নির্বিঘ্নে পণাতীর্থ সম্পন্নে ছিলো নৌ-পুলিশের কঠোর নজরদারি

প্রকাশিত: ১০:০৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৮, ২০২৬

নির্বিঘ্নে পণাতীর্থ সম্পন্নে ছিলো নৌ-পুলিশের কঠোর নজরদারি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
দেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় এলাকা সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত নদী জাদুকাটায় নৌ-পুলিশের কঠোর নজরদারিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব, পণাতীর্থ ধামে, পূণ্যস্নানে, সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত সনাতন ধর্মের লাখো লাখো পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছিল।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ভোর ৫ টা ৩০ মিনিট থেকে শুরু হয়ে সকাল ৮ টা ৭ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে সমাপ্ত হয় পণতীর্থ স্নানযাত্রা উৎসব। স্নান যাত্রায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পূণ্য লাভের মনোভাসনায়, গত দুদিন পূর্ব থেকেই তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত নদী জাদুকাটার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামে সমবেত হয়েছেন পুণ্যার্থীরা।

স্নান যাত্রায় আসা প্রবীর দাস বলেন, বিগত ৭ শত বছরের প্রাচীন স্নানযাত্রা উৎসব, বাংলা বছরের চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে, তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত নদী জাদুকাটায় স্নান করলে, সকল পাপ মোচন হয় বলে প্রচলিত রয়েছে। সেই থেকে আমরা সনাতন ধর্মের লাখো, নারী, পুরুষ, আবাল, বৃদ্ধ-বনিতা, পুণ্য লাভের আশায় প্রতি বছরই দেশের নানা প্রান্ত থেকে জাদুকাটা বা পুণ্যতীর্থে স্নান করতে আসি। শুধু তাই নয়, এ নদীতে স্নান করাকে আমরা গঙ্গাস্নানের সমতুল্য মনে করি।
চট্রগ্রাম থেকে আসা পুণ্যার্থী, প্রদীপ চৌধুরী বলেন, প্রচলিত রয়েছে, ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে, প্রাচীন লাউড় রাজ্যের হাবেলীর পুরোহিত শ্রী শ্রী অদ্বৈত আচার্যের মা নাভা দেবীর গঙ্গাস্নান করার মনস্কামনা উপস্থাপন করেন। কিন্তু বায়োবৃদ্ধ হওয়ার উনার সুদূর তীর্থে যাওয়ার শারীরিক সক্ষমতা ছিলনা বলে, যোগ সাধনা করে, মাকে গঙ্গাস্নান করানোর জন্য, সপ্ত গঙ্গার জল একত্রিত করে, শ্রী শ্রী অদ্বৈত আচার্য্য মায়ের মনস্কামনা পূরণ করতে মাকে গঙ্গাস্নান করিয়েছিলেন, শ্রী শ্রী অদ্বৈত আচার্যের আখড়াবাড়ী মন্দির সংলগ্ন, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের রাজারগাঁও নবগ্রামের সামনে ভারতের অভ্যন্তর থেকে প্রবাহিত জাদুকাটা নদীর জলধারায়।
কথিত রয়েছে, তখনকার সময়ের লাউর রাজ্যের সাধক ও পুরুষ অদ্বৈত আচার্যের সাধনাসিদ্ধের ফল মহাবারুনী যোগ নামে অভিহিত হয়েছে।
প্রতি বছর বাংলা সনের চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতীসহ সাত পুণ্যনদীর জলপ্রবাহ একসঙ্গে জাদুকাটায় (পণাতীর্থে) এসে মিশে বলেও বিশ্বাস করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এজন্য তারা মনে করেন সব তীর্থ বার বার পণাতীর্থ একবার। কেননা, এখানে স্নান করলে, গঙ্গাস্নানের চেয়েও বেশি পুণ্য হয় বলে বিশ্বাস করে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তাদের মতে এই জাদুকাটা নদীতে মধু তিথিতে স্নান করলে অতীতের সকল পাপ মোচন হয়ে যায়। সেই বিশ্বাস থেকেই গত, ৭ শত বছরের অধিক সময় ধরে, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা তিথিতে, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের রাজারগাঁও নবগ্রাম অদ্বৈত আখড়াবাড়ী মন্দির সংলগ্ন ২৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সীমান্ত নদী জাদুকাটায় এসে স্নান করে, নিজেদেরকে পাপমুক্ত করেন।
পুণ্যতীর্থ বারুনী স্নান উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব কানন বন্ধু রায় জানান, এ বছর স্নানের যোগ, আবহাওয়া, এমনকি সড়ক এবং নৌ-পথের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেকতাই ভালো ছিল। তাই পুণ্যার্থীদের আগমনও অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি হয়েছে।
বাদাঘাট পুলিশ ক্যাম্পের ইনর্চাজ মো হাফিজুল ইসলাম বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব, পণাতীর্থ ধামে, পূণ্যস্নানে, সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত সনাতন ধর্মের লাখো লাখো পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছিল। এতে অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি বাদাঘাট পুলিশ ক্যাম্প পূণ্যার্থীদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক নজরদারিতে ছিল।
আগের তুলনায় এই বছর পনাতির্থ সুন্দর ভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
মেলার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রস্তুতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, টুকের বাজার নৌ-পুলিশ ফাড়ির ইনর্চাজ দিলীপ বড়ুয়া এ প্রতিবেদককে জানান, আখড়াবাড়ী মন্দির পণতীর্থধামে গঙ্গাস্নান, গড়কাটি ইসকন মন্দির এবং বালুচরে বারুনী মেলায়, পুলিশ-বিজিবি ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর চারটি অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হয়েছে। এছাড়াও দু’জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ২টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের পাশাপাশি মেটাল ডিটেকটর দিয়ে, আগতদের দেহ, ব্যাগ তল্লাশি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিএসবি, সাদা পোশাকধারী পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ নজরদারি রয়েছে। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোতে দিবারাত্রি যাতায়াতকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, রাহাজানি প্রতিরোধে একাধিক পুলিশ ও বিজিবির টহল দল মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি সোমবার হতে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত নদী পথে নৌ-পুলিশ সার্বক্ষণিক পূণ্যর্থীদের সার্বিক নিরাপত্তায় কঠোর নজরদারির মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে ধর্মীয় উৎসব সম্পন্ন হয়েছে।

সর্বশেষ ২৪ খবর