১৯৭১ সালে নয় মাস যুদ্ধে জীবন বাজি রাখা বাঘার যুদ্ধের কথা

প্রকাশিত: 12:52 PM, December 30, 2019

১৯৭১ সালে নয় মাস যুদ্ধে জীবন বাজি রাখা বাঘার যুদ্ধের কথা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : দেশ মাতৃকার টানে ১৯৭১সালে ৭মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শোনার পর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের বীর নগর গ্রামের বীর সেনানী নুরুল ইসলাম(৬৫)ওরফে বাঘা দেশ মাতৃকার টানে যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নিতে চাইলে পরিবারের পক্ষ থেকে আসা নানান বাঁধা।

তখন মনে ছিল অদম্য সাহস আর দেশ প্রেম। সেই সময় কার কথা জানান,স্বীকৃতি না পাওয়া মুক্তিযুদ্ধা নুরুল ইসলাম বাঘা। তিনি দু’ছেলে আর তিন মেয়ে সন্তানের জনকের জীবনের শেষ ইচ্ছা যুদ্ধ করেছি জীবন বাজি রেখে আর এখন মুক্তিযুদ্ধার স্বীকৃতি পাবার জন্য ধারে ধারে ঘুরছি বেচেঁ থেকেই মুক্তিযুদ্ধার স্বীকৃতি টা যেন পাই।

আদর্শ আর সাহস মনোবল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ৬৯সালে সভা করেছিলেন জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনার বাজারে সেখানে গিয়েছিলেন বাঘা। ৭০সালে সুনামগঞ্জে আসেন সেখানেও তিনি যান। ১৯৭১সালে তিনি ছিলেন ১৭বছরের যুবক টকবগে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর শুরু করে নানান ভাবে অত্যাচার শুরু করার পর ১৯৭১সারে ৭শে মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমনের সেই জ্বালাময়ী ভাষণ রেডিওতে শোনার পর যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নিতে তাহিরপুর উপজেলা থেকে যাবার সময় পরিবারে মা,বাবা আর দুই ভাই। তিনি ছোট। পরিবারের ছোট হওয়ায় ছিলেন খুবেই আদরের কিন্তু দেশের জন্য কিছু করতেই হবে কোন বাঁধায় যখন মানতে নারাজ নুরুল ইসলাম বাঘা।

তখনমমতাময়ী মা সমতা জাহান বিবি যুদ্ধে যাবার সময় ছেলেকে বলেছিলেন,কখনও শরণার্থী নারী নির্যাতন,সোনা রুপা টাকা পয়সা বা অন্য কোন কিছুর প্রতি কোন লোভ রাখবি না। রাখলে যুদ্ধে স্বাধীনতার স্বাদ পাবি না। একটা কথা মনে রাখবি বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হবে বলে যুদ্ধে পাঠিয়ে দেন।

এর পর প্রথমেই নুরুল ইসলাম বাঘা বড়ছড়া ৫নং সাব সেক্টরে যান। সেখান থেকে তাকেসহ অনেককেই পাঠানো হয় প্রশিক্ষণে ইকওয়ান ট্রেনিং সেন্টারে রাশিয়ান এলএমজি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ শেষে আবারও বরছড়া ৫নং সাব সেক্টরে চলে আসেন। তখন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। তিনি ২মাস প্রথমে দায়িত্ব নেবার পর দায়িত্ব পান মীর শওকত। এর পর কোম্পানি কমান্ডার মেজর ডিন(মোসলেম উদ্দিন)। নুরুল ইসলাম বাঘা জানান,অনেক যুদ্ধ করেছি। তার মধ্যে জুলাই মাসে বড়ছড়া ৫নং সাব সেক্টর থেকে প্রথম যুদ্ধ করি নিজ গ্রামে সেখানে সারাদিন ৩১জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে সারাদিন মুখোমুখি তুমুল যুদ্ধের নেতৃত্ব দেই আমি। তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের বীরনগর-উজান তাহিরপুর গ্রামের মধ্যবর্তী স্থান মিছির আলীর বাড়িতে ছিল তখন পাকিস্তানীদের ব্যাংকার। সারাদিন যুদ্ধের পর নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা না থাকায় আসরের পরে সকল মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে বেক করে টাকাটুকিয়া রেখে আসা নৌকা দিয়ে টেকেরঘাট চলে যাই।

উপজেলার আলীপুর,মারালা মারজীবনপুর,পাটাবুকা,সুলেমানপুর মুক্তিযুদ্ধারা গেরাও করে রাখা হয়েছিল আর প্রতিটি গ্রামের ৫-৬জন মুক্তিযুদ্ধা অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানীদের আতংকে রাখার জন্য এক বা দুটি গুলি করে হত আর
পাকিস্তানিরা শত শত গুলি করত।

১১ই অক্টোবর যুদ্ধ করি জীবন টাকে হাতে নিয়ে এইদিন ভেবেছিলাম আর বেঁচে ফিরতে পারব না। তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের তহশিল অফিসের যাকে কাচারি বলা হয়। সেখানে পাকিস্তানীদের ঘাটি ছিল। সেখান থেকে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে অত্যাচার চালাত। খবর পেয়ে ট্যাকেরঘাট ৫নং সাব সেক্টর থেকে বড় ভাই আলী আমজাদের নেতৃত্বে ভোরে শাহগঞ্জ গ্রামে নৌকা রেখে পায়ে হেঁটে গ্রামের ভিতর দিয়ে কাচারির পূর্ব দিকে পাকিস্তানীরা মাঝে পুকুর মুক্তিযুদ্ধারা পশ্চিম দিকে সবাই অবস্থান নেই। এই মুখোমুখি যুদ্ধ করার সময় সহযোদ্ধা কাশেম মাথা উচিঁয়েছিল পাকিস্তানীদের অবস্থান দেখার জন্য সাথে সাথেই বুকে বুলেট বৃদ্ধ হয়ে নিহত হয়। পাশেই ছিলাম আমি। কাশেম মারা যাবারপর সবাই যে যার মত ফিরে যায়। আমি আর কাশেম এলএমজি চালাতাম। ভারী অস্ত্রসহ কাশেমকে আনার চেষ্টা করি কিন্তু পারি নি।

পরে কোন রকম নিজেকে বাঁচিয়ে শাহগঞ্জ বাগানে পায়ে হেঁটে এসে বিকালে নৌকা দিয়ে ট্যাকেরঘাট চলে যাই।
পাকিস্তানীদের সব ধরনের রসদ আসত সাচনা জামালগঞ্জ নদী পথে দিয়ে পরে রাজাকারদের মাধ্যমে নৌকা দিয়ে বেলী তেগাংগারখাল(তিন নদীর মুখ)শনি হাওরের পাড় হয়ে তাহিরপুর আসত। তা বন্ধ করার জন্য আমি ১৫ই অক্টোবর
রাধানগর ডিফেন্স থেকে ৩১জন মুক্তিযুদ্ধা নিয়ে আমি (নুরুল ইসলাম বাঘা)নেতৃত্ব দেই বেলী তেগালগা(তিন নদীর মুখ)পাকিস্তানীরা দক্ষিণ পাড়ে জামালগঞ্জ আর উত্তর পাড়ে বেলী গ্রামের যুদ্ধে। সেখানে ৪ডিসেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করে চাল, ডাল, ঘি, গোলাবারুদ নিয়ে তাহিরপুর পাকিস্তানীদের কাছে রাজাকার দের দিয়ে পাঠাত পাকিস্তানিরা তাই সেখানে প্রতিরোধ করে লুটও করেছি। ফলে খাবারসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস না পাওয়ায় পাকিস্তানীরা তারা বাধ্য হয় কাচারি থেকে চলে যেতে।

নুরুল ইসলাম বাঘা আরো জানান,যুদ্ধ পরবর্তীতে সময়ে জীবন বড়ই কষ্টে কাটে। কারণ তখন কোন কাজ বা চাকরী করার কোন সুযোগ পাই নি। প্রচুর কুস্তি খেলা করতেন। ১৫আগষ্টের পর দিন বেরাজালি খেলায় যাওয়ার সময় খবর পান
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের দরপাকর শুরু হলে তাহিরপুর উপজেলার আব্দুর নুর আখঞ্জি, আব্দুল আজিজ তখনকার চেয়ারম্যান,গোলাম হোসেন মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘটক ও
আ,লীগের নেতারা বলেন তর নামে অনেক অভিযোগ(প্রতিটি যুদ্ধে পাখির মত পাকিস্তানী,রাজাকারদের হত্যা করায় সে কারণে)ঘা ডাকা দিতে হবে। এরপর ঘা ডাকা দিতে চলে যাই ভৈরব। সেখানে রাজ মিস্তর কাজ করে সেখান থেকে ঢাকা
কমলাপুর সেখানে থেকে আবার পুরাণ ঢাকা স্বর্ণের দোকানে কাজ করি। পরে বিয়ে বকশি বাজারে। দোকানে কাজ করার কারণে হিন্দুদের সাথে ভারত আসা যাওয়া হত পাসপোর্ট ছাড়াই। তাদের আগেই ভারতের বনগাঁ রেলস্টেশনে চলে
যেতের চেনা যানা থাকায়। তখন তিনি ভারত থেকে জরঝেট উরনা,সিলেঙ্গ ফেনসহ বিভিন্ন জিনিস এনে বিক্রি করা লাভবান হন। পরে পাসপোর্ট ছাড়া যেতে না দিলে ভারত। এরপর ১৯৮৮সালে ভারত বোম্বে চলে যান। এর পর আর
বাংলাদেশে আসা হয় নি। ২০১৫সালে বাংলাদেশে ঢাকা স্ত্রী আর সন্তানদের কাছে এসে এরপর তাহিরপুর নিজ গ্রামে চলে আসেন। এসেই তিনি যানতে পারেন মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা ও যাচাই বাছাই চলছে। তখন তিনি তার
সহমুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে উপজেলা,জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধা মন্ত্রণালয়ে পাঠান।

নুরুল ইসলাম বাঘা আরো জানান,স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের কোন স্বার্থ ছিল না। যুদ্ধে যাবার উদ্যোশেই ছিল বঙ্গবুন্ধর সোনার বাংলা গড়ায় প্রত্যয়। কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা না থাকলে দেশের কোন উন্নয়ন হবে না হবে না নিজেদের। যুদ্ধে বিজয়ের স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ গিয়েছিলাম কিন্তু যে স্বপ্ন তা পূরণ হয় নি। কারণ যুদ্ধের পর ৩বছরে মধ্যে জাতিরজনক বঙ্গবুন্ধ শেখ মুজিবুর রহমানকে সহ পরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর হলাম দেশান্তরী জীবন বাঁচাতে। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে দেশ আরো বেশী উন্নয়নশীল হত। আমরাও আরো ভাল থাকতে পারতাম দেশান্তরী হওয়া লাগত না।

আমি স্বপ্ন দেখি রাজাকার মুক্ত হবে,স্বাধীন বাংলাদেশে কোন অভাব থাকবে দেশ এখন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে ভাবে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে এবং মাদক, সন্ত্রাস মুক্ত সুশৃঙ্খল ভাবে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে গেলেই আমি মনে করি আমার দেশের জন্য যুদ্ধ করা সার্থক হয়েছে।

  •  

সর্বশেষ ২৪ খবর