মসকস’র ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি নির্মল, সম্পাদক সংগ্রাম
বর্তমান সরকারের আমলেই সিলেটে নৃ-গোষ্ঠীর ১৪ দফা

প্রকাশিত: ৭:১৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৯, ২০২৩

<span style='color:#077D05;font-size:19px;'>মসকস’র ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি নির্মল, সম্পাদক সংগ্রাম</span> <br/> বর্তমান সরকারের আমলেই সিলেটে নৃ-গোষ্ঠীর ১৪ দফা

এই দেশ ও মাটির অতীতের সকল অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অবদান ইতিহাস বিদিত। অথচ কালের পরিক্রমায় সেই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এখন নানামুখি হুমকির মুখে। বিপন্ন হওয়ার পথে তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি। ষড়যন্ত্রের কবলে খোদ জাতিসত্তার পরিচয়-অস্তিত্ব। দেশ-রাষ্ট্রের সকল দূর্দিনে জীবন বাজি রাখা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এমন সংকটে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। এরই অংশ হিসাবে মণিপুরীসহ নৃ-জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ১৪ দফা দাবি এই সরকারের আমলেই বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশের মণিপুরীদের প্রাচীণতম ও অভিভাবক সংগঠন মণিপুরী সমাজকল্যাণ সমিতি সিলেট জেলা শাখার ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে বক্তারা একথাগুলো বলেন।
রবিবার রাত সাড়ে ১১টায় শেষ হওয়া সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি, নৃ-গোষ্ঠীর অন্যতম শীর্ষ নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা আনন্দ মোহন সিংহ। প্রধান বক্তা ছিলেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কমলা বাবু সিংহ।
সম্মানিত অতিথি ছিলেন সমাজসেবী, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্যামকান্ত সিনহা। সভাপতিত্ব করেন সমিতির জেলা সভাপতি নির্মল কুমার সিংহ। সাধারণ সম্পাদক সংগ্রাম সিংহের পরিচালনায় ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্ণালিস্ট এসোসিয়েশন সিলেটর কনফারেন্স হলে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন শেষে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে পূনরায় নির্মল কুমার সিংহ সভাপতি ও সংগ্রাম সিংহ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জলন ও জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে সম্মেলনের উদ্বোধনের সময় মঞ্চে সম্মানিত অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশীদ রেনু, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহ দিদার আলম চৌধুরী নবেল ও সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ। উদ্বোধনীর শুরুতে পবিত্র গীতা পাঠ করেন পন্ডিত প্রসন্ন কুমার সিংহ, শোক প্রস্তাব পাঠ করেন ব্যাংকার জীতেন বাবু সিংহ। এসময় সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের পূন:নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক শাহ দিদার আলম চৌধুরী নবেল ও নির্বাহী সদস্য রণজিৎ সিংহকে সংবর্ধিত করা হয়।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি স্বপন কুমার সিংহ, রঞ্জু সিংহ, মসকস’র কেন্দ্রীয় মহিলা সম্পাদিকা সুনীলা সিনহা, কমলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সিদ্দেক আলী, মণিপুরী ললিতকলা একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা প্রভাস সিংহ, মণিপুরী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ সিলেট বিভাগীয় কমিটির সভাপতি মণিসেনা সিংহ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেট পদার্পণ স্মরণোৎসব উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব সুনীল সিংহ।
বক্তব্য রাখেন, সিলেট জেলা শাখার সহ সভাপতি ডা: উচিত কুমার সিংহ, ক্রীড়াবিদ, সমাজসেবী দীপাল কুমার সিংহ, মসকস মাঝের গাঁও শাখার সভাপতি সনজিত সিংহ, মাছিমপুর শাখার সভাপতি রমেন্দ্র সিংহ বাপ্পা, সিলেট জেলা শাখার মহিলা সম্পাদিকা শান্তি রাণী সিনহা, চুনারুঘাট বিশগাঁও শাখার মিলন সিংহ জ্যোতি, প্রকৌশলী লিপু সিংহ, পন্ডিত অনিল রাজকুমার, প্রবাসী সমাজসেবী বিলাস সিংহ, মণিপুরী ছাত্র পরিষদের নেত্রী শিউলী সিনহা প্রমুখ।
সম্মেলনে বক্তারা, নৃ-জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও তাদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনসহ ১৪ দফা দাবি এই সরকারের আমলেই বাস্তবায়নের দাবি জানান। দাবিগুলো হচ্ছে, যাচাই বাছাইক্রমে প্রকৃত মণিপুরীসহ নৃ-গোষ্ঠীর শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম তালিকাভুক্তকরণ এবং তাদের বঞ্চিত পরিবারদের অধিকার প্রতিষ্ঠা। মণিপুরী অধ্যুষিত মৌলবীবাজারের কমলগঞ্জস্থ মণিপুরী ললিতকলা একাডেমী প্রাঙ্গনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিনন্দন ম্যুরাল ও ঐতিহাসিক বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, মহান ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও অংশগ্রহনকারী বীর মণিপুরী মুক্তিযোদ্ধাদের নাম তালিকা খচিত ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’ নির্মাণ। মণিপুরীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত জেলা-বিভাগ ছাড়াও রাজধানী ঢাকায় সমন্বিত ‘ইনডিজিনাস কালচারাল ইনস্টিটিউট’ অথবা ‘বঙ্গবন্ধু ইনডিজিনাস টাওয়ার’ প্রতিষ্ঠা। যা দেশের রাজধানীতে নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর পরিচয় বহনের পাশপাশি বৈচিত্রময় সংস্কৃতি বিকাশে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কেন্দ্রের ভুমিকা পালন করতে পারে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত সিলেট নগরীর মাছিমপুরে নির্মাণাধীন ‘রবীন্দ্র স্মৃতি ভাষ্কর্য’ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও কবিগুরুর নামে কালচারাল একাডেমী প্রতিষ্ঠা। মণিপুরীসহ ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার জনগোষ্ঠীকে নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষা দানের ব্যবস্থা ও নিজ নিজ মাতৃভাষায় সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যম প্রকাশ-প্রচারের অধিকার প্রদান। দেশের রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে রুটিন মাফিক সকল সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার জনগোষ্ঠীকে নিজ নিজ মাতৃভাষায় সংক্ষিপ্ত সংবাদ ও অনুষ্ঠান প্রচারের সুযোগ প্রদান। মণিপুরীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার সার্বিক কল্যাণ ও উন্নয়ণ নিশ্চিতে স্বতন্ত্র ‘ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন। মণিপুরীসহ নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলের সকল পাবলিক মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংরক্ষণ। দেশে-বিদেশে সমাদৃত ও সম্ভাবনাময় মণিপুরীসহ নৃ-গোষ্ঠীর সম্ভাবনাময় রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন, প্রদর্শন, বাজারজাত ও রপ্তানির সুবিধার্থে বিসিক শিল্প নগরী, স্পেশাল ইকনোমিক জোন বা ইপিজেডে স্থান সংরক্ষণ এবং বিভাগীয় নগরীতে শুল্কমুক্ত প্রদর্শনী ও বাজারজাত কেন্দ্রের জন্য স্থান বরাদ্ধ করা। ক্ষুদ্র জনজাতির পূর্ব পুরুষদের মৌরসী ভিটেবাড়ী, সম্পদের উপর থেকে আগ্রাসী অপদখল উচ্ছেদ ও উত্তরাধীদের মালিকানা, দখল নিশ্চিত করণ, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় ‘আঞ্চলিক ভূমি আইন’ কার্যকর ও প্রথাগত ভূমি অধিকার আইনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান।
ক্ষুদ্র জনজাতির পূর্ব পুরুষদের মৌরসী ভিটেবাড়ী, সম্পদের অপদখল উচ্ছেদ ও উত্তরাধীদের মালিকানা, দখল নিশ্চিত করণ, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় ‘আঞ্চলিক ভূমি আইন’ কার্যকর ও প্রথাগত ভূমি অধিকার আইনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান।
মণিপুরীসহ সকল নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্মীয় উৎসবের দিন তাদের নিজ নিজ এলাকায় বিশেষ আঞ্চলিক ছুটি ঘোষণা। মহান জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে মণিপুরীসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর থেকে পুরুষ ও মহিলা সংসদ সদস্যপদ সংরক্ষণের মাধ্যমে নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে দেশ ও জাতির সেবায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান। ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন ও মণিপুরীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার সাংবিধানিক স্বীকৃতি।
মণিপুরীসহ নৃ-জনগোষ্ঠীর পক্ষে এই ১৪ দফা দাবি ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর তুলে ধরেছিলেন মণিপুরী সমাজকল্যাণ সমিতি সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সংগ্র্রাম সিংহ। সংগঠনের সম্মেলনে এই দাবি তুলে ধরার পর পরবর্তীতে তা স্মারকলিপি আকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরে ও সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও বেসরকারী বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের কাছেও প্রদান করা হয়। কিন্তু সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে আসলেও গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ দাবির ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ গ্রহন না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বক্তারা। বিজ্ঞপ্তি

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর