সিলেট চেম্বারের বিভক্তি স্পষ্ট : এক পক্ষের সংবাদ সম্মেলন, অপর পক্ষের প্রতিবাদ

প্রকাশিত: 6:37 PM, December 2, 2024

সিলেট চেম্বারের বিভক্তি স্পষ্ট : এক পক্ষের সংবাদ সম্মেলন, অপর পক্ষের প্রতিবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সিলেট চেম্বারের মধ্যকার বিভক্তি এখন প্রায়ই স্পষ্ট। গত ৫ আগস্টের পর থেকে এই বিভক্তির শুরু হলেও প্রথম দিকে তেমন একটা বোঝা যায়নি। কিন্তু দিন যত গড়াচ্ছে, বিবধমান পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হচ্ছে। এরই ফলস্বরূপ আজ সোমবার (০২ ডিসেম্বর) সিলেটের সর্বস্তরের ব্যবসায়ীবৃন্দ’র ব্যানারে এক প্রতিবাদি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। নগরের একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সর্বস্তরের ব্যবসায়ীবৃন্দের পক্ষে সিলেট চেম্বারে প্রশাসক নিয়োগের দাবি জানান চেম্বারের সাবেক পরিচালক আমিরুজ্জামান চৌধুরী দুলু। এজন্য তিনি ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। অন্যথায় ৮ ডিসেম্বর সিলেট চেম্বারের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন এবং পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার হুশিয়ারি দেন তিনি।

আমিরুজ্জামান চৌধুরী দুলু বলেন, সিলেটের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন সিলেট চেম্বার অব কমার্সে আওয়ামী স্বৈরাচারের মদদপুষ্ট পরিষদ বাতিল করে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিনিধিত্বশীল পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। এ দাবি মেনে নিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করা না হলে ৮ ডিসেম্বর সিলেট চেম্বারের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন এবং পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দি সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি ব্যবসায়ীদের স্বার্থে তেমন কোন কার্যক্রম পরিচালনা করেনি। বরং রাজনৈতিক মদদপুষ্ট কিছু অসৎ ব্যবসায়ী সিলেট চেম্বারের নেতৃত্বে আসীন হয়ে চেম্বারকে দলীয় প্রষ্ঠিানে পরিণত করে। এ ধারাবাহিকতার ২০২২-২৩ সালে পরিচালনা পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রথমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদনক্রমে নির্বাচন করতে পরিষদের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। পরবর্তীতে বাণিজ্য সংগঠনের বিধিমালা, লঙ্ঘন করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের যোগসাজসে গোপনীয়ভাবে নির্বাচন দেখিয়ে ভোটার ও প্রার্থীগের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ২০২৪-২৫ মেয়াদের জন্য পরিচালনা পরিষদ ঘোষণা করা হয়। সিলেটের ব্যবসায়ী সমাজ এই বিতর্কিত কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করলে পরিচালনা পরিষদের ২০ জন পরিচালকের মধ্যে সহ-সভাপতিসহ ৫ জন পরিচালক এ পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের উপর সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগে চেম্বার সভাপতি তাহমিন আহমদসহ আরো ৫/৬জন পরিচালকের উপর মামলা হয়। এই মামলার আসামিরা বর্তমানে পলাতক থেকেও নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে আমিতুজ্জামান চৌধুরী দুলু অভিযোগ করে বলেন, স্বৈরাচারের দোষররা গোপনীয়ভাবে পরিচালনা পরিষদ নিজেরা পূর্ণগঠন করে একজন পরিচালককে সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছেন। যিনি স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। বর্তমানে একজন সিনিয়র পরিচালককে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বানিয়ে চেম্বার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। চলতি ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এই গোপনীয় পরিষদ চেম্বারের এজিএম অনুষ্ঠানের পায়তারা করছে যা ব্যবসায়ীরা কোনভাবেই মেনে নিবে না। তিনি আরো বলেন, প্রতিনিধিত্বশীল পরিচালনা পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে একজন প্রশাসক নিয়োগ করে নির্বাচন আয়োজন করা এখন সময়ের দাবি। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে মহাপরিচালক বাণিজ্য সংগঠন, বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা বরাবরে পৃথক দুটি আবেদন করা হয়েছে। এরপর মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে চিঠির প্রেক্ষিতে সিলেটের জেলা প্রশাসক ব্যবসায়ীদের সাথে সভা করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। কিন্তু এই ব্যাপারে কোন দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন না বলে উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠন নিয়ে কোন ধরণের ষড়যন্ত্র মেনে নিতে পারি না। আমরা ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধভাবে সকল যড়যন্ত্র প্রতিহত করতে প্রস্তত রয়েছি। নির্বাচন আয়োজনের জন্য একজন প্রশাসক নিয়োগের কোন বিকল্প নেই বলে সিলেটের ব্যবসায়ীরা মনে করেন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযেগিতা কামনা করেন। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআই’র সাবেক পরিচালক খন্দকার সিপার আহমদ।

এদিকে, সংবাদ সম্মেলনের বক্তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য ও বানোয়াট বলে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ। সোমবার (০২ ডিসেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে চেম্বারের সচিব মো. গোলাম আক্তার ফারুক স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে প্রেরিত এক পত্রদ্বারা এ প্রতিবাদ জানানো হয়।

এতে বলা হয়, ‘সোমবার দি সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’র বর্তমান পরিচালনা পরিষদের বিরোধী একটি বিশেষ মহলের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত অসত্য ও মানহানিকর বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ বর্তমান কমিটিকে নির্বাচনবিহীন, অবৈধ কমিটি বলে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে খন্দকার সিপার আহমদ গত নির্বাচনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। শুধু তাই নয়, সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ এর মধ্যস্থতায় তার বেয়াই এহতেশামুল হক চৌধুরী গত নির্বাচনে সহ সভাপতি নির্বাচিত হন এবং তার ছেলে খন্দকার ইসরার আহমদ রকী পরিচালক নির্বাচিত হন। গত ২২ জানুয়ারি ২০২৪ইং তারিখে অনুষ্ঠিত প্রেসিডিয়াম নির্বাচন ও ০৯ মার্চ ২০২৪ইং তারিখে অনুষ্ঠিত দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তিনি নবনির্বাচিত পরিচালনা পরিষদ ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদেরকে তিনি শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন। এসব অনুষ্ঠানে তার ছবি চেম্বারে রক্ষিত আছে। শুধু তাই নয় গত নির্বাচনের পর খন্দকার সিপার আহমদ, তার বেয়াই এহতেশামুল হক চৌধুরী ও ছেলে খন্দকার ইসরার আহমদ রকী সহ অন্যান্য পরিচালকগণের উদ্যোগে কুশিয়ারা কনভেনশন হলে বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে চেম্বারের প্রায় ৫ হাজার সদস্যকে আপ্যায়ন করা হয়।’

প্রতিবাদ পত্রে বলা হয়, ‘সিলেট চেম্বারের গত নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সিলেট চেম্বারের গত নির্বাচন যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে আয়োজন করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র বোর্ডে নির্বাচিত পরিচালকগণ মনোনয়ন পত্র ক্রয় করতে পেরেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নির্ধারিত তারিখের মধ্যে অর্ডিনারী শ্রেণীর ১২টি পদের বিপরীতে ১৬টি ও এসোসিয়েট শ্রেণীর ৬টি পদের বিপরীতে ৯টি মনোনয়নপত্র বিক্রয় হয়েছে। যার মধ্যে মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ তারিখ ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩ইং তারিখের মধ্যে অর্ডিনারী শ্রেণীতে ১৩টি ও এসোসিয়েট শ্রেণীতে ৭টি মনোনয়নপত্র পত্র জমা পড়ে। কিন্তু নির্বাচনের প্রাক্কালে কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করায় পরিচালনা পরিষদের পদসংখ্যা এবং প্রার্থীর সংখ্যা সমান হওয়ায় ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন বোর্ড ৪টি শ্রেণীর ২৩ জন প্রার্থীকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেন। তখন সকল ব্যবসায়ী মহল ও চেম্বারের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ বর্তমান কমিটিকে স্বাগত জানান। নির্বাচনী ফলাফলের বিরুদ্ধে আপীলের জন্য নির্বাচনী তফসিলে ৩ দিন সময় বরাদ্দ থাকলেও ঐ সময়ের মধ্যে কেউ কোন আপীল উত্থাপন করেননি। অথবা পরবর্তী এক মাসের মধ্যেও মহাপরিচালক, বাণিজ্য সংগঠন বরাবরে কোনরূপ আপত্তি করেননি। কিন্তু দেশের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নির্বাচনের এতদিন পর একটি মহল নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বর্তমান পরিচালনা পরিষদকে বাতিল করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে সিলেট চেম্বারের সাবেক পরিচালক এনামুল কুদ্দুছ চৌধুরীর বক্তব্য খন্ডন করে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বলেন, ‘তিনি অভিযোগ করেছেন যে, চেম্বারের গ্রুপ সদস্যগুলোর কাগজপত্র ঠিক নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গ্রুপ সংগঠনের লাইসেন্স প্রদান করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাদের কাগজপত্র দেখার দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। এতে সিলেট চেম্বারের কিছু করার নেই। সদস্যপদ সংক্রান্ত কাগজপত্র ঠিক থাকলে সিলেট চেম্বার সদস্যপদ নবায়ন করতে বাধ্য। উল্লেখ্য যে, এনামুল কুদ্দুছ চৌধুরী বিগত ২টি নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভোটে চেম্বারের সদস্যদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।’

অভিযোগকারী মহলটির অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিলেট চেম্বারের বিগত নির্বাচন ও বর্তমান কমিটির কার্যক্রম সংক্রান্ত একটি তদন্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), সিলেট কর্তৃক সম্পন্ন হয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন আছে। এমতাবস্থায় প্রক্রিয়াধীন একটি বিষয় নিয়ে এরকম সংবাদ সম্মেলন আয়োজন এবং চেম্বার নিয়ে অসত্য ও অবমাননাকর বক্তব্য প্রদান কখনই সমীচীন নয় বলেও মন্তব্য করে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর