ঢাকা ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:১৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২৬
মো আব্দুল শহীদ, সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জে ধান হারিয়ে হাওরজুড়ে কৃষকের বোবাকান্না বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছেন কৃষকরা। হাওরের সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনা সবই নির্ভর করে ধানের ওপর। জেলার এই একটি মাত্র ফসল ঘরে তুলতে পারলেই কৃষকের এক বছরের খাদ্য নিশ্চিত হয়। তবে চলতি বছর যেন প্রকৃতি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এই ভাটির জেলা থেকে। টানা কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের অধিকাংশ হাওরে তলিয়ে গেছে বোরো ধান। চোখের সামনে তলিয়ে যাওয়া ধান দেখে হাওরজুড়ে কৃষকদের এখন বোবাকান্না।
সদর উপজেলার ঝওয়ারচর হাওরের কৃষক জসিম উদ্দিন শ্রমে ঘামে আর মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা এনে ১২ কেয়ার হাওরাঞ্চলে জমি পরিমাপের ক্ষেত্রে কেয়ার একটি জনপ্রিয় আঞ্চলিক একক। ১ কেয়ার জমি সাধারণত ৩০ শতাংশ বা ২৮ ডিসিমিল ধরা হয়) জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ করেন। কিন্তু সেই ধান আর ঘরে তোলা হয়নি তার। অতিবৃষ্টিতে একরাতেই হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ওই কৃষকের পাকা ধান তলিয়ে যায়। এতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে হাওরের ৫ হাজার হেক্টর ধানের জমি পানির চাপে ভেঙে গেলো ঝিনারিয়া হাওরের রাস্তা, ডুবছে ফসল এবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?
শুধু জসিম উদ্দিন নয়, হাওরজুড়েই যেন কৃষকদের এই বোবাকান্না শোনার কেউ নেই। কেউ ধান হারিয়ে কাঁদছেন আবার কেউবা অবশিষ্ট ধান রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।
সরেজমিনে শিয়ালমারা ও করচার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য বছর এই সময়ে হাওরে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর উৎসব চললেও এ বছর ভিন্ন চিত্র। পুরো হাওর জুড়েই সুনসান নীরবতা। কেউ ধান হারিয়ে কাঁদছেন আবার কেউবা শ্রমিক সংকটে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অবশিষ্ট ধান রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
‘কষ্ট করে বোরো ধানের চাষাবাদ করেছিলাম। কিন্তু একটা ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। এখন পুরো বছর পরিবারকে কীভাবে খাওয়াব, কীভাবে মহাজনের টাকা পরিশোধ করবো সেই দুশ্চিন্তায় আছি।’
দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি কৃষক মো. আব্দুল শহীদ বলেন, ‘আমার সব শেষ। কষ্ট করে বোরো ধানের চাষাবাদ করেছিলাম। শ্রমিক সংকটের কারণে অগ্রীম টাকা দিয়েও একটা ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। এখন পুরো বছর পরিবারকে কীভাবে খাওয়াব দুশ্চিন্তায় আছি।’
কৃষক আব্দুল আলী বলেন, ‘অনেক স্বপ্ন নিয়ে ধানের চাষাবাদ করেছিলাম। অথচ ধানগুলো ঘরে তোলার আগেই তলিয়ে গেলো। হাওরে যদি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে হয়ত আমাদের ক্ষতি হতো না। এখন কান্না ছাড়া কৃষকদের আর কিছু করার নেই।’
বন্যার আগে বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে হাওরের ধান অতিবৃষ্টিতে হাওরে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান। সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেলো মধ্যনগর এরনবিলের বাঁধ,বিশ্বম্ভরপুর খরচার হাওরের বাঁধ।
সাজু মিয়া বলেন, হাওরের কৃষকদের চোখের জলের কোনো মূল্য নেই। একমাত্র ফসল হারিয়ে কৃষকরা দিশাহারা হয়ে পড়েছে।’
করচার হাওরের কৃষক মুজিবুর রহমান মিয়া বলেন, অনেক কৃষকের ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়েছে। তবে যে অবশিষ্ট ধান রয়েছে সেগুলোও কাটার জন্য শ্রমিক পাচ্ছি না। তাই তলিয়ে যাওয়ার আগেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দ্রুত কাটার চেষ্টা করছি।’
বজ্রপাতের আতঙ্কে শ্রমিকরা হাওরে ধান কাটছে না। অন্যদিকে নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, বাঁধ ভাঙছে।’
শনির হাওরের কৃষক রহিম মিয়া বলেন, বজ্রপাতের আতঙ্কে শ্রমিকরা হাওরে ধান কাটছে না। অন্যদিকে নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, বাঁধ ভাঙছে। তাই বজ্রপাতের ভয় না পেয়ে নিজেই পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে হাওরে ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছি।’
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়। এরই মধ্যে প্রায় ৪০% ধান কর্তন হয়েছে। তবে গেলো কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন হাওরে ৭ হাজার হেক্টরের ধান জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। এর মধ্যে ৩ হাজার হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে ধানের ক্ষতির পরিমাণ আরোও বেশি।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, এরই মধ্যে হাওরে ধান কাটার জন্য কৃষকদের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমিক সংকট নিরসনেও বাইরে থেকে শ্রমিক নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। সেইসঙ্গে ধান কেটে উঁচু স্থানে রাখার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের সবকটি নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আরও কয়েকদিন এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে এবং পাহাড়ি ঢল নেমে এই জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকালে সুরমা নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১.৫১ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় এই জেলায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ৮ মিলিমিটার।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, সুনামগঞ্জের সব নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আরও কয়েকদিন এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে এবং পাহাড়ি ঢল নেমে এই জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host