। বাংলাদেশের ইলমী-ইসলামী আকাশটা বড় জলদি তারকা শূণ্য হয়ে যাচ্ছে! আমরা হচ্ছি অভিভাবকহীন। প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান রহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাদের জন্য ছিলেন একজন আপোষহীন সাহসী রাহবার। তাঁর হুংকারে তরতর করে কাঁপতো বাতিলের হৃদয় ও মসনদ। তাঁর বিয়োগ পূরণ হবার নয়। শোকাহত পরিবারকে আল্লাহ ছবরে জামীল দান করুন। তাঁর রেখে আদর্শকে আমরা যেনো আঁকড়ে ধরতে পারি সেই তৌফিক দেন। আমরা তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাঁকে এবং আমাদেরকে ভালোবাসুন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট।

  •  

সর্বশেষ ২৪ খবর