সিলেট নগরীর সড়ক সম্প্রসারণ অবৈধ স্ট্যান্ডবাজদের পোয়াবারো

প্রকাশিত: 1:00 PM, February 6, 2020

সিলেট নগরীর সড়ক সম্প্রসারণ অবৈধ স্ট্যান্ডবাজদের পোয়াবারো

নিজস্ব প্রতিবেদন
যানজট নিরসনের জন্য রাস্তা সম্প্রসারণ করতে নেয়া হলো নগরবাসীর কোটি কোটি টাকার ভূমি। ব্যয় করা হলো হাজারো কোটি টাকা। এমনকি আল্লাহর ঘর মসজিদ সরিয়ে দিয়ে মসজিদের জায়গা নেয়া হলো রাস্তায়। তবুও নিরসন হয়নি সিলেট নগরীর যানজট। এতে করে পোয়াবারো হয়েছে স্ট্যান্ডবাজ, চাঁদাবাজ, ঠিকাদার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ ও নেতা-হোতাদের। বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের অবৈধ আয়ের উৎস। অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও লিমিটেশন না করে সম্প্রসারণের এহেন তৎপরতা নগরবাসীর জন্য আত্মঘাতি উন্নয়ন বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। (৬ এর পৃষ্ঠায় দেখুন)
বাস্তবে দেখা যায়, নগরীর সর্ববত্র সম্প্রসারিত রাস্তাগুলোতে সম্প্রসারিত হচ্ছে অবৈধ স্ট্যান্ড। রাস্তায় রাস্তায় এলোপাতাড়ি যানবাহন, চাঁদাবাজ ও পুলিশের টাকা আহরণ। সিলেট নগরীর ব্যস্ততম কোর্ট পয়েন্ট, বিমানবন্দর রোড, ওসমানী হাসপাতাল রোড সহ সবক’টি রাজপথের এমন দৃশ্য নিত্যদিনের। নগরীতে লাগামহীন স্ট্যান্ডবাজি,চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রনহীন যানবাহনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কর্তৃপক্ষের নেই কোন চিন্তা। শুধু চিন্তা অপরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে নগদ নারায়ন ও নগরবাসীর লাখো-কোটি টাকার ভূমি’র অপচয়।
সিলেট নগরীর কেন্দ্রবিন্দু কোর্ট পয়েন্ট, বিমানরবন্দর রোডের আম্বরখানা, রিকাবীবাজার, লামাবাজার, নাইওরপুল ও মেডিকেল রোডে এসেই সাধারণ মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে যায়। যানজটের যাতাকলে বিমান যাত্রী, রেলযাত্রী ও বিদেশযাত্রীরাও পড়েন চরম বিপাকে। নগরীতে যানজট সৃষ্টির মূলে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় একশ’ মাইক্রোবাস, হিউম্যান হলার, ইমা-লেগুনা, সিএনজি অটোরিকশা ও ট্রাক স্ট্যান্ডকে দায়ী করছেন সচেতন নগরবাসী। পাশপাশি দায়ী করা হয়ে থাকে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও লিমিটেশনে কর্তৃপক্ষের অবজ্ঞা,ব্যর্থতা ও হীনমন্যতা।
অবৈধ এসব স্ট্যান্ড উচ্ছেদে একদা সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত নির্দেশ দিলেও তা উপেক্ষিত হয়েছে। সিটি করপোরেশন বা পুলিশ প্রশাসন কেউই স্ট্যান্ড উচ্ছেদে আগ্রহ দেখায় নি। যদিও নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নগরীতে বৈধ কোনো স্ট্যান্ড নেই। অন্যদিকে পুলিশ বলে থাকে-স্ট্যান্ড উচ্ছেদে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মূলত স্ট্যান্ড উচ্ছেদ নয়, এর পরিবর্তে চাঁদা ও বখরা আদায় অব্যাহত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন সচেতন নাগরিকবৃন্দ। আগে অল্পকিছু কয়েকটি পরিবহণ স্ট্যান্ড থাকলেও এখন ব্যস্ততম নগরী সিলেটের সবক’টি রাস্তার দুইপাশ ও একপাশ জুড়ে অবৈধ স্ট্যান্ডের সংখ্যা প্রায় একশত। দৈনন্দিন এ সব স্ট্যান্ড থেকে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকার চাঁদা। ভাগ বাটোয়ারা করা হয় স্ট্যান্ডবাজ,পুলিশ ও নেতা-হোতা ও কর্তব্যক্তিদের মাঝে। স্ট্যান্ডগুলোর অলিখিত লিজও দেয়া হয়ে থাকে।
নগরীর জজকোর্জ মসজিদের সামনে বহু জায়গা ছিল আদালতের। সুরমা পয়েন্টকে সম্প্রসারন করতে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জজ আদালতের ভূমি রাস্তার অন্তর্ভুক্ত করা হয় রাস্তায়। ফলে রাস্তার অপর পাশে নগরীর প্রবেশদ্বার সুরমা মার্কেট ঘেষেই গড়ে ওঠে একাধিক অবৈধ সিএনজি অটোরিক্সা স্ট্যন্ড। কোর্ট পয়েন্ট বা সিটি পয়েন্টে আগে থেকেই ছিল সীমিত পরিসরে মাত্র ২০টি প্যডেল রিক্সা পার্কিং এর অনুমতি। বর্তমানে কোট পয়েন্টকে স্ট্যান্ড বানিয়ে তা সম্প্রসারণ করে কালেক্টরেট মসজিদের সামন পর্যন্ত কয়েকটি স্ট্যান্ডে বিভক্ত করা হয়েছে। মদিনা মার্কেট, তেমূখী, টুকের বাজার ও ছাতক গোবিন্দগঞ্জমূখী অটোরিক্সার আলাদা আলাদা স্ট্যান্ড। মসজিদের সামন দখল করে গড়ে ওঠেছে ছাতক গোবিন্দগঞ্জগামী ইমা ও লেগুনা স্ট্যান্ড। এদিকে মধুবন মার্কেটের সামন থেকে শুরু করে জেইলরোড পর্যন্ত গড়ে ওঠেছে দুটি অটোরিক্সা স্ট্যান্ড। ধোপাদিঘীর পারে ওসমানী উদ্যানের সামনে দুই লেনের রাস্তা হলেও একটি লেন পুরো দখলে নিয়ে গেছে কার মাইক্রেবাস লেগুনা সহ বিভিন্ন যানবাহনের স্ট্যান্ড। মাত্র একটি লেন দিয়েই যাতায়াত করে থাকে যাত্রী বহনকারী যানবাহন।
সিলেট নগরীর গুরুত্বপূর্ণ দুটি সড়ক হচ্ছে চৌহাট্টা থেকে রিকাবীবাজার ও চৌহাট্টা থেকে আম্বরখানা সড়ক। প্রথম সড়কটির দুই পাশ এবং দ্বিতীয় সড়কটির এক পাশের প্রায় আধা কিলোমিটার অংশ দখল করে কার-মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড বসিয়েছেন পরিবহণ শ্রমিক মালিক নামের চাঁদাবাজরা। এ কারণে যাত্রীবাহী যান ও জনচলাচলে তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা, প্রতিনিয়ত দেখা দিচ্ছে যানজট।
সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান সাংবাদিকদের জানান,এই মাইক্রোবাস স্ট্যান্ডটি উচ্ছেদের জন্য বেশ কয়েকবার সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সিলেট পর্যটন এলাকা হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকেরা এখানে আসেন এবং বিভিন্ন পর্যটন স্পটে যাওয়ার জন্য ভাড়ায়চালিত মাইক্রোবাস খোঁজেন। তাই নগরবাসীর দুর্ভোগ সত্ত্বেও আগত পর্যটকদের কথা বিবেচনায় রেখে স্ট্যান্ডটি উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, চৌহাট্টা থেকে রিকাবীবাজার ও আম্বরখানামুখী দুটি সড়কে প্রায় ৫ শ’ মাইক্রো ও অন্যান্য গাড়ি সারিবদ্ধভাবে রয়েছে। আম্বরখানামুখী সড়ক থেকে বেশির ভাগ গাড়ি ভাড়ায় জেলা শহর সুনামগঞ্জ, ছাড়া ছাতক ও দিরাই-শাল্লায় যাতায়াত করে। আর রিকাবীবাজারমুখী ভিআইপি সড়ক থেকে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলাসহ দেশের নানা প্রান্তে ভাড়ায় যায় এসব গাড়ি। ভাড়ায় চালানোর অনুমতি না থাকলেও অধিকাংশ প্রাইভেট কার মাইক্রোবাস এ স্থান থেকে ভাড়ায় চালানো হয়ে থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাইভেট মাইক্রোবাসের দু’জন চালক জানান, নগরীতে অধিকাংশ কার ও মাইক্রোবাস প্রাইভেট। এগুলো ভাড়ায় চালানোর অনুমতি নেই। কিন্তু আইন বহির্ভুত এগুলো ভাড়ায় চালানো এখন নিয়মে পরিনত হওয়ায় মালিকগন নিজেদের প্রয়োজনে নয়, ভাড়ায় চালিয়ে টাকা কামানোর উদ্দেশ্যেই এগুলো ক্রয় করে থাকেন এবং প্রত্যহ চালকদের দিয়ে রাস্তায় বের করে দেন। মাইক্রো রাখার জন্য নির্ধারিত কোনো স্ট্যান্ড না থাকায় চালকরা এই দুটি সড়ককে অস্থায়ী স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করছেন। এখানে প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ শ’ গাড়ি থাকে। এসব গাড়ি ভাড়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে চলাচল করে। এভাবে সড়ক দখল করে স্ট্যান্ড বানানোয় এই দুটি সড়কে সারাক্ষণ যানজট লেগে থাকে বলে তাঁরা স্বীকার করেছেন।
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেট-বিমানবন্দর ভিআইপি সড়কের পাশে থাকা আম্বরখানা মসজিদটি ভেঙ্গে এর পূর্ব ও দক্ষিণাংশের ভিট নেয়া হয় রাস্তার অভ্যন্তরে। বিনিময়ে মূল ভিট থেকে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সরিয়ে সরকারীভাবে নতুন করে নির্মান করে দেয়া হয় মসজিদটি। রাস্তা সম্প্রসারিত হওয়ামাত্র সেই মসজিদের দক্ষিণে রাস্তার অপর পাশে গড়ে ওঠে ছাতক, গোবিন্দগঞ্জ, টুকেরবাজার ও লামাকাজীগামী সিএনজি অটোরিক্সা স্ট্যান্ড।
মসজিদের সামনের সম্প্রসারিত রাস্তা থেকে আম্বরখানা মাছবাজার পর্যন্ত অংশ দেখলে মনে হয় এটি সিএনজি অটোরিকশা টার্মিনাল এবং এ টার্মিনালের ভেতর দিয়েই সিলেট-বিমানবন্দর ভিআইপ রোড। দুই লেনের এ সড়কের দুই পাশেই একাধিক সারিতে দাঁড় করিয়ে রাখা অটোরিকশা। এর পর সড়কের অবশিষ্ট যে অংশটুকু থাকে তাতে কোনো মতে এক সারিতে যান চালাচল করতে পারে। তাতেও অটোরিকশা চালকদের দৌরাত্ম্য। রাস্তার মাঝখানে অটোরিকশা থামিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ সেরে নেওয়া, যাত্রী ওঠানো-নামানোর কাজ অবলীলায় করে তারা। থোড়াই কেয়ার করে না মানুষের ভোগান্তির কথা।
এলাকাবাসী জানান, নগরের কোনো সড়ক সম্প্রসারণ হলে যেন অটোরিকশা ওয়ালাদেরই পোয়াবারো। ইচ্ছেমতো অস্থায়ী স্ট্যান্ড বানিয়ে নেওয়া হয় সম্প্রসারিত রাস্তা, শুরু হয় চাঁদাবাজি ও বখরাবাজি। যার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ নগরের আম্বরখানা পয়েন্ট। চার রাস্তার সংযোগস্থলের চারটি মোড়েই গড়ে উঠেছে চারটি অটোরিকশার স্ট্যান্ড। এর মধ্যে আম্বরখানা পয়েন্টের পূর্ব দিকে টিলাগড়-আম্বরখানা সড়কে অটোরিকশার স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। এখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যত্রতত্র অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলাসহ চালকদের দৌরাত্ম্যে সারা দিনই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণে এই সড়কে যানজট লেগেই থাকে। একই অবস্থা পয়েন্টের দক্ষিণ দিকে আম্বরখানা- বন্দরবাজার-দক্ষিণ সুরমা রোডের অটোরিকশা স্ট্যান্ড এবং উত্তর দিকে আম্বরখানা-বিমানবন্দর সড়কে আম্বরখানা মসজিদের সামনে স্ট্যান্ড লেগেই আছে। এসব স্ট্যান্ডের চালকরা কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র দাঁড় করিয়ে রাখে অটোরিকশা। কখনো কখনো রাস্তার অর্ধেক দখল করে দুই সারি দাঁড় করিয়ে রাখতে দেখা যায়। এতে করে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সড়ক সম্প্রসারণ করা হলেও তার কোনো সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরের ভেতরে এসব পরিবহন স্ট্যান্ড ও রাস্তার প্রকৃত মালিক সিলেট সিটি করপোরেশন। সরকারের পালাবদলের সঙ্গে এসব স্ট্যান্ডের কর্তৃত্ব হাত বদল হয়। সব স্ট্যান্ড থেকে আয় করা অর্থ নেতাদের পাশাপাশি পুলিশসহ বিভিন্ন মহলের পকেটস্থ হয়ে থাকে। পরিবহণ মালিক-শ্রমিকদের দোহাই দিয়ে স্ট্যান্ড বসানো হলেও চাঁদা আদায় করে যারা তারা আদৌ পরিবহণ শ্রমিক কিংবা মালিক নয়। স্ট্যান্ডগুলোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে রাজনৈতিক নেতা ও কর্তা ব্যক্তিদের হাতে। যানবাহন ভেদে বিভিন্ন হারে দৈনিক চাঁদা তুলেন স্ট্যান্ড মাস্টার নামে নেতাদের সুবিধাভোগী প্রতিনিধিরাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করে জানায়, সময়মতো চাঁদা না দিলে গাড়ি ভাংচুর করা হয়। অতীতে এমন ঘটনার নজির রয়েছে। এ দৃশ্য শুধু এখানেই নয়, পুরো নগরজুড়েই।
সিলেট মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্তাব্যক্তি জানান, একে তো সরু সড়ক, এর মধ্যে আবার সড়কের একাংশ দখল করে অবৈধভাবে মাইক্রোস্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছে। শাসক দলীয় নেতাদের অনুগত করতে গিয়েই পুলিশ স্ট্যান্ড উচ্ছেদে স্বপ্রনোদিত কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্তাব্যক্তি সাংবাদিকদের বলেন, ‘নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে মাইক্রোস্ট্যান্ড নির্মাণের জন্য আমরা জায়গা খুঁজছি। জায়গা না পাওয়ায় স্ট্যান্ডগুলো আপাতত উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না। তার মতে অবধৈভাবে ভাড়ায় চালিত কার মাইক্রোবাসের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে স্ট্যান্ড অনেকটা সীমিত পরিসরে চলে আসেতো বলে জানান তিনি।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর