সিলেটে ব্যবহৃত হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় দুঃশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা

প্রকাশিত: ৫:৫৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০২৪

সিলেটে ব্যবহৃত হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় দুঃশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা

মিসবাহুল ইসলাম চৌধুরী
কাঁচা বাজার ও সুপারশপে পলিথিন ব্যবহারে নিষিদ্ধ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে এখন পর্যন্ত পলিথিনের বিকল্প কোন ব্যবস্থা না থাকায় দুঃশিন্তায় পড়ছেন তারা। তাদর দাবি যথা সম্ভব দ্রুত পলিথিনের বিকল্প ব্যবস্থা করা হোক।

 

এক মাস আগেই সরকার এই ঘোষণা দিয়েছিল। ১ নভেম্বর থেকে হাট বাজার সর্বত্র সর্বনাশা পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিন ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ। এর আগে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর বিধান অনুসারে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০২ সালের ১ মার্চ সরকার বাংলাদেশে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তখন ছিল চারদলিয় জোট সরকার শাসনামল। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ শাসন করেছে। ২০০২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পলিথিন নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও কোনো রাজনৈতিক সরকার তা বন্ধ করতে পারেনি? এ যেন এক মহাশক্তির পলিথিন।

 

এবার পরিবেশ, বনও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ১ অক্টোবর থেকে সুপারশপ ওকাচা বাজারে কোনো ধরনের পলিথিন বা পলিপ্রপিলিনের ব্যাগ রাখা যাবে না এবং ক্রেতাদের দেওয়া যাবে না। বিকল্প হিসেবে সব সুপারশপে বা শপের সামনে পাট ও কাপড়ের ব্যাগ ক্রেতাদের জন্য রাখা হবে। এমন ঘোষণার পরেও সিলেটের কাঁচাবাজার ও সুপারশপে আগের নিয়মেই চলছে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার। বুধবার বন্দর বাজার, আম্বরখানা সুবিদ বাজার ও মদিনা মার্কেট এলাকার বাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়।

 

ক্রেতা-বিক্রেতাদের অনেকে জানান, কাঁচাবাজারে পলিথিন নিষিদ্ধের বিষয়টি তাঁরা শোনেননি। আবার অনেকে বলেন, পলিথিন নিষিদ্ধের বিষয়ে তাঁরা জানলেও বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে পলিথিন ব্যবহার করছেন।
সিলেটের উপশহর সবজি বাজারে মাওলানা জামিল আহমদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে পলিথিন নিষিদ্ধ করতে আইন পাশ করে ও কোন লাভ হয়নি। ২০০২ সাল থেকেই শুনতেছি কিন্তু বাজারে অবাদ মিলছে পলিথিন ,পাইকারি দোকান সহ কলকারখানা এখনও খোলা। এবার পরিবেশ, বনও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আবার নিষিদ্ধের ঘোষণা দিলে জনগণের মনে আশার আলো জাগেলেও বাস্তবে বাজারে পলিথিন ব্যবহার বন্ধে মনিটরিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে নাম মাত্র।

 

বিকল্পের ব্যবস্থা না করেই নিষিদ্ধ, ক্রেতা-বিক্রেতার ক্ষোভ শাহপরান বাজার, ইসলামপুর,শিবগন্জ ও বন্দর বাজার এলাকায় দেখা যায়, সবজি, মাছসহ সব ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রেই পলিথিন ব্যাগ দেওয়া হচ্ছে।
বিক্রেতারা বলছেন, আগে কিনে রাখা পলিথিন ব্যবহার করছেন তাঁরা। বিকল্পের ব্যবস্থা না করেই পলিথিন নিষিদ্ধ করায় ক্রেতা-বিক্রেয় করছেন।

 

পরিবেশবিদরা বলেন, বর্তমানে বাজারে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার খোলামেলাভাবেই বেড়েছে, যা খুবই উদ্বেগজনক ও হতাশার। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর আইন থাকার পরও নিষিদ্ধ পলিথিন বিক্রি বন্ধ করা যাচ্ছে না। ক্রেতারাও পলিথিনে মালামাল গ্রহণ করছেন। পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে যে পরিমাণ চাপ বা কড়াকড়ি প্রয়োজন, তা আসলে নেই। এখন এমন অবস্থা যে, একটা ডিম কিনলেও দোকান থেকে পলিথিন দেওয়া হয়। আর ক্রেতারা সেই পলিথিন বাসায় এনে ফেলে দেয়। সেই ফেলে দেওয়া পলিথিন ময়লার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। মিশে গিয়ে অপচনশীল অবস্থায় থেকে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। ২০০২ সালে ১ মার্চ আইন করে বিষাক্ত পলিথিন উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে তৎকালীন সরকার। দেশে পলিথিনের ব্যবহার কমেনি; বরং দুই দশকের বেশি সময় ধরে পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়তে দেখা গেছে। এরপর সরকার ২০১০ সালে আরেকটি আইন করে। তাতেও কার্যকর কিছু হয়নি। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ৩ হাজার কারখানায় দৈনিক ১ কোটি ৪০ লাখ প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন হয়। যার অধিকাংশ কারখানা রয়েছে রাজধানীর পুরান ঢাকায়। এই পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার এর প্রায় সবই বর্জ্য হিসেবে মাটি ও নদ নদীতে মিশে পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি করছে। পরিবেশ রক্ষায় (৩ নভেম্বর) থেকে পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে সারা দেশের ন্যায় অভিযান পরিচালনা করে সিলেট শহরের কয়েকটি বাজারে পলিথিন ব্যবহার বন্ধে মনিটরিং কার্যক্রম চালানো হয়। বিভিন্ন সুপার শপে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর গঠিত মনিটরিং টিম।

 

এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা আসার পর থেকে অভিযান পরিচালনা করছেন বলেন জানিয়েছেন তারা। মনিটরিং কমিটির সদস্যরা বাজার করতে আসা মানুষকে পলিথিন ব্যবহার না করে পাট ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারের অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে দোকানিদের পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার বন্ধে নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং পরবর্তী অভিযানে পলিথিনের ব্যাগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

 

নাম প্রকাশে অনিইচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, মূল বিষয় হলো- পলিথিনের অর্থনীতি অনেক বড়। এত বড় অর্থনীতির সুবিধাভোগী অনেক। এই সুবিধাভোগীরা হয়তো সাময়িক চুপ থাকবে কিন্তু তারা আবার ফিরবে। তাই অন্তর্র্বতী সরকার থেকে রাজনৈতিক সরকার সবারই পলিথিন নিষিদ্ধে এক থাকতে হবে। না হয় এই সরকার নিষিদ্ধ করবে, পরের সরকার এসে তা উন্মুক্ত করবে, এভাবে আর যাই হোক পলিথিন নিষিদ্ধ হবে না। কঠোর থেকে কঠোরতর ভূমিকায় এগিয়ে না এলে পলিথিন কখনো বন্ধ হবে না। ২০০২ সালে নিষিদ্ধ করার পরেও পলিথিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে শুধুমাত্র সরকারের উদাসীনতা আর ঢিলেঢালা মনোভাবের কারণে। তাই পলিথিন নিষিদ্ধ করতে সরকারের পাশাপাশি সর্বমহলকে এখনই প্রতিকার এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। না হয় পলিথিন আগামী প্রজন্মকে গ্রাস করে ফেলবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর