ছাতকে রাতের আঁধারে প্রাচীন কবরস্থান গুঁড়িয়ে দিল ভূমিদস্যুরা: শতাধিক কবর লণ্ডভণ্ড, এলাকায় তোলপাড়

প্রকাশিত: ১২:১২ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬

ছাতকে রাতের আঁধারে প্রাচীন কবরস্থান গুঁড়িয়ে দিল ভূমিদস্যুরা: শতাধিক কবর লণ্ডভণ্ড, এলাকায় তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় মৃত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল প্রাচীন একটি কবরস্থান দখলে নিতে পৈশাচিক তাণ্ডব চালিয়েছে একদল প্রভাবশালী ভূমিদস্যু। উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের গংপার নোয়াকুট গ্রামে রাতের আঁধারে বিশাল ‘পেলোডার’ (মাটি কাটার যন্ত্র) দিয়ে প্রায় শতাধিক পুরনো কবর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা ও শোকের ছায়া বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জল ৫২ উত্তর নিজগাও মৌজার খাস খতিয়ানভুক্ত ১১৬ নম্বর দাগের ২.৮৮ একর ভূমিটি ১৯৫২ সাল থেকে গ্রামবাসী পঞ্চায়েতী কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। ঐতিহাসিক দস্তাবেজ ও ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী এই ভূমিটি কবরস্থান হিসেবে নির্ধারিত, যা ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই পবিত্র স্থানটি দখলের পায়তারা করছিল। চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছেন ইসলামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৩নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা মিলন মিয়ার বোনের জামাই মখলিছুর রহমান, যুবলীগ নেতা রফিক আহমদ এবং আব্দুল কুদ্দুছ মিয়া।
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রথমে কবরস্থানের গাছপালা কেটে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর গত কয়েকদিন ধরে গভীর রাতে পেলোডার মেশিন চালিয়ে কবরস্থানের টিলা ও পুরনো কবরগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে শত বছরের পুরনো প্রায় শতাধিক কবর।

কবরস্থান ধ্বংসের ঘটনায় গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. আস্তাবুজ্জামান। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলে গত ২২ জানুয়ারি ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা কৃষ্ণ কান্ত দাস সরেজমিনে তদন্ত করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে (স্মারক নং–১১৩) উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তরা ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত কবরস্থানের প্রায় ০.২৫ একর ভূমি ভেকু বা পেলোডার দিয়ে মাটি কেটে এবং গাছপালা নিধন করে অবৈধভাবে দখল করেছে। তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে দখলের আলামত ও মাটি কাটার সত্যতা পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছেন।

নিজেদের পূর্বপুরুষদের কবরের চিহ্ন হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় বাসিন্দা আছদ্দর আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে আমাদের বাপ-দাদাদের কবর ছিল। রাতের আঁধারে গাছ কেটে, প্রায় ১০০-১৫০টি কবর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু জমি দখল নয়, আমাদের ধর্মীয় অনুভূতির ওপর সরাসরি আঘাত। আমরা এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
ভুক্তভোগী আফতাবুজ্জামান বলেন, “কারো বাবার কবর, কারো মায়ের কবর—সব মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। প্রশাসনের কাছে বারবার জানিয়েছি, কিন্তু ভূমিদস্যুরা এতটাই বেপরোয়া যে তারা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছে না।”
কবরস্থানের পাশের বাড়ির বাসিন্দা জামাল মিয়া বলেন, “ইতা তারার লাগি নয়া কুন্তা নায় (এসব তাদের জন্য নতুন কিছু নয়)। এর আগেও তারা বহু মানুষের জায়গা দখল করেছে। গোরস্থানের মাটি ও বালু দিয়ে ভরাট করে ২৫-৩০টি ভিটা বিক্রি করেছে। আমরা গরিব মানুষ, ভয়ে কথা বলতে পারি না।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত তিন ভাই ও তাদের সহযোগীরা এলাকায় দীর্ঘদিনের ত্রাস। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, চুরি, ভূমি দখল এবং পতিতালয় খুলে অসামাজিক ব্যবসা চালানোর বহু নজির রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে সাবেক এমপি মুহিবুর রহমান মানিক ও ছাতক পৌরসভার কাউন্সিলর তাপসের প্রশ্রয়ে তারা এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছিল। পটপরিবর্তনের পরেও তাদের দৌরাত্ম্য কমেনি।

এ বিষয়ে ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুফি আলম সুহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায়সারাভাবে বলেন, “আমি এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই।”
ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, “থানায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে উপজেলা প্রশাসন। ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, “আমার কাছে অভিযোগ আসার পর পরই আমি তহসিলদার ও সার্ভেয়ার পাঠিয়েছি। সরেজমিনে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। উভয় পক্ষকে কাগজপত্রসহ ডাকা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয়রা অবিলম্বে কবরস্থানটি দখলমুক্ত করা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী ভূমিদস্যুদের গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানিয়েছেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর