ঢাকা ৯ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১১:৪৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৫, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলার পাথর লুটের ঘটনা দীর্ঘদিনের। প্রতিনিয়ত কোনো না কোনোভাবে লুট হয়ে থাকে সাদা সোনা খ্যাত এই পাথর। ০৫ আগস্টের’২৪ পর রীতিমত হরিলুট চলে এই পাথার রাজ্যে। চোখের পলকেই শেষ হয়ে যায় কয়েক কোটি টাকার সাদা পাথর। এমন সংবাদে যখন দেশ-বিদেশে তোলপাড়। ঠিক তখনই টনক নড়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। খোদ মন্ত্রাণালয় থেকে বিষয়টি তদারকি করা হয়। এরপর কঠোর অ্যাকশনের মাধ্যমে বদলি করা হয় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনসহ পুলিশের বেশ কয়েক জন্য কর্মকর্তাকে।
এরপর মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপে সিলেটে আসেন জেলা প্রশাসক সরোয়ার আলম। সিলেটে আসার প্রথম দিনই তিনি সাদা পাথর লুট হওয়া এলাকা পরিদর্শন করেন এবং হুঙ্কার দিয়ে অসাধু কারবারিদের কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেন।
স্থানীয়রা জানান, জেলা প্রশাসকের অ্যাকশনের ফলে এখন আর আগের মতো পাথর লুট না হলেও অনেকটা কৌশলে লুট হচ্ছে শাহ আরেফিন টিলার পাথর। প্রতিদিনই বিভিন্ন পন্থায় স্থানীয় আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের দোসরদের মাধ্যমে প্রকাশ্যে লুট হচ্ছে এসব পাথর। আর ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতির নৈসর্গিত লীলাভূমি। বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে পরিবেশ ও পর্যটন ব্যবস্থা। সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব।
স্থানীয়দের মতে, ওই এলাকার লাইনের ইজারা নিয়ে বসে আছেন পাড়ুয়া উজানপাড়া গ্রামের জয়নাল মিয়ার ছেলে ইলিয়াস আলী রাসা(৪৩) ও একই গ্রামের জালাল মিয়ার ছেলে জসিম উদ্দিন(৪২)। এর মধ্যে রাসা হলো ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারে আমলের জুলমবাজ শামীম আহমেদের ভাতিজা। তারা দুজনই নিয়ন্ত্রণ করছেন শাহ আরেফিন টিলার পাথর চুরির সকল কার্যক্রম। নিজেরা লাইন ক্লিয়ার করে প্রতিনিয়ত কয়েক লাখ টাকার পাথর দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করছেন অনায়াসে।
সূত্র জানায়, পাথরবাহী ট্রাক্টর প্রতি ৫শ টাকা করে আদায় করে লাইন ক্লিয়ার করে থাকেন রাসা। নিজের গুন্ডা বাহিনী দিয়ে দমন করেন পুলিশী অভিযান। তাদেরকে রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে দেশীয় অস্ত্রসহ অবস্থান করতে দেখেন স্থানীয়রা। রাসা ও তার গুন্ডাবাহিনীর পুলিশও ওয়াকিবহাল। কিন্তু এতসবের পরও থানা পুলিশ নির্বিকার। কারণ, অস্ত্রধারী ওই সন্ত্রাসীদের সাথে পুলিশের একার পেরে ওঠা সম্ভব নয়। ইতোপূর্বে বেশ কয়েক বার অভিযানে গিয়ে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। পুলিশ সদস্যরা। এমতাবস্থায় স্থানীয় জনতাও তাদের এমন কৃতকর্মে অতীষ্ঠ। কিন্তু এসব দেখার যেনো কেউ নেই। আর এভাবেই দিনের পর দিন দাপট কাটিয়ে এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করে প্রতিদিনই লাখ লাখ টাকা লুট করছেন ইলিয়াস আলী রাসা। এতে জনমনে ক্ষোভসহ নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ এখন লাপাত্তা থাকার পরও রাসার খুঁটির জোর কোথায়? এমন প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।
এদিকে শাহ আরেফিন টিলার পাশেই রয়েছে জসিমের নিজস্ব স্টোন ক্রাশার। রাসার মাধ্যমে পাচার হওয়া পাথরের বিরাট একটি অংশ চলে যায় তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। এরপর সেখান থেকে ভূতুভাঙা, সিঙ্গেল ও এলসি আকারে তা বিলি হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে।
মূলত, শাহ আরেফিন টিলার পাথর চুরির নেপথ্যে ওই রাসা-জসিম কুতুবকেই দায়ি করছেন এলাকাবাসী। তারা বলেন, এই দুইয়ে মিলে ধ্বংস হচ্ছে শাহ আরেফিন টিলার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ। বিনষ্ট হচ্ছে সরকারি খনিজ সম্পদ। সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
তারা অনতিবিলম্বে রাসা-জসিম সিন্ডিকেট ভেঙে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক মো. সরোয়ার আলমসহ সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। না হলে এই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসরদের সিন্ডিকেটে স্থানীয় জনজীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মূল অপরাধীদের সাথে লোভে স্থানীয় যুবকরাও এই লাইনে নাম লেখাতে পারে। তাছাড়া, সম্প্রতি মূল অপরাধীদের সাথে অনেক নিরপরাধ লোকও শ্রীঘরে বাস করছে। মূলত, এর থেকে পরিত্রাণ চায় শাহ আরেফিনের জনতা।
এ বিষয়ে কয়েকজন পাথরবাহী ট্রাক্টর চালকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, বাধ্য হয়েই তারা রাসাকে টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে রাসার গুন্ডাবাহিনী গাড়ি আটকিয়ে চালকদের মারধোরসহ পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি প্রদর্শন করে। তাই লাইন ক্লিয়ার রাখতে তাকে টাকা দিতেই হয়।
তবে, এসব বিষয়ের সাথে স্থানীয় কথিত কিছু সাংবাদিক জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন চালকরা। তাদের দাবি, ওই সাংবাদিকরাও রাসা-জসিমের লোক। তারা সবকিছু জানেও তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে উল্টো তাদের থেকে মাসিক বখরা নিচ্ছেন। রাসার গুন্ডাবাহিনীর সাথে প্রায়ই তাদের অবস্থান করতে দেখা যায়। তারাও পুলিশকে কল করে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে রাসা বাহিনীর হাতে টাকা তুলে দিতে চাপ প্রয়োগ করে থাকেন।
নিজের প্রতি স্থানীয়দের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ইলিয়াস আলী রাসা বলেন, ‘শাহ আরেফিন টিলার চলাচলের রাস্তায় তার মৌরসী জমি রয়েছে। সেই জমির উপর দিয়েই পাথরবাহী ট্রাক্টটরগুলো যাতায়াত করতে হয় বিধায় তিনি জমির ভাড়া হিসেবে তাদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলন করেন। কোনো চালককে ভয় দেখিয়ে কিংবা জোর করে টাকা আদায় করেননি, বরং চালকরা খুশি হয়েই গাড়ি প্রতি ৫শ টাকা প্রদান করেন।’
এদিকে অপর অভিযুক্ত জসিম জানান, ‘শাহ আরেফিন টিলার পাশেই তার নিজস্ব স্টোন ক্রাশার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাথরখেকোরা জোর করে তার কাছে চুরির পাথর বিক্রি করে। তাদের চাপের মুখে প্রতিনিয়ত ১০/১৫ গাড়ি পাথর তিনি ক্রয় করেন বলেও স্বীকার করেন। তবে, তিনি দাবি করেন- পাথর চুরির সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি শুধু চোরাই পাথর ক্রয় করে তা অন্যত্র বিক্রয় করে থাকেন।’
এব্যাপারে জানতে চাইলে কোম্পানীগঞ্জ থানার এসআই কামরুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘রাসা-জসিম সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পুলিশী অভিযান অব্যাহত আছে। এর আগেও বেশ কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু সেইসব অভিযানে বাধা প্রদান করেছে রাসার গুন্ডাবাহিনী। তারা দেশীয় অস্ত্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান করে থাকে। পুলিশী অভিযানের বিষয়টি নজরে আসা মাত্রই তারা নিজের লোকদের সরিয়ে নেয় এবং পুলিশের বিরুদ্ধাচারণ করে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘গত ৩০ ডিসেম্বর’২৫ আমি নিজে বাদী হয়ে একটি মামলা (এফআইআর নং-২৯) দায়ের করেছি। এরআগে ওইদিন ভোর পৌনে ৬টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শাহ আরফিন টিলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের সময় আসামিদের ধাওয়া করেছি। সকাল প্রায় সোয়া ৬টার দিকে বাবুলনগর এলাকার জনৈক আব্দুল কাইয়ুমের চায়ের দোকানের সামনে থেকে ৪টি পাথর বোঝাই মাহিন্দ্রা হাইড্রোলিক ট্রাক্টরসহ ১৬ জনকে হাতেনাতে গেফতার করেছি। অভিযানে প্রায় ৪০০ ঘনফুট পাথর উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে খনি ও খনিজ সম্পদ আইন ১৯৯২ এবং দণ্ডবিধির ৩৭৯/৪৩১/৪১১ ধারায় আমি মামলাটি দায়ের করেছি, যা নথিভুক্ত করা হয়েছে।’
এসআই কামরুল বলেন, ‘ওই মামলা রাসা ও জসিম অন্যতম এজাহার নামীয় আসামি। তাদেরকে গ্রেফতারে শুধু পুলিশী অভিযান দিলে হবে না, যৌথ অভিযানের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি রাসা বাহিনী অনেকটা বেপরোয়া ও দেশীয় অস্ত্রধারী বলে দাবি করেন।
রাসা-জসিম বাহিনীর কুকীর্তি অনুসন্ধানে মাঠে রয়েছে বিজয়ের কণ্ঠ। শীঘ্রই পরবর্তীতে তাদের অপকর্মের বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host