পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক আচরণে ‘জনগণের পুলিশ’ গড়ার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

প্রকাশিত: 12:54 AM, October 30, 2026

পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক আচরণে ‘জনগণের পুলিশ’ গড়ার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে ‘জনগণের পুলিশ’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাকাডেমির ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচের) ছয় মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সেবাপ্রত্যাশী সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সেবা দানে পুলিশকে হতে হবে আরও আন্তরিক। সকল প্রকার ভয়-ভীতি, পক্ষপাতিত্বকে উপক্ষা করে জনমানুষকে আইনি সেবা ও সুরক্ষা দিতে হবে। সর্বোপরি, মানুষের পাশে থেকে, মানুষকে সেবা দিয়ে, জনগণের আস্থা অর্জন করে সত্যিকার অর্থেই ‘জনগণের পুলিশ’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, মানুষের জন্য কাজ করেই মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে।’

বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার কথা পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভঙ্গুর পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠিত করে একটি দক্ষ, আধুনিক ও মানবিক সেবামুখী বাহিনীতে রূপান্তর করতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, জনবল বৃদ্ধি, যানবাহন ক্রয়, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও লজিস্টিক সরবরাহে কাজ চলছে।’

নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের প্রতীক্ষা, আইনি প্রক্রিয়া এবং নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এই ব্যাচের সদস্যরা দেশসেবার মহান পেশায় যোগ দিয়েছেন। নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে কোনো প্রকার বৈষম্য ও অন্যায়ের চর্চা করা যাবে না।’

পুলিশের পোশাক ও অর্পিত দায়িত্বকে কেবল সাধারণ চাকরির গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে জনগণের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার এক মহান অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানান মন্ত্রী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলা পুলিশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।’

এসব জটিল অপরাধ দমনে প্রথাগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক তদন্ত, তথ্য বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল ফরেনসিকের ওপর জোর দেন তিনি।

মন্ত্রী জানান, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্ব্যবহার, পক্ষপাতিত্ব ও পেশীশক্তির পরিবর্তে পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং মানবিক পুলিশিং চর্চা করতে হবে। সংবিধান ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষার আহ্বান জানান তিনি।

নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ পুলিশের বিভিন্ন স্পেশালাইজড ইউনিটে কাজের অবারিত সুযোগ রয়েছে। তবে কর্তব্যে অবহেলা, নৈতিকতা বিরোধী কাজ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধানও বলবৎ থাকবে।’

পরিশেষে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে নবীন কর্মকর্তাদের সফল পেশাগত জীবন এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাকাডেমির প্রিন্সিপাল মো. মাইনুল হাসান বিপিএম, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. রেজাউল আলম সরকার, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ। এছাড়া অনুষ্ঠানে সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণার্থীদের অভিভাবকবৃন্দ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যারেড পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন। তিনি ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ) থেকে বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। এএসপি প্রবেশনার মো. মাহবুব হোসেন প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।

উল্লেখ্য, এবারের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচের মধ্যে বেস্ট সার্জেন্ট হয়েছেন মোহা. ওমর ফারুক, বেস্ট একাডেমিক হয়েছেন মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ হয়েছেন সাইফুল ইসলাম এবং বেস্ট শ্যুটার হয়েছেন মোহাঃ আসাদুজ্জামান।

অন্যদিকে, ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ) থেকে বেস্ট ক্যাডেট হয়েছেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, বেস্ট একাডেমিক হয়েছেন মো. বোরহানুল ইসলাম, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ হয়েছেন দেওয়ান গোলাম রসুল এবং বেস্ট শ্যুটার হয়েছেন মো. কামাল গনি।

২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচের ৮৪ জন এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচের) ১৬২ জনসহ মোট ২৪৬ জন প্রশিক্ষণার্থী এদিনের সমাপনী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর