ঢাকা ২৯শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:৪৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৯, ২০২৬
বিজয়ের কণ্ঠ ডেস্ক
উন্নত জীবনের আশায়, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে। দালালের প্ররোচনায় ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে ইউরোপের দেশ গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সুনামগঞ্জের ১৩ যুবক প্রাণ হারিয়েছেন। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভাসতে থাকায় চরম দুর্ভোগে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে সুনামগঞ্জের দিরাই, জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলায়।
নিহতরা হলেন, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে মাওলানা সাজিদুর রহমান (২৮), জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের ছালিকুর রহমানের ছেলে সোহানুর রহমান এহিয়া (২০), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে মেহেদী হাসান তায়েফ (১৮), রাজানগর ইউনিয়নের রন্নারচর গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া এলাকার ইজাজুল হক, একই এলাকার নাঈম আহমদ, আলী আহমদ, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান ও টিয়ারগাঁও গ্রামের সায়েক আহমেদ এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার আবু ফাহিম।
এ ঘটনায় দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫) মারা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও তার পরিবারের দাবি তিনি এখনও বেঁচে আছেন। এছাড়াও ওই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামের আরজু মিয়ার ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রত্যেকেই ১১ থেকে ১২ লাখ টাকা করে দালালদের দিয়েছেন। কেউ জমিজমা বিক্রি করে, কেউ ঋণ নিয়ে এই টাকা জোগাড় করেছেন। প্রথমে ঢাকা থেকে বিমানযোগে সৌদি আরব, পরে মিশর হয়ে তাদের লিবিয়া নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক মাস ‘গেমঘর’ নামে পরিচিত স্থানে আটকে রেখে পরে সুযোগ বুঝে নৌকায় তুলে দেওয়া হয়।
দিরাই উপজেলার নিহত সাহান এহিয়ার বড় ভাই জাকারিয়া বলেন, আমার ভাইসহ সবাই ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করে গেছে। লিবিয়ায় নেওয়ার পর অর্ধেক টাকা দেওয়া হয়। কয়েকদিন কোনো যোগাযোগ ছিল না। পরে জানতে পারি, সে আর বেঁচে নেই।
জগন্নাথপুরের চিলাউড়া গ্রামের ঝিনুক মিয়া বলেন, আমার ভাই নাঈমকে দালালরা সাগরে পাঠায়। কয়েকদিন যোগাযোগ ছিল না। আজ শুনলাম সে মারা গেছে। আমরা দালালের বিচার চাই।
চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, আমার ইউনিয়নের দুই যুবক মারা গেছে। তারা মোটা অংকের টাকা দিয়েছিল। এখন পরিবারগুলো নিঃস্ব।
সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের পুলিশ পরিদর্শক (ডিআইও-১) মো. আজিজুর রহমান বলেন, দিরাই ও জগন্নাথপুরে ৮ জনের মৃত্যুর তথ্য আমরা পেয়েছি। আরও দু’জনের বিষয়ে তথ্য যাচাই চলছে।
সুনামগঞ্জের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেছেন, ‘আমরা স্থানীয় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারছি। কিন্তু তারা যেহেতু বৈধপথে কোন এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছিলেন না, তাই তাদের বিষয়ে সরকারি কোন তথ্য নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছি যেন ভুক্তভোগী পরিবারদের খুঁজে বের করে এ সম্পর্কিত সকল তথ্য নথিভুক্ত করেন। এর ফলে যারা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অবৈধপথে পাচার করছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যায়।’
এদিকে, বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, জীবিতদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি, চারজন দক্ষিণ সুদানের এবং একজন চাদের নাগরিক। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানান, যাত্রাপথে মারা যাওয়া ২২ ব্যক্তির মরদেহ পাচারকারীদের নির্দেশে ভূমধ্যসাগর এ ফেলে দেওয়া হয়।
গ্রিস কোস্টগার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌকাটি ২১ মার্চ তোবরুক বন্দর, পূর্ব লিবিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে এবং গ্রিস এর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। টানা ছয় দিন ধরে খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র খাদ্য ও পানির সংকট সব মিলিয়ে চরম ক্লান্তিতে ২২ জনের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় গ্রিক কর্তৃপক্ষ দুই সন্দেহভাজন পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে, যারা দক্ষিণ সুদানের নাগরিক। তাদের বয়স যথাক্রমে ১৯ ও ২২ বছর। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ এবং অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে।
প্রতিবেদন : সিলেট ভয়েস’র
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host