ত্রিনিদাদে বাঙালিদের অভিবাসন ও টিকে থাকার গল্প

প্রকাশিত: ১০:৪২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৭, ২০২৬

ত্রিনিদাদে বাঙালিদের অভিবাসন ও টিকে থাকার গল্প

মো. জাহেদী ক্যারল, সাউথ আমেরিকা থেকে
পৃথিবীর যেখানেই গেছিÑছুটির ভ্রমণ হোক কিংবা অজানা কোনো শহরের পথে হাঁটা একটি বিষয় বারবার আমাকে বিস্মিত করেছে: বাঙালিদের উপস্থিতি। মনে হয়, পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে কোনো না কোনোভাবে বাঙালির পদচিহ্ন পড়েনি।
কেউ গেছেন উন্নত জীবনের আশায়, ভালো আয়ের খোঁজে। কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন দূর দেশে। তবে এই অভিবাসনের গল্পের আরেকটি অন্ধকার দিকও আছে যেখানে মানুষ প্রতারণার শিকার হয়ে পৌঁছে যায় এমন এক গন্তব্যে, যা কখনোই তাদের পরিকল্পনায় ছিল না।
অভিবাসীর জীবন যেন এক ঘূর্ণায়মান চক্র। জন্মভূমি ছেড়ে মানুষ ছুটে চলে এক দেশ থেকে আরেক দেশে কখনো স্বপ্নের খোঁজে, কখনো নিছক বেঁচে থাকার তাগিদে।
গত ৩ এপ্রিল, শুক্রবার। পোর্ট অব স্পেনের একটি মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলাম। নামাজ শেষে হঠাৎ করেই কানে এলো বাংলা ভাষা। অচেনা দেশে পরিচিত সেই শব্দ যেন মুহূর্তেই এক অদ্ভুত টান তৈরি করল।
মসজিদের কার্পেটে বসে থাকা দুইজন ব্যক্তির কাছে এগিয়ে গিয়ে সালাম জানালাম। তারা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাকে তো এখানে আগে দেখিনি!” কৌতূহল মিশ্রিত সেই প্রশ্নে তৈরি হলো এক আত্মীয়তার সূচনা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আমাদের দলের সঙ্গে পরিচিত হলেন। অচেনা পরিবেশে ভাষার এই মিল যেন মুহূর্তেই দূরত্ব কমিয়ে দিল।
সেখানেই পরিচয় হলো সুহেলের সঙ্গে।
নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা সুহেল প্রায় ১২ বছর আগে উন্নত জীবনের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এক দালালের হাতে বিপুল অর্থ তুলে দেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসÑতিনি পৌঁছে যান ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে।
অপরিচিত পরিবেশ, অজানা মানুষ শুরুর দিনগুলো ছিল তার জন্য অত্যন্ত কঠিন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি বৈধভাবে সেখানে বসবাস করছেন এবং নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছেন।
সুহেল জানান, ত্রিনিদাদে বর্তমানে প্রায় ৪০-৫০ জন বাংলাদেশি বসবাস করছেন। কেউ চাকরি করছেন, কেউ ব্যবসা করছেন। ছোট একটি কমিউনিটি হলেও তাদের সংগ্রাম ও টিকে থাকার গল্প গভীরভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় সুহেল এখন আর যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান না। যে দেশে তিনি ভুলবশত এসে পড়েছিলেন, সেই দেশেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের স্বস্তি ও স্থিতি।
এই গল্প শুধু একজন সুহেলের নয়। এটি হাজারো বাংলাদেশি অভিবাসীর গল্প যারা স্বপ্নের খোঁজে ঘর ছাড়েন, প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন, এবং অনেক সময় অপ্রত্যাশিত বাস্তবতাকে গ্রহণ করে নতুন করে জীবন গড়ে তোলেন।
তবে এই যাত্রার একটি নির্মম দিকও রয়েছে। সবাই সুহেলের মতো ভাগ্যবান নন। অনেকেই এই বিপজ্জনক পথে প্রাণ হারান সাগরে, মরুভূমিতে কিংবা সীমান্তের অমানবিক পরিস্থিতিতে।
এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি জরুরি প্রশ্ন তুলে ধরে কবে বন্ধ হবে এই প্রতারণার চক্র?
সময়ের দাবি একটাই মানবপাচার ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। কারণ প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া জীবন, প্রতিটি অপূর্ণ স্বপ্ন আমাদের সমাজেরই এক গভীর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

সর্বশেষ ২৪ খবর