ঢাকা |
প্রকাশিত: 12:53 AM, July 4, 2026
ওসমানীনগর প্রতিনিধি::
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া উত্তরাধীকার সনদ তৈরী করে ভুমি বিক্রয় ও দখলের অপচেষ্টার অভিযোগ ওঠেছে। ওই ভুমি নামজারির আবেদন করা হলে নামজারি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদন্তে জাল-জালিয়াতির ঘটনাটি বেরিয়ে আসায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, উপজেলার সাদীপুর ইউনিয়নের মোবারকপুর মৌজার জেএল নং-২৭, এসএ খতিয়ান নং-৩৮১, বিএস খতিয়ান নং-১২৮, এসএ দাগ নং-১২৯৬, বিএস দাগ নং ১৩১১ এর অর্ন্তভুক্ত ৯ শতক ভূমির পৈত্রিক সূত্রে মালিক ছিলেন মোবারকপুর গ্রামের আব্দুল জব্বারের স্ত্রী যত্রিক বিবি। ২০২১ সালের ২৩মার্চ যত্রিক বিবি তার ৯ শতক ভূমি একই গ্রামের আবুল কালামের পুত্র রাকিব আলীর কাছে ৪ লক্ষ টাকা মূল্যে বিক্রি সংক্রান্ত চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন।
কিন্তু সেই ভূমির দখল নিতে যত্রিক বিবি ও রাকিব আলীর প্রতিবেশী আব্দুল মুমিন (জীবিত থাকা অবস্থায়) ও তার পুত্র হেলাল আহমদ নানা কূটচালে লিপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, বিগত দিনে যত্রিক বিবির অধিনে এই ভূমির মালিকানা-দখল থাকাবস্থায় আব্দুল মুমিন ও তার পুত্র হেলাল আহমদ একাধিকবার জোর করে এই ভূমি দখল চেষ্টায় মরিয়া হয়ে ওঠেন। কেনো উপায়ান্তর না পেয়ে ভূমি দখলের অপচেষ্টার অভিযোগে ২০১২ সালের ৬ সেপ্টম্বর যত্রিক বিবি বাদি হয়ে ওসমানীনগর থানায় একটি জিডি করেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি তাজপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্টার করা ২২১/২২ নং দলিলে যত্রিক বিবির বিক্রিত সেই ৯ শতক ভূমি হেলাল আহমদসহ আরও ৩ জনের নামে জালিয়াতি করে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। হেলাল আহমদ সেই ভূমি নামজারির জন্য আবেদন করেন। ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ খসরুপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা শীতল চন্দ্র দত্ত স্বাক্ষরিত নামজারি সংক্রান্ত ভূমির তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি-এর নিকট প্রেরণ করেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ভূমি সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র-রেকর্ডপত্র যাচাই ও সরজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইন, বিধি ও পরিপত্রসমূহে বর্ণিত নির্দেশনা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও কাগজপত্র-রেকর্ডপত্র যাচাইকালে আবেদনকারীর (হেলাল আহমদ) দাখিল করা উত্তরাধীকারী সনদ সঠিক না হওয়ায় প্রস্তাব প্রেরণ করা গেল না। প্রতিবেদনে নামজারির ওই আবেদনটি নথিজাত করারও সুপারিশ করা হয়।
এরপর ওই ভূমির দখলে থাকা রাকিব আলী খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, হেলাল আহমদ চলচাতুরি করে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া উত্তরাধীকার সনদ তৈরী করেছেন। তাতে যত্রিক বিবির শশুর আব্দুর রহমানের দুই বোনের দুই পুত্রকে উত্তরাধীকার সাজানো হয়েছে। ওই ভুয়া উত্তরাধীকারদের কাছ থেকে হেলাল আহমদ ৯ শতক ভূমি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। ভূমির কথিত বিক্রেতা হানিফ উল্যা ও তরিক উল্যা দুইজন দুই ইউনিয়নের বাসিন্দা হলেও গোয়ালা বাজার ইউনিয়ন পরিষদের নাম দিয়ে ভুয়া উত্তরাধীকার সনদ তৈরী করে ভূমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। ওই সময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখক অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কোনো ধরনের যাচাই না করে ভূয়া উত্তরাধীকার সনদে এই ভূমি রেজিস্ট্রি করেছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন রাকিব আলী।
এই অভিযোগ তদন্তে দেখা গেছে, ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি তাজপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্টার করা ২২১/২২ নং দলিলে দেওয়া হলফনামায় ভূমি বিক্রেতা হানিফ উল্যা ও তরিক উল্যার ঠিকানায় ভিন্নতা রয়েছে। হানিফ উল্যা, পিতা আমদ উল্যা, গ্রাম পুর্ব ব্রাহ্মনগ্রাম, ডাক-ইউনিয়ন গোয়ালা বাজার ও তরীক উল্যা, পিতা সমুজ উল্যা, গ্রাম বীরদাস, ডাক-ইউনিয়ন তাজপুর। হলফনামায় বিক্রেতাদের ঠিকানা ভিন্ন উল্লেখ থাকার পরও একই ইউনিয়নের বাসিন্দা দেখিয়ে ভুয়া উত্তরাধীকার সনদ দিয়ে কীভাবে দলিলটি রেজিস্ট্রি করা হলো এ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রাকিব আলীর ক্রয় করা ও দখলে থাকা ভূমি জালিয়াতি করে ক্রয় করার ঘটনায় রাকিব আলীর মা আমিনা বেগম বাদী হয়ে ২০২৪ সালে হেলাল আহমসহ তার লোকজনের নামে আদালতে মামলা দায়ের করেন। পাশাপাশি ভুয়া উত্তরাধীকার সনদ তৈরী ও হয়রানির অভিযোগে আমিনা বেগম বাদী হয়ে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর হেলাল আহমদসহ ৮জনের নামে আদালতে আরও একটি সিআর মামলা দাখিল করেন। যেটি এখন পি.বি.আইয়ের অধিনে তদন্তাধীন রয়েছে।
রাকিব আলীর মা আমিনা বেগম বলেন, জীবদ্দশায় যত্রিক বিবির সম্পূর্ণ ভরণ-পোষণ আমরা করেছি। যত্রিক বিবির ৯ শতকসহ মোট ১২ শতক ভূমি আমাদের কাছে বিক্রি ও দখল সমঝিয়ে গেছেন। হেলাল আহমদ ভূয়া উত্তরাধীকার সনদ তৈরী করে আমাদের কাছে যত্রিক বিবির বিক্রিত করা সেই ভূমি তার নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। এছাড়া আমাদেরকে হয়রানি ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করার হীন লক্ষ্যে চলতি বছরের ৭ এপ্রিল হেলাল আহমদ আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা-বিভ্রান্তিকর অভিযোগে আদালতে সিআর মামলা করেছেন। এমনকী হয়রানির উদ্দেশ্যে বিগত দিনে হেলাল আহমদ আমাদের নামে আদালতে একটি ১০৭ ধারা মামলা করলেও আদালত সেটি খারিজ করে দেন। আমি বাড়িতে একা থাকায় নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি।
এবিষয়ে হেলাল আহমদ অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ওই ভূমি সঠিক উত্তরাধীদের কাছ থেকে সঠিক প্রক্রিয়ায় রেজিস্ট্রির মাধ্যমে আমি ক্রয় করেছি। তবে, আমি নামজারির কোনো আবেদন করিনি। আমার অজ্ঞাতে কে বা কারা তা করেছে, বা কী কারণে নামজারি নথিজাত করা হয়েছে তা আমি জানিনা। এসংক্রান্ত বিষয়ে দুই পক্ষের মামলা চলমান আছে, আদালত যে রায় দেবেন তা আমি মাথা পেতে নেবো।
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host