ঢাকা ১৮ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:২৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০২৬
বিজয়ের কণ্ঠ ডেস্ক
একসময় খরস্রোতা সুরমা নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল সিলেট নগরের জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য আর নৌপথের চলাচল। সেই নদী আজ ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিক ও পলিথিনে ভরাট হয়ে ধীরে ধীরে তার যৌবন হারাচ্ছে। নদীর তলদেশে নগরীর বর্জ্য মিশে গিয়ে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ তৈরি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডও বলছে, নদীর বিভিন্ন অংশে ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত প্লাস্টিক ও ময়লার স্তূপ পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে আছে।
প্রতিবছর ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস পালন করা হয়। আজও সিলেটে এই দিবস পালিত হয়েছে। নদী রক্ষা ও নদীর গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে বিশ্বজুড়ে এই দিবস পালিত হয়। কিন্তু বাস্তবে সুরমার বর্তমান চিত্র বলছে, নদী রক্ষার কথা যতটা বলা হচ্ছে, কাজ ততটা হচ্ছে না।
১৮৫৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত সিলেটের সাথে যোগাযোগের একটি মাত্র রাস্তা ছিল, কিন্তু তার অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের মালামাল নদীপথে পরিবহন করা হতো। সারাবছর দূরবর্তী স্থানে যাতায়াতের সুবিধার জন্য জাহাজের তুলনায় ছোট ছোট নৌকারই প্রচলন ছিল বেশি। বিশেষ করে অধিকাংশ স্থান জলের নিচে ডুবে থাকায় এই নৌকাসমূহ দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহত থাকত ।
সুরমা পাড়ের বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর ধরে নদীর পানি আগের মতো নেই। পানিতে দুর্গন্ধ, ময়লা ও প্লাস্টিক ভেসে থাকে প্রায় সারাক্ষণ। তবু বাধ্য হয়ে নদীর পানি ব্যবহার করতে হয় তাদের। কেউ গোসল করেন, কেউ বাসন ধোন, আবার অনেকেই শাকসবজি ধুয়ে নেন এখানেই। এতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও রোগবালাই।
স্থানীয়দের মতে, নগরের ভেতরের বিভিন্ন খাল ও ছড়া দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য গিয়ে পড়ছে সুরমায়। শহরের ড্রেন ও খালগুলো পরিষ্কার না থাকায় ময়লা-পলিথিন সহজেই নদীতে চলে যাচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এতে।
নদী–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুরমাকে দূষণমুক্ত করতে হলে প্রথমেই নদীতে প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে নগরের সব খাল ও ছড়াকে সচল ও পরিষ্কার রাখা জরুরি। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার সঙ্গে নদী সংরক্ষণকে যুক্ত করতে না পারলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
নগরীর সুরমা নদীপাড়ের বাসিন্দা জিল্লুর রহমান বলেন, ‘তিন চার বছর ধরে নদীটার এমন অবস্থা হইছে। ছড়ার পানি, আবর্জনা, ময়লা মানে নদীর এমন অবস্থা হইছে যে নদীর পানিটা আমরা ব্যবহার করা কোন অবস্থা নাই। আমরা গোসল করি, কাপড় ধুই, আমরা খাইবার বাসনও ধুই, শাকপাতাও ধুই, তরকারিও ধুই। আমরা তো বাধ্য হইয়া করা লাগে। এগুলা তো ময়লা আবর্জনা, তারপরেও তো আমরা গোসল করি, কারণ আর যাওয়ার জায়গা নাই।’
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা- ধরা সিলেটের সদস্য সচিব আব্দুল করিম চৌধুরী কিম বলেন, ‘সুরমা নদীকে দূষণমুক্ত করতে হলে প্রথমে হচ্ছে গিয়ে সুরমা নদীতে যেন এই সমস্ত প্লাস্টিক বর্জ্য, পলিথিন এ সমস্ত বর্জ্য যেন না যায়, তা বন্ধ করতে হবে। সেটা বন্ধ করার জন্য সিলেট নগরীর প্রবাহমান সমস্ত ছড়া ও খালকে পরিষ্কার রাখা দরকার। এটা সবসময় চলছে, কিন্তু একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে মানুষ আবর্জনা ফেলছে। এই কাজটা বড় আকারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।’
সিলেট পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, খাল থেকে যত ময়লাগুলো যায়, সবই কিন্তু নদীতে যায়। আর নদীতে আমরা ড্রেজিং করার সময় দেখেছি প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফিট গভীরতা পর্যন্ত একেবারে ময়লা এবং প্লাস্টিকের স্তুপ।
তিনি আরও বলেন, ময়লা বা স্পয়েল ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে যদি সিটি কর্পোরেশনকে সহায়তা করি, অর্থাৎ ওনাদের যে স্পয়েল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আছে ওই সিস্টেমের আওতার মধ্যে যদি আমরা সবাই চলে আসি যত্রতত্র খাল এবং ড্রেনে ময়লা না ফেলি তাহলেই কিন্তু সুরমার প্রবাহ রক্ষা সম্ভব।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘সুরমা নদীকে দূষণমুক্ত করতে সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ হওয়ার আগেই বর্ষা মৌসুম শুরু হয়ে যাওয়ায় তা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। নদী রক্ষায় সিটি করপোরেশন কাজ করছে, তবে এ ক্ষেত্রে নগরবাসীর সচেতনতা ও সহযোগিতাও জরুরি।’
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host