ঢাকা ১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৪, ২০২৬
বিজয়ের কণ্ঠ ডেস্ক :
বিবাহ মানবজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত। এটি শুধু দু’জন মানুষের মিলন নয়; বরং দুটি পরিবার, দুটি জীবনধারা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি রচনার একটি পবিত্র বন্ধন।
তাই ইসলাম বিয়েকে শুধু সামাজিক চুক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি মহান ইবাদত ও দায়িত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করেছে। যে সম্পর্কে একজন নারীকে সারাজীবন কাটাতে হবে, সেই সম্পর্কের ব্যাপারে তার মতামত ও সম্মতিকে উপেক্ষা করা ইসলামের ন্যায়বিচার ও মানবিকতার শিক্ষার পরিপন্থী। ইসলাম এমন এক যুগে নারীর বিয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, যখন বিশ্বের বহু সমাজে নারীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্যই ছিল না। কেরআন ও হাদিসে বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীন মতামতকে সম্মান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তাই বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামত ও অনুমতির বিষয়টি শুধু একটি সামাজিক দাবি নয়; বরং এটি ইসলামের প্রদত্ত একটি মৌলিক অধিকার ও মর্যাদার প্রতিফলনও বটে।
নারীর মতামতের গুরুত্ব
ইসলামি শরিয়াহ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ক্ষমতাবান মনে করে। তাই প্রাপ্তবয়স্কা কোনো মহিলার অনুমতি বা সম্মতি ছাড়া তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। অভিভাবক জোর করে বিয়ে দিলেও ইসলামি আইন অনুযায়ী তা কার্যকর হয় না।
প্রখ্যাত হানাফি ফকিহ আল্লামা ইবনে নুজাইম (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন :
قَوْلُهُ وَلَا تُجْبَرُ بِكْرٌ بَالِغَةٌ عَلَى النِّكَاحِ) أَيْ لَا يَنْفُذُ عَقْدُ الْوَلِيِّ عَلَيْهَا بِغَيْرِ رِضَاهَا
অর্থ : ‘কোনো প্রাপ্তবয়স্কা কুমারী মেয়েকে বিবাহের জন্য বাধ্য করা যাবে না। অর্থাৎ, মেয়ের সন্তুষ্টি ও সম্মতি ছাড়া তার ওপর অভিভাবকের (ওলি) করা বিবাহের আকদ বা চুক্তি কার্যকর হবে না।’ (আল-বাহরুর রায়েক, ৩/১১৮]
শরিয়তের দৃষ্টিতে নারীর মনস্তত্ত্ব ও সম্মতির ধরন :
যেহেতু শরিয়া আইন প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের সম্মতিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে, তাই ফিকহের কিতাবগুলোতে এ নিয়ে সবিস্তার আলোচনা করে বিষয়টির সমস্ত সূক্ষ্ম দিক সামনে আনা হয়েছে।
মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে শরিয়ত এক্ষেত্রে নারীদের প্রধানত দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে:
১. সায়্যেবা (তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারী)
যেহেতু বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তাদের লজ্জার জড়তা কিছুটা কম থাকে, তাই তাদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বা মৌখিক বক্তব্যকে সম্মতির জন্য জরুরি করা হয়েছে। কারণ তারা মনের কথা কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে।
বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থ ‘হেদায়া’র লেখক বলেন :
ولو استأذن الثيب فلا بد من رضاها بالقول لقوله «الثيب تشاور» ولأن النطق لا يعد عيبا منها وقل الحياء بالممارسة فلا مانع من النطق في حقها
অর্থ: ‘যদি কোনো সায়্যেবা (বিবাহিতা) নারীর নিকট অনুমতি চাওয়া হয়, তবে তার স্পষ্ট মৌখিক সম্মতি থাকা আবশ্যক। কেননা আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ছায়্যেবা নারীর ক্ষেত্রে তার পরামর্শ (বা স্পষ্ট মতামত) নিতে হবে।’ তাছাড়া (অভিজ্ঞতা থাকার কারণে) মুখ ফুটে কথা বলা তার জন্য দোষের কিছু মনে করা হয় না এবং বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হওয়ার কারণে তার জড়তা ও লজ্জা কমে যায়; ফলে তার ক্ষেত্রে মৌখিক মতামত প্রকাশে কোনো বাধা থাকে না।’ (হেদায়া, ১/১৯২)
২. কুমারী বা অবিবাহিতা নারী
কুমারী মেয়েরা স্বভাবগতভাবেই অতি লজ্জাবতী হয়ে থাকে। সমাজের একটি শালীন ও ভদ্র মেয়ে চাইলেই হুট করে নিজের বিয়ের সম্মতি স্পষ্ট জবানে ব্যক্ত করতে পারে না। শরিয়ত নারীর এই স্বভাবজাত লজ্জাকে সম্মান জানিয়েছে। তাই তার ক্ষেত্রে স্পষ্ট মৌখিক সম্মতির পাশাপাশি সম্মতির ইঙ্গিতবাচক আচরণগুলোকেও অনুমোদনের সমার্থক বিবেচনা করেছে। ‘শরহে বেকায়া’ গ্রন্থে বলা হয়েছে :
وَصَمْتُها وضِحْكُها وبكاؤُها بلا صوتٍ إذْنٌ ومعه (أي مع الصوت) رَدٌّ حينَ استئذانِه ، أو بعد بلوغِ الخبرِ بشرطِ تسميةِ الزَّوج
অর্থ : ‘পাত্রের নাম উল্লেখ করে অনুমতি চাওয়ার সময় কিংবা (বিয়ের) সংবাদ পৌঁছানোর পর কুমারী মেয়ের নীরবতা, মৃদু হাসি এবং আওয়াজহীন কান্না সম্মতির লক্ষণ বা অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে। তবে কান্নার সাথে যদি আওয়াজ থাকে (অর্থাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠে), অথবা উপহাসমূলক অট্রহাসি দেয়, তবে তা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান বলে গণ্য হবে।’ (শরহে বেকায়া, ৩/১৭)
ইঙ্গিতবাচক সম্মতির ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত :
তবে ইঙ্গিতবাচক সম্মতির বিষয়টি যেহেতু সুনিশ্চিত কোন মাধ্যম নয়, বরং সম্মতির আলামত বা পরোক্ষ লক্ষণ, তাই ফিকাহবিদগণ কোনো ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে এখানে দুটি শর্ত যুক্ত করেছেন:
প্রথম শর্ত :
এই পরোক্ষ সম্মতি বা নীরবতার বিষয়টি শুধু তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন পাত্রের প্রস্তাবটি মেয়ের ওলি (শরিয়ত নির্দেশিত অভিভাবক) বা তার প্রেরিত দূতের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হবে। কারণ আপনজনদের সামনেই কুমারী মেয়ের লজ্জাশীলতা বেশি কাজ করে। অন্য কারও বেলায় বিষয়টি তেমন নয়। তাই ওলি ছাড়া বাইরের অন্য কেউ অনুমতি চাইলে কুমারী মেয়ের স্পষ্ট মৌখিক বক্তব্যই লাগবে, নীরবতা চলবে না। আল্লামা ইবনে নুজাইম (রহ.) বলেন :
قَوْلُهُ وَإِنْ اسْتَأْذَنَهَا غَيْرُ الْوَلِيِّ فَلَا بُدَّ مِنْ الْقَوْلِ كَالثَّيِّبِ) أَيْ فَلَا يَكْفِي السُّكُوتُ؛ لِأَنَّهُ لِقِلَّةِ الِالْتِفَاتِ إلَى كَلَامِهِ فَلَمْ يقعْ دَلَالَةً عَلَى الرِّضَا وَلَوْ وَقَعَ فَهُوَ مُحْتَمَلٌ وَالِاكْتِفَاءُ بِمِثْلِهِ لِلْحَاجَةِ وَلَا حَاجَةَ فِي غَيْرِ الْأَوْلِيَاءِ
অর্থ: ‘আর যদি ওলি ছাড়া অন্য কেউ তার কাছে অনুমতি চায়, তবে ছায়্যেবা নারীর মতোই স্পষ্ট মৌখিক বক্তব্য আবশ্যক।’ অর্থাৎ, এক্ষেত্রে কেবল নীরবতা যথেষ্ট হবে না। কারণ পরপুরুষ বা অনাত্মীয়ের কথার প্রতি মেয়ের মনোযোগ বা সমীহ কম থাকতে পারে; ফলে তার নীরবতা সন্তুষ্টির অকাট্য দলিল বা আলামত হিসেবে গণ্য হবে না। আর যদি আলামত ধরেও নেওয়া হয়, তবুও তাতে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। মূলত (লজ্জার কারণে) বিশেষ প্রয়োজনে কুমারী মেয়ের নীরবতাকে ওলির ক্ষেত্রে অনুমতি ধরা হয়েছে, কিন্তু ওলি ছাড়া অন্য কারও ক্ষেত্রে সেই প্রয়োজনীয়তা বা ওজর খাটে না।’ (আল-বাহরুর রায়েক, ৩/১২৩ )
দ্বিতীয় শর্ত :
কনের এই আচরণগত অভিব্যক্তিগুলো বাস্তবিকই অবস্থার আলোকে সম্মতির ইঙ্গিতবাহী হতে হবে। যদি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে ভিন্ন কোনো অর্থ প্রকাশ পায় (যেমন মেয়েটি ভয়ে বা অন্য কোনো চাপে কাঁদছে বা অট্টহাসি হাসছে বা অন্য কোন কারণে চুপ থাকছে), তবে তা আমলে নিতে হবে। ইমাম ইবনুল হুমাম (রহ.) ‘ফাতহুল কদির’-এ বলেন :
وَالْمُعَوَّلُ عَلَيْهِ اعْتِبَارُ قَرَائِنِ الْأَحْوَالِ فِي الْبُكَاءِ وَالضَّحِكِ، فَإِنْ تَعَارَضَتْ أَوْ أُشْكِلَ اُحْتِيطَ
অর্থ : ‘এক্ষেত্রে মূল কথা হলো, কান্না ও হাসির সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও আলামতসমূহ বিবেচনা করা। যদি আলামতগুলোর মধ্যে পরস্পর বৈপরীত্য দেখা দেয় কিংবা বিষয়টি অস্পষ্ট বা সন্দেহজনক মনে হয়, তবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে (অর্থাৎ স্পষ্ট মৌখিক অনুমতি নিতে হবে)। (ফাতহুল কদির, ৩/২৬৪)
অতএব, অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের প্রত্যেকের কর্তব্য হলো নারীর এই শরয়ি ও মানবিক অধিকারকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া এবং বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার মতামতকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা। এতে ইসলামের সৌন্দর্য যেমন ফুটে উঠবে, তেমনি পরিবার ও সমাজে স্থায়ী শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে।
কালের কন্ঠ সোজন্যে :
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host