ঢাকা ১৮ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:৫৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২০
খলিলুর রহমান
দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি ফুটপাত নাকি ব্যবসাকেন্দ্র। হাঁটার জায়গা জুড়ে পণ্যসামগ্রীর পসরা আর হকারদের দৌরাত্ম। পথচারী, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী অফিস ও আদালতগামীরা ফুটপাট দিয়ে চলাচলের জায়গা না পেয়ে রাস্তায় হাঁটবেন, সেখানেও একই অবস্থা। রাস্তা দখল করে গাড়ি পার্কিং আর ভাসমান এবং ভারবাহী হকারদের পসরা।
এই হলো সিলেট নগরের সিটি কর্পোরেশনের সামনে থেকে পশ্চিম দিকে তালতলা, পূর্ব দিকে ধোপাদিঘীর দক্ষিণপার, উত্তরদিকে চেীহাট্টা-আম্বরখানা পর্যন্ত রাস্তার ফুটপাতের অবস্থা। ছোট ছোট দোকান, ব্যবসাসামগ্রী আর হকারদের ঠেলে গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রতিদিনই হয়রানি পোহাচ্ছেন পথচারীসহ নগরের বাসিন্দারা।
একদিকে ফুটপাত দখল, অন্যদিকে রাস্তায়ও ঠিকভাবে হাঁটার অবস্থা নেই। ফুটপাত থেকে নামতেই রাস্তার পাশজুড়ে সারি সারি সিএনজি অটোরিকশা, কার লাইটেস আর মোটরসাইকেলের ভিড়। তখন আরও বিড়ম্বনা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সিটি কর্পোরেশন অফিস তথা নগরভবনের সামনের ফুটপাতে চশমা ও তালা মেরামতের মালামাল নিয়ে স্থায়ীভাবে বসে থাকেন দোকানী ও ব্যবসায়ীরা। সন্ধ্যা হতেই রাস্তার অর্ধেক জুড়ে দুই সারিতে বসানো হয় তরকারীসহ ফলমুলের এমনকি মাছ ও শুটকির দোকান। জেলাপরিষদ কার্যালয়ের সামনের ফুটপাত স্থায়ীভাবে লিজ নিয়ে গেছেন শীতবস্ত্র ও কাপড় ব্যবসায়ীরা। কিন্তু লিজদাতারা রয়ে গেছেন পর্দার আড়ালে। জালালাবাদ পার্কের সামনের ফুটপাতেও কাপড়, ঘড়ি, চুড়ি, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের স্থায়ী দোকান। রাতের বেলায় এ এলাকায় বসে ভাসমান মাছের দোকান ও সবজির দোকান। জজ আদালত ও ডিসি অফিসের সামনের ফুটপাতে কাপড় ও জুতোর স্থায়ী দোকান। এই ফুটপাতও লিজ দেয়া। উল্টোদিকে হাসান মার্কেটের পশ্চিমে রাস্তার অর্ধেক দৈনিক ভাড়া দেয়া হয় ফল ও ভাসমান জুতো ব্যবসায়ীদের কাছে। মধুবন সুপার মার্কেট থেকে প্রাইমারী স্কুলের সামনের ফুটপাত ফলব্যবসায়ীদের কাছে স্থায়ী লিজ, বাকি জেইলরোড পর্যন্ত অংশ বিভিন্ন মর্কেটের ব্যবসায়ীরা কাচামালের স্থায়ী হকার বসিয়ে ভাড়া গ্রহণ করে থাকেন। কোর্ট পয়েন্ট থেকে সরকারী অগ্রগামী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের সামন হয়ে জিন্দাবাজার পয়েন্ট পর্যন্ত বিভিন্ন জনের ভাড়াটিয়া হকারদের দখলে থাকে। ওই এলাকায় ফুটপাত আছে বলেই দৃশ্যমান হয় না। এক থেকে তিন সারী পর্যন্ত ভাসমান দোকান বসে ওই এলাকার রাস্তার ধারে। জিন্দাবাজার পয়েন্ট থেকে রাস্তার পূর্বধারে সরকারী মহিলা কলেজ হয়ে চৌহাট্টা পয়েন্ট পর্যন্ত ফুটপাত দখলে রয়েছে চাদর ব্যবসায়ী ও প্যান্ট ব্যবসায়ীদের স্থায়ী দখলে। এই ফুটপাত দিয়ে কলেজে ছাত্রীরা চলতে পারে না। পশিচম জিন্দাবাজারের জল্লারপার রোড থেকে শুরু করে মির্জাজাঙ্গাল পর্যন্ত ফুটপাত ও রাস্তায় দিরভর থাকে তরি-তরকারী ও মাছের পসরা।
আম্বরখানার উত্তর ও পূর্বদিকের ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখল করে রেখেছে সবজি ব্যবসায়ীরা। এই দুই রাস্তার ধারে রাতের বেলায়ও পসরা ও পাহারাদার রেখে চলে যান ব্যবসায়ীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভাসমান এক চা দোকানী জানান, যুগযুগ ধরে ফুটপাত ও রাস্তা একাধিক চক্র ভাগ করে হকার বসিয়ে লিজ দিয়ে আসছে। তাদের অংশ আবার বিক্রি হয়ে হাত বদলও হয়ে থাকে। ওই চক্রদের কাছ থেকে লিজ নিলেও দৈনিক হারে তাদের লাইনম্যানকে আবার চাঁদা দিতে হয়। পুলিশও নিয়ে থাকে দৈনিকহারে চাঁদা। দৈনিক চাঁদার বিটও বিক্রি হয়ে হাতবদল হয়ে থাকে। ফুটপাতের লিজ গ্রহীতারা আবার তাদের দখল বিক্রি করতে পারেন। এ অবস্থা প্রায় তিনদশক ধরে চলে আসছে বলে জানান তিনি। এভাবে লীজ ছাড়াও দৈনিক দু’দফায় লাখ লাখ টাকার চাঁদা আদায় করা হয় ফুটপাত ও রাস্তা থেকে। অবৈধ ফুটপাত ব্যবসায়ীরা যখন যে সরকার আসে সে সরকারের দলের নামে সমিতি করে ফুটপাত ভোগ করে থাকে।
ফুপাত ও হকার ব্যবসার পাশাপাশি স্ট্যান্ড ব্যবসাও জমজমাট সিলেট নগরীর রাস্তা জুড়ে। নগরীর চৌহাট্টায় মালিক শ্রমিক নামে কার-লাইটেসের স্ট্যান্ড বসিয়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক চাঁদা আদায় করা হয়। অথচ চাঁদা আদায়কারী কেউই কার লাইটেসের মালিক ও শ্রমিক নয়। অঘোষিত লিজ নিয়ে যুগযুগ ধরে স্ট্যান্ড ব্যবসা চলছে চৌহাট্টা থেকে রিকাবীবাজার ও দরগাহ গেইট পর্যন্ত। নগরীর প্রাণকেন্দ্র কোর্ট পয়েন্ট, সুরমা পয়েন্ট, জেইল রোড, ধোপাদিঘিরপার, আম্বরখানা, শাহী ঈদগাহ, মেডিকেল রোড, সুবিদবাজার, পাঠানটুলা, মদিনা মর্কেট, দক্ষিণ সুরমার কদমতলী চাঁনীঘাট, কীনব্রিজ মোড়, বাবনা পয়েন্ট-সহ বিভিন্ন সামনে স্থায়ীভাবে শতাধিক সিএনজি অটোরিক্সা ও কার-মাইক্রো স্ট্যান্ড বসিয়ে চাঁদা আদায় করে থাকে চাঁদাবাজরা। পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক নামে স্ট্যান্ড বসালেও চাঁদা আদায়কারীরা পরিবহণের সাথে আদৌ যুক্ত নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্ট্যান্ড ব্যবসায়ী জানান, প্রায় আড়াই দশক ধরে স্ট্যান্ড লিজ চলছে। হাতবদলও হয়ে থাকে টাকার বিনিময়ে। পরিবহণ শ্রমিকরা শুধু চাঁদা দিয়ে গাড়ি পার্কিং করে থাকে। তারা আদৌ স্ট্যা›ড লিজ গ্রহীতা কিংবা চাঁদা গ্রহীতা নয়। নগরবাসীর টাকায় ফুটপাত নির্মিত হলেও নগরবাসীর একই প্রশ্ন ‘ফুটপাত তুমি কার ? আর এ প্রশ্নই রয়ে গেছে যুগযুগ ধরে।
সিলেট সিটি কর্পেরেশনের বর্তমান মেয়র হাকার উচ্ছেদে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও স্বার্থান্বেসী মহল, সরকারী আমলা, চাঁদাবাজ ও একশ্রেণির নামধারী সাংবাদিকদের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। আর স্ট্যান্ড উচেছদের ব্যপারে তিনি এখনো নিবর রয়েছেন। ক্রমান্বয়ে স্ট্যান্ড উচ্ছেদেও অভিযান শুরু করবেন বলে জানান তিনি। তাই ফুটপাত উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন নগর গড়তে সকল মহলের সহযেগিতা কামনাকরেন তিনি ।
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host