ঢাকা ৯ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:০০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৭, ২০২৬
তৌফিকুর রহমান তাহের, সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় বোরো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে চরম অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কাজ শুরুর ২২ দিন অতিবাহিত হলেও মাঠপর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। নির্ধারিত ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে হাওরপাড়ের হাজার হাজার কৃষক চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। একদিকে কাজের মন্থর গতি, অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে নীতিবহির্ভূত স্বজনপ্রীতি ও লাখ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনপদ।
কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী, বাঁধের পাশে জমি নেই এমন ব্যক্তির কমিটিতে থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু শাল্লায় প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে ভূমিহীন ও অকৃষকদের নিয়ে কমিটি গঠনের অভিযোগ উঠেছে। সরজমিনে দেখা যায়, ২৫ নং পিআইসির সভাপতি নিউটন দাস ও সদস্য সচিব সজল চন্দ্র দাসের বাড়ি বাহাড়া ইউনিয়নে হলেও সংশ্লিষ্ট বাঁধের পাশে তাদের কোনো জমি নেই। জনৈক প্রভাবশালী নেতার হস্তক্ষেপে উপজেলা কাবিটা স্কিম প্রণয়ন কমিটি নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই কমিটি অনুমোদন দিয়েছে বলে তৃণমূলের কৃষকরা অভিযোগ করেছেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন উপজেলার প্রথম উদ্বোধনী বাঁধ ২৭ নং পিআইসির সভাপতি কালাবাঁশী দাস। তিনি দাবি করেছেন, “আমার বাঁধের কাজ ১০০% শেষ, কিন্তু এখন পর্যন্ত ওয়ার্কঅর্ডার পাইনি।” মাঠের বাস্তব চিত্রের সাথে তার এই দাবি কেবল সাংঘর্ষিকই নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির নবনিযুক্ত সদস্য ও সাংবাদিক পাবেল আহমেদ এক বিস্ফোরক অভিযোগে জানিয়েছেন, কমিটির সভায় সদস্যদের কোনো মূল্যায়ন নেই। সভার আগেই তাদের স্বাক্ষর নিয়ে নেওয়া হয়। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেন ২৫ ও ৯৩ নং প্রকল্প থেকে এনসিপি নেতা টিপু সুলতান এবং ৪৫ ও ৯৮ নং প্রকল্পসহ একাধিক স্কিম থেকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোঃ রাশেদুল ইসলাম ৩ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এসব দুর্নীতির বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-কে জানানো হলেও তিনি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী শাল্লা উপজেলায় এখন পর্যন্ত ৬২টি প্রকল্পের বিপরীতে ৪৩.১৭৭ কিলোমিটার বাঁধের জন্য ১৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে কাজের এই মন্থর গতিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা।
বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও ধীরগতির তীব্র সমালোচনা করে উপজেলা কৃষকদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক একরামুল হোসেন বলেন, ‘হাজারো কৃষকের স্বপ্ন এই হাওর রক্ষা বাঁধ। এই বাঁধ নির্মাণে কোনো ধরণের দুর্নীতি মেনে নেওয়া হবে না। প্রকৃত কৃষক দিয়েই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। আমরা কৃষক দলের পক্ষ থেকে খুব শিগগিরই মাঠ পর্যবেক্ষণ করব। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় আমরা কোনো আপস করব না।’
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি সাইফুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ না হলে বাঁধ টেকসই হবে না। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে পকেট কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুত সংশোধন না হলে কৃষকদের নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’
দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ‘কে টাকা নিল না নিল এটা আমাদের দেখার বিষয় না। আমরা প্রকৃত কৃষক নিয়েই পিআইসি গঠন করছি। যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সভার আগে স্বাক্ষর নেওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, সব সদস্যদের নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাঁধের কাজের মন্থর গতি ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ওবায়দুল হক বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মাঠপর্যায়ে তদারকি করছি। কিছু জায়গায় কাজ শুরু হতে দেরি হয়েছে ঠিকই, তবে আমরা পিআইসিগুলোকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা আমাদের রয়েছে। অনিয়মের যে অভিযোগগুলো উঠছে, সেগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শাল্লার কৃষকদের জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবে বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। বছরের এই একটি ফসলের আয়েই চলে তাদের সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনা। আগাম বন্যার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কৃষকরা জানান, বাঁধের কাজ যেভাবে চলছে তাতে সামান্য পাহাড়ি ঢলেই তলিয়ে যেতে পারে তাদের সারা বছরের ঘামঝরা স্বপ্ন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত বিতর্কিত পিআইসিগুলো পুনর্গঠন করে এবং দুর্নীতির অভিযোগগুলো উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখতে হবে। অন্যথায় অকাল বন্যায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার প্রশাসনকেই নিতে হবে।
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host