“সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি টোল আদায়ের অভিযোগ”

প্রকাশিত: 12:22 AM, July 5, 2026

“সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি টোল আদায়ের অভিযোগ”

 

অতিরিক্ত টোল আদায় বন্ধের দাবিতে এসপি বরাবরে স্মারকলিপি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের তাহিরপুর,বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার যাদুকাটা নদী,পাটলাই,রক্তি,ফাজিলপুরসহ বিভিন্ন নৌ-ঘাটে অতিরিক্ত টোল আদায়, এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগে সুনামগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছেন স্থানীয় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র সরকার নির্ধারিত টোলের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ আদায় করছে। প্রতিবাদ করলেই শ্রমিকদের মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে শুধু শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরাই নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়ে ভুক্তভোগী নৌ-শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর একটি প্রতিনিধি দল এ স্মারকলিপি জমা দেন।

প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাখাব উদ্দিন, যাদুকাটা বালু শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুশ শাহিদ, যাদুকাটা স্টোন ক্রাশার মালিক সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ডালিম,সদস্য
নূরউদ্দিনসহ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতারা।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, তাহিরপুর উপজেলার পাঠলাই নদীর কামালপুর ঘাট, যাদুকাটা নদী, চারাগাঁও ও বাদাঘাট,জামালগঞ্জ দূর্লভপুর সহ বিভিন্ন নৌ-ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে ৩ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত টোল আদায় করা হচ্ছে। নির্ধারিত টোল দিতে চাইলে তা গ্রহণ করা হয় না, বরং অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়। এতে নদীপথে পাথর, বালুসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

স্মারকলিপিতে আরও অভিযোগ করা হয়, অতিরিক্ত টোল আদায়ের প্রতিবাদ করলে শ্রমিকদের মারধর, নৌযান আটকে রাখা এবং ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভয়ের কারণে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিতে হাজার হাজার শ্রমিক পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রাখাব উদ্দিন বলেন, “এই টোল সন্ত্রাসের কারণে এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা নিরাপদে ব্যবসা করতে পারছেন না। প্রশাসন যদি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে সাধারণ মানুষ ও শ্রমিকরা স্বস্তি ফিরে পাবে।”

যাদুকাটা স্টোন ক্রাশার মালিক সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, আমরা বছরের পর বছর ধরে তাহিরপুরের যাদুকাটা নদী থেকে পাথর-বালু উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করছি। কিন্তু এখন আর আগের মতো ব্যবসা করা সম্ভব হচ্ছে না। ঘাটে ঘাটে সরকার নির্ধারিত টোলের তিন থেকে চার গুণ বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই শ্রমিকদের ওপর হামলা, মিল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অতিরিক্ত টোলের কারণে পাথরের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এতে নির্মাণ কাজ ব্যাহত হচ্ছে, শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ছেন এবং মিল মালিকরা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন। আমরা চাঁদাবাজি চাই না, সন্ত্রাস চাই না। আমরা শুধু আইন অনুযায়ী ব্যবসা করতে চাই। প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই দাবি—অবিলম্বে এই টোল সন্ত্রাস বন্ধ করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক। তাহলেই তাহিরপুরের হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার রক্ষা পাবে।

যাদুকাটা বালু শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুশ শাহিদ বলেন, “আমরা সরকার নির্ধারিত বৈধ টোল দিতে প্রস্তুত। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা আদায়, চাঁদাবাজি এবং শ্রমিক নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

স্মারকলিপি গ্রহণ শেষে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার প্রতিনিধি দলকে আশ্বস্ত করে বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে। নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বিআইডব্লিউটিএর ইজারাদারের সঙ্গে কথা বলা হবে। তারা নির্ধারিত চার্ট অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থান থেকে টোল আদায় করছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হবে। এছাড়া গত বছরের তুলনায় টোল দ্বিগুণ হওয়ার অভিযোগ নিয়েও বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইজারাদার নাসির উদ্দিন বলেন, আমরা সরকার নির্ধারিত হারেই আদায় করছি। বাড়তি এক টাকাও নেওয়া হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরে প্রতি টনে সরকার নির্ধারিত টোল ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আমরা সেই হারেই টোল আদায় করছি। অতিরিক্ত টোল আদায়ের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সঠিক নয়।”

এদিকে স্মারকলিপি প্রদানকারীরা দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে বলেন, অতিরিক্ত টোল আদায়, চাঁদাবাজি ও শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ না হলে তাহিরপুরের পাথর ও বালুভিত্তিক শিল্প মারাত্মক সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। তাই অবিলম্বে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকার নির্ধারিত টোল কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর