কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সিলেট আঞ্চলিক কার্যালয়ে মাকড়শা’দের নিরাপদ রাজত্ব

প্রকাশিত: ১২:৫৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২০

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সিলেট আঞ্চলিক কার্যালয়ে মাকড়শা’দের নিরাপদ রাজত্ব

খলিলুর রহমান
সিলেটের উন্নয়ন ও বহুতল বিশিষ্ট বিশাল ভবন। আছে আসবাবপত্র ফার্নিচার-সহ ব্যবহারের স্মার্ট ও আধুনিক সবকিছু। কিন্তু কোন লোকবল নেই, কাজকর্মও নেই। এই ভবনে এখন রাজত্ব করে রকমফের মাকড়শা’রা,ইচ্ছেমত জাল বুনে, বংশও বৃদ্ধি করে তারা নিরাপদে। ভবন সংশ্লিষ্ট সরকারী কাজ করতে হলে সিলেটবাসীকে যেতে হয় রাজধানী ঢাকায়। ভাড়া দিতে হয় রেল ও বাসের। ভাড়া করতে থাকতে হয় আবাসিক হোটেলে। ব্যয় করতে হয় সময় ও টাকা। আয়-রোজগার হয় রাজধানী ঢাকাবাসীর। দীর্ঘঁপ্রায় ৬ বছর ধরে প্রধান ফটক বন্ধ থাকা সেই ভবনটির নাম ‘কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সিলেট আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়।
অথচ ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যালয় ভবনটি উদ্বোধন করেন। ভবনটির সম্মুখে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামফলক। উদ্বেধনের পর থেকে আজোবধি এই কার্যালয়ের স্বতন্ত্র ও
স্থায়ী কোন দায়িত্বশীল বা লোকবল নিয়েগ দেওয়া হয় নি।
শিক্ষা প্রকৗশল অধিদপ্তর সিলেট জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল হাকিম সাংবাদিকদের জানান, স্কিলড ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে তিন তলা বিশিষ্ট এ ভবন নির্মিত হয়েছে। নির্মাণ কাজ শেষে ভবনটি কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের কাছে হস্তান্তরও করা হয়। হস্তান্তরের সময়ও সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালকের দায়িত্বে থেকে ভবনটি গ্রহণ করেন।
সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট’র অধ্যক্ষকে উপ-পরিচালক’র অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং একই কলেজের পাওয়ার ডিপার্টমেন্টের প্রধান প্রকৌশলী ও বিভাগীয় প্রধান মো. ইকবাল চৌধুরীকে কার্যালয়টির পরিদর্শক’-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং অফিস সহকারী হিসেবে একই কলেজের আরো একজনকে নিয়োগ দিয়েই দায়সাড়া উন্নয়ন করা হয় সিলেটে। তারা কেউই যান না এই ভবনে,তালাও খোলা হয়না প্রধান ফটক-সহ বিভিন্ন কক্ষের। আঞ্চলিক অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত তিনজনই সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট অফিসে বসেন। সারা বছরের মধ্যে একবারও নতুন ভবনটিতে বসেন না। আধুনিক ভবন ও স্মার্ট ডেকোরেশনসহ সকল সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ওই অফিসে কেউ যান না। নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রগুলোও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও এই আঞ্চলিক প্রধানের কার্যালয় থেকে ন্যূনতম সুবিধা পাচ্ছে না এ অঞ্চলের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোন ব্যক্তি ও শিক্ষার্থী। অথচ আধুনিক ভবনসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েই কার্যালয়টির উদ্বোধন হয় প্রয় ৬ বছর আগে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সিলেট আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়টি উদ্বোধন হলেও জনবল সংকটের কারণে এর কার্যক্রম শুরু যাচ্ছে না। আর এ কারণে কার্যালয়টিতে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্তরাও আসেন না। এমনকি নিয়োগপ্রাপ্ত অফিস সহকারীরাও কার্যালয়টি নিয়মিত বসেন না। ফলে এ ভবনটিতে অনেকটা ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে।
স্থায়ী লোকবল নিয়োগ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি পড়ে আছে অভিভাবকহীন অবস্থায়। এ কারণে সিলেট বিভাগের কারিগরি শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের ঢাকায় গিয়ে তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম সারতে হয়। ফলে তাদেরকে পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ-ভোগান্তি।
দক্ষিণ সুরমার টেকনিক্যাল রোডে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সিলেট আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়টির অবস্থান। কার্যালয়ে গেলে দেখা যায়, ভেতরে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই।
ভবনটির প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। প্রধান ফটকের পাশের ছোট একটি প্রবেশপথ। ভবনের নিচ তলার কয়েকটি রুম খোলা থাকলেও কক্ষগুলোর চেয়ার-টেবিল যত্র-তত্র পড়ে আছে । এ যেন প্রতিষ্ঠানটির কোনো অভিভাবক নেই।
সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের বর্তমান অধ্যক্ষ ও প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক ড. প্রকৌশলী মো: আব্দল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, স্থায়ী লোকবল না হওয়ায় তিনি প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত। প্র্রতিষ্ঠানটিতে স্থায়ী লোকবল নিয়োগের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। লোকবল নিয়োগ হলেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু হবে। তিনি আরো জানান, সারাদেশে আরো কয়েকটি কারিগরি শিক্ষাবোর্ড স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। আগামীতে এটা সিলেট কারিগরি শিক্ষাবোর্ডে রূপ নিতে পারে। বর্তমানে দেশে কেবল বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ড বিদ্যমান রয়েছে। এটি ঢাকায় অবস্থিত।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের ওয়েব সাইটের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে ৫০টি সরকারি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট রয়েছে। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের মধ্যে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে তিনটি সরকারি পলিকেটকনিক ইন্সটিটিউট রয়েছে। এছাড়া, বিভাগের চার জেলায় আরো ৫টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ রয়েছে। এর বাইরে এ বিভাগে আরো কয়েকটি বেসরকারি পলিটেকনিক এবং টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ রয়েছে। সিলেট অঞ্চলের এসব প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কাজ ঢাকায় গিয়েই সারতে হয়।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক আব্দুল কুদ্দুস জানান, এ প্রতিষ্ঠানটি কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন। স্থায়ী লোকবল নিয়েগ দেয়া হলে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হবে।
এদিকে আঞ্চলিক অফিস স্থাপন হলেও কার্যক্রম না থাকায় কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এই অফিসের দায়িত্বশীলরা নামে মাত্র হওয়ায় সবসময় ঢাকার সাথে যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন তথ্যের জন্য শিক্ষার্থীরা বেশ ভোগান্তিতে পড়েছে।
সিলেটর জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী কারিগরি কলেজের সাবেক সভাপতি ও তৈয়ব আলী কৃষি প্রযুক্তি ইন্সটিটিউট’র বর্তমান সভাপতি ফারুক আহমদ জানান, সিলেটে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের কার্যালয় চালু না হওয়ায় তাদেরকে রাজধানী ঢাকায় গিয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম চালাতে হয়। এ কারণে তাদের সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হচ্ছে। তিনি আরো জানান, বর্তমান সময়ে সরকার কারিগরি শিক্ষার ওপর সবচাইতে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছেন। এরপরও সিলেটে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর আঞ্চলিক কার্যালয়ের কার্যক্রম শুরু না হওয়া অতি দু:খজনক।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর