ছাতকে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, নেই মাতৃত্বকালীন সুবিধা

প্রকাশিত: ৭:২০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২৬

<span style='color:#077D05;font-size:19px;'>ছাতকে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য</span> <br/> অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, নেই মাতৃত্বকালীন সুবিধা

লুৎফুর রহমান শাওন, ছাতক
শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছাতক উপজেলায় দিনমজুর শ্রমিকদের জীবনযাত্রা এখনও কষ্টকর। বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা মজুরি বৈষম্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও মাতৃত্বকালীন ভাতার সুবিধা থেকেও অনেকেই বঞ্চিত বলে অভিযোগ উঠেছে।

মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা গেছে, সুরমা নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন বালু ও পাথর লোডিং পয়েন্টে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন অসংখ্য শ্রমিক। তাদের মধ্যে নারী শ্রমিকদের অবস্থা আরও নাজুক। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ করলেও তারা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না।

ছাতক পৌরসভার চরেরবন্দ এলাকায় বসবাসকারী ৬৫ বছর বয়সী রোকিয়া বেগম জানান, তিনি তার ৭৫ বছর বয়সী স্বামী ইমান আলীকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ১৫ বছর ধরে পাথর ভাঙা ও বালু-পাথর লোডিংয়ের কাজ করছেন। যখন যেখানে কাজ পান, সেখানেই ছুটে যান। ছয় সন্তান নিয়ে তাদের সংসার চললেও আর্থিক সংকটে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারেননি। তিনি বলেন, “স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান মিলে সপ্তাহে ৪-৫ দিন কাজ করে দৈনিক প্রায় ৫০০ টাকা আয় করি।”

একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে নোয়ারাই ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের বিধবা রেজিয়া বেগমের জীবন থেকেও। ৫৫ বছর বয়সী এই নারী জানান, ১০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। মেয়েটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। তিনি সপ্তাহে পাঁচদিন বালু লোডিংয়ের কাজ করে দৈনিক প্রায় ৫০০ টাকা আয় করেন। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই কাজ করতে হয়, আর অসুস্থ হলে কোনো উপায় না পেয়ে ঘরেই পড়ে থাকতে হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন বালু ও পাথর লোডিং পয়েন্টে শত শত শ্রমিক কাজ করলেও নারী শ্রমিকরা পুরুষদের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছেন। যেখানে পুরুষ শ্রমিকরা দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা পান, সেখানে নারী শ্রমিকদের দেওয়া হচ্ছে ৪০০-৫০০ টাকা। একইসঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নেই প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থা, এমনকি চিকিৎসা সহায়তাও সীমিত।

শ্রমিকদের অভিযোগ, কাজ করতে গিয়ে কেউ আহত হলে প্রাথমিক চিকিৎসার খরচ বহন করেন লেবার সর্দাররা। তবে গুরুতর আহতদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা বা সহায়তার কোনো ব্যবস্থা নেই।

ইসলামপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের লেবার সর্দার মো. ছদর উদ্দিন জানান, একটি বাল্কহেডে প্রায় ৪০ জন শ্রমিক নিয়ে কাজ করেন তিনি। সকাল ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত কাজ চলে এবং প্রতিজন শ্রমিককে ৭০০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়। তবে কাজ না থাকলে তাদের ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (বদলিকৃত) ডিপ্লোমেসি চাকমা বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ এখনো তার কাছে পৌঁছেনি। তিনি জানান, মে দিবস উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে অভিযোগ পাওয়া গেলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি মূলত সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত হয় এবং সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রদান করা হয়। তবে বেসরকারি খাতে কীভাবে এই সুবিধা দেওয়া হয়, সে বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

জেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের উপপরিচালক এ. জে. এম. রেজাউল আলম বিন আনছার বলেন, নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, আপনাদের জেলাতেই এ বৈষম্য বেশি অন্য জেলাতে এসব নেই, এ ধরনের বৈষম্য কোথাও থাকলে তা প্রকাশ্যে তুলে ধরা উচিত। কারণ আইন অনুযায়ী এমন বৈষম্যের কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, বিষয়টি জেলা পর্যায়ের সভা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর