জগন্নাপুরে সরকারি টাকা নিয়ে চলছে লুটপাটের নির্লজ্জ খেলা

প্রকাশিত: ৮:৪৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ৭, ২০২৬

জগন্নাপুরে সরকারি টাকা নিয়ে চলছে লুটপাটের নির্লজ্জ খেলা

তৌফিকুর রহমান তাহের, সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জের হাওরপারের মানুষের স্বপ্ন যখন অনিশ্চিত মেঘের দিকে চেয়ে থাকে, তখন সেই স্বপ্ন রক্ষায় বরাদ্দ হওয়া সরকারি টাকা নিয়ে চলছে লুটপাটের নির্লজ্জ খেলা। জগন্নাথপুর উপজেলার ফসল রক্ষা বাঁধের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন থেকে শুরু করে বিলের চেক ছাড় করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জেঁকে বসেছে এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট। অভিযোগের আঙুল খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের নাজির মিজানুর রহমান ও পিয়ন লিটনের দিকে। তাদের মাধ্যমেই চলছে এই উৎসবের ‘কমিশন বাণিজ্য।
নলুয়ার হাওর ও কুশিয়ারা নদীর ডানতীর এখন দুর্নীতির চারণভূমি। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য। পিআইসি সংশ্লিষ্টদের একটি ভিডিও ফুটেজে বলতে দেখা যায়, বাঁধের কাজ পেতে নাজির মো. মিজানুর রহমানের সাথে পিআইসি সভাপতি ও সেক্রেটারিকে ৭০ হাজার টাকার ‘রফা’ করতে হয়েছে। অর্থাৎ, কৃষকের ফসল রক্ষার গুরুদায়িত্ব পাওয়ার আগেই গুনতে হয়েছে মোটা অঙ্কের অগ্রিম টাকা।
দুর্নীতির এই থাবা কেবল কাজ পাইয়ে দেওয়াতেই ক্ষান্ত হয়নি। জানা গেছে, কাজের অগ্রগতির পর প্রতিটি বিলের চেক হস্তান্তরের সময় নাজির ও পিয়নকে দিতে হচ্ছে ৫ হাজার টাকা করে ‘কমিশন’। ভুক্তভোগীদের আক্ষেপÑযেখানে বাঁধের কাজে এক মুঠো মাটিও অমূল্য, সেখানে সরকারি বরাদ্দের এই ভাগ-বাঁটোয়ারা কৃষকের পিঠে চাবুকের আঘাতের সমান।
ভিডিওর সবচাইতে চাঞ্চল্যকর অংশটি হলো উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ পদের নাম জড়ানো। পিআইসি সংশ্লিষ্টদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, নাজিরের এই বিশাল বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছেন খোদ ইউএনও। তাদের ভাষায়, “ইউএনও সাব লাগে দুধে ধোয়া তুলসী পাতা, কিন্তু টাকাটা ওনার পকেটেও যায়।” এই একটি বাক্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দুর্নীতির শেকড় কতটা গভীরে এবং প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে ‘শর্ষের ভেতর ভূত’ বাস করছে।
নিয়মানুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-প্রকৌশলী বাঁধ পরিদর্শন করে বিলের চেক দেওয়ার কথা থাকলেও, জগন্নাথপুরে ইউএনও নিয়মবহির্ভূতভাবে নাজিরের মাধ্যমে চেক বিলি করছেন। স্থানীয়দের প্রশ্নÑকেন কারিগরি কর্মকর্তাদের বদলে একজন প্রশাসনিক পিয়ন বা নাজিরের হাতে চেকে বিতরণ করা হচ্ছে?
টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে নাজির মিজানুর রহমান বলেন, “আমি শুধু স্যারের নির্দেশে চেক রেডি করে স্বাক্ষর নিয়ে বিলি করি। টাকা নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা।” অন্যদিকে পিয়ন লিটন স্বীকারোক্তির সুরে বলেন, “পিআইসির লোকজন খুশি হয়ে আমাকে ৫০০-১০০০ টাকা দিয়ে যায়।” তবে খুশি হয়ে দেওয়া এই টাকা যে আসলে ‘বাধ্যতামূলক বকশিশ’, তা ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে স্পষ্ট।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের শাখা কর্মকর্তা (এসও) শেখ ফরিদ বলেন, “মাঠ পর্যায়ে কাজ তদারকি করা আমাদের দায়িত্ব। সদস্য সচিব হিসেবে সাচিবিক দায়িত্বও আমার। কিন্তু জগন্নাথপুরে বিলের চেক প্রস্তুতের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি ইউএনও কার্যালয় থেকেই সম্পন্ন হয়। সেখানে কোনো অনৈতিক লেনদেন হলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
অন্যদিকে, পুরো সিন্ডিকেটের প্রধান অভিযুক্ত নাজিরের বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ বরকত উল্লাহের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, চেক বিতরণের নির্দিষ্ট গাইডলাইন নেই, তবে সাধারণত ইউএনও স্বাক্ষর করে এসও-এর মাধ্যমে বিতরণ করার কথা।
হাওরের সাধারণ কৃষকরা বলছেন, বাঁধের কাজ যদি এভাবে চুক্তির ভিত্তিতে হয়, তবে কাজের মান তলানিতে নামবে। কোনোমতে দায়সারা বাঁধ দিয়ে টাকা পকেটে ভরলে আগাম বন্যায় যদি হাওর ডুবে যায়, তবে এর দায় কে নেবে? প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের এই ‘আড়ালে থেকে ভাগ নেওয়া’ পুরো উপজেলার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে।
সরকারি অর্থ জনগণের আমানত। সেখানে এমন সিন্ডিকেট রাজত্ব কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং নৈতিক স্খলনের চূড়ান্ত রূপ। হাওরবাসীর হাহাকার থামিয়ে এই ‘দুধে ধোয়া’ মুখোশ উন্মোচন করতে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এখন সময়ের দাবি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর