মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নিবন্ধন নেই, অনুমোদনও নেই মুক্তিযোদ্ধা সংসদের

প্রকাশিত: 1:38 AM, December 26, 2019

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নিবন্ধন নেই, অনুমোদনও নেই মুক্তিযোদ্ধা সংসদের

 

ডেস্ক প্রতিবেদন :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে অস্থিতিশীল ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা চালিয়ে বারবার আলোচনায় আসা ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’-এর নেই সরকারি নিবন্ধন। নেই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের বৃহৎ সংগঠন কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদেরও অনুমোদন। গঠনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়া এ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি এখন দুটি। আছে বহিষ্কার আর পাল্টা-বহিষ্কারের খেলাও। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠার ১৬ মাসে অসংখ্য হামলার ঘটনা ঘটিয়ে সর্বত্র হয়েছে নিন্দিত। এর একাংশের নেতৃত্বে আছেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের ছেলেও।

গত বছর কোটাবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে কোটা প্রথা বাতিলের পরিপত্র জারি হওয়ার পর রাজধানীর শাহবাগে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা এর বিরুদ্ধে ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তান’ ব্যানারে আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের মধ্যেই এরা ৪ অক্টোবর (২০১৮) ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ নামে আর একটি সংগঠন গঠন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিনকে সংগঠনটির আহ্বায়ক এবং সাবেক সড়ক ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শাজাহান খানের ছেলে আসিবুর রহমান খানকে সদস্য সচিব করা হয়। এরপর চলতি বছরের মার্চে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পদবঞ্চিত নেতা আমিনুল ইসলামকে সভাপতি ও আল মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গঠন করা হয়।

প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৬ মাসে নানা ঘটনা ঘটিয়ে বারবার আলোচনায় এসেছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। বিশেষ করে কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর পৈশাচিক হামলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই সংগঠনের ব্যানারে কর্মসূচি, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলার মতো একাধিক ঘটনা ঘটিয়ে নিন্দিত হয়েছে সর্বত্র। সর্বশেষ গত ২২ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরু ও তার সহযোগীদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালিয়ে খবরের শিরোনাম হয় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। এ হামলায় ভিপি নুরুসহ অন্তত ২৪ জন আহত হন। এদের মধ্যে তুহীন ফারাবীসহ গুরুতর আহত ৪ জন। এরইমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আল মামুনসহ তিন হামলাকারীকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

এসব ঘটনার পর সর্বত্র আলোচনায় এসেছে ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ এবং এর কার্যক্রম। কারা এসবের নেতৃত্বে? কে বা কারা আছেন এদের পেছনে। আর সংগঠনটির নাম করণে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ থাকায় কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অনুমোদন আছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। প্রশ্নের উদ্রেক করেছে সংগঠনটির নিবন্ধন নিয়েও।

‘মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ’ গঠনের পর গত ১৬ মাসেও নেয়া হয়নি নিবন্ধন। এমনকী নিবন্ধনের জন্য আবেদনও করা হয়নি সমাজসেবা অধিদফতরে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের বৃহৎ সংগঠন ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদ’-এর কাছ থেকেও নেই কোনো অনুমোদন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে ‘মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ’ গঠনের পর গত ১৬ মাসেও নেয়া হয়নি নিবন্ধন। এমনকী নিবন্ধনের জন্য আবেদনও করা হয়নি সমাজসেবা অধিদফতরে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের বৃহৎ সংগঠন ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদ’-এর কাছ থেকেও নেই কোনো অনুমোদন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সঙ্গে এই সংগঠনের নেতাদেরও কোনো যোগাযোগ নেই বলে জানিয়েছেন সংসদের একাধিক কর্মকর্তা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সংগঠনটি গড়ে উঠেছিল তা শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। সংগঠনটি গঠনের পরপরই এতে ভাঙন হয়। মূল সংগঠন থেকে আলাদা হয়ে যায় সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। এতে দুই অংশই ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নাম ব্যবহার করে উগ্র আচরণ শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের মূল অংশটি কথাবার্তায় ‘সক্রিয়’ ও ‘উগ্রতা’ ছড়ালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাটি নিজেদের মূল মঞ্চ দাবি করে মারমুখী সব কর্মসূচি পালন করতে থাকে।

চলতি বছরে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চে ভাঙন হয়েছে। দুটি পক্ষই একে অপরকে বহিষ্কার করেছে। এর একটি পক্ষ মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদলের ওপর হামলা করেছে। একাধিকবার হামলা করেছে ভিপি নুরুল হক নুরুর ওপর। অভিযোগ রয়েছে, এই অংশটির নেতৃত্বের পেছনে শক্তি জুগিয়েছেন ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতা গোলাম রাব্বানী। জানা গেছে, আ ক ম জামাল উদ্দিনের অংশটি এসব হামলার প্রতিবাদ জানালে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আমিনুল ইসলাম ও আল মামুন নিজেদের আসল মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতা দাবি করে জামাল উদ্দিন ও আসিফকে বহিষ্কারের কথা জানান। তারা জানান, জামাল উদ্দিন ও আসিফ ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চে’র কেউ নন।

আ ক ম জামাল উদ্দিন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নিয়ে আমরা মূলত কাজ শুরু করি চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে। ডাকসু নির্বাচনের পরে এই কার্যক্রম জোরালো হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষাই ছিল আমাদের সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য।’

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের আহ্বায়ক) আ ক ম জামাল উদ্দিন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নিয়ে আমরা মূলত কাজ শুরু করি চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে। ডাকসু নির্বাচনের পরে এই কার্যক্রম জোরালো হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষাই ছিল আমাদের সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য।’

জামাল উদ্দিন আরো বলেন, ‘আমিনুল ইসলাম ও আল মামুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন। কিন্তু তাদের নানা অপকর্ম, একে-ওকে মারধরের কারণে গত অক্টোবরে তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়।’ ছাত্রলীগের বিদ্রোহী যে অংশটি আছে, যারা বহিষ্কার হয়েছে তাদের মদদে এরা নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে বলেও দাবি করেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের এই প্রতিষ্ঠাতা।

এ বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘নুরুল হকের ওপর হামলার সঙ্গে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। নুরুর উসকানিমূলক আচরণেই হামলা হয়ে থাকতে পারে।’

বহিষ্কার পাল্টা-বহিষ্কারের বিষয়ে আমিনুল বলেন, ‘আ ক ম জামাল উদ্দিন মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চের কেউ নন। তিনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানও নন। তাকে আহ্বায়ক করা হয়েছে সম্মানের জায়গা থেকে। তিনি আর কমিটিতে নেই। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ থেকে তাকে বাদ হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড এর সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ যারা গঠন করেছিল, তারা তাদের স্বার্থে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। আগে আমাদের সঙ্গে ছিল। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কোনো নিবন্ধন নেই। এ ধরনের সংগঠন করতে কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অনুমোদন নিতে হয়।’

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর