গায়নার প্রেসিডেন্ট ড. ইরফান আলী-এর সঙ্গে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের মতবিনিময় : দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক ইস্যুতে গুরুত্ব

প্রকাশিত: ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০২৬

গায়নার প্রেসিডেন্ট ড. ইরফান আলী-এর সঙ্গে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের মতবিনিময় : দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক ইস্যুতে গুরুত্ব

সাউথ আমেরিকার গায়ানার সমবায় প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ড. ইরফান আলী-এর সঙ্গে যুক্তরাজ্যভিত্তিক এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের এক মতবিনিময় সভা বুধবার (৮ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রেসিডেন্ট ভবনে। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়।

এ সময় গায়ানার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সিনিয়র পরিচালক র্সিয়া নাদির শর্মা আগত প্রতিনিধিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং গায়ানার উন্নয়ন অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কমিউনিটি পর্যায়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে মতবিনিময় করেন। ক্যারাবিয়ান ফ্রেশ নারিকেলের পানি (ককোন্ট ওয়াটার) আপ্যায়িত করা হয়।

প্রেসিডেন্ট দেশের উন্নয়ন, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে গায়ানা এমন একটি দেশ, যা উৎপাদনের চেয়ে বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং কার্বন ক্রেডিট থেকেও আয় করে।

আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি পরিচয় করিয়ে দেন তার প্রায়মিনিস্টার Terrance Drew-এর, যা ছিল এক আনন্দদায়ক চমক।

লন্ডন থেকে আগত প্রতিনিধিদলে শিক্ষা, সাংবাদিকতা, আইন, কমিউনিটি নেতৃত্ব ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। তারা গায়ানার উন্নয়ন, বৈশ্বিক ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে মতামত বিনিময় করেন।

প্রেসিডেন্ট ড. ইরফান আলী ২ আগস্ট ২০২০ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ২০২৫ সালে পুনর্নির্বাচিত হন। তিনি People’s Progressive Party/Civic (PPP/C)-এর সদস্য। তার নেতৃত্বে Guyana তেল উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে।

১৯৮০ সালের ২৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণকারী ড. আলী একজন মুসলিম এবং ইন্দো-গায়ানিজ বংশোদ্ভূত। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন এবং বর্তমানে দেশের নবম নির্বাহী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি University of the West Indies থেকে আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

তার সরকারের প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিদিন ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন, আঞ্চলিক বিমান ভাড়া কমানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং Essequibo Region সংক্রান্ত বিরোধে গায়ানার সার্বভৌমত্ব রক্ষা।

বৈঠকে এসব উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

মত বিনিময়ে মুসলিম কমিউনিটি এসোসিয়েশনে নির্বাহী পরিচালক, ইস্ট লন্ডন মসজিদের সাবেক ডিরেক্টর ও ইসলামিক ফোরাম ইউরোপের সাবেক প্রেসিডেন্ট দিলোয়ার হোসেন খান এর নেতৃত্বে লন্ডন থেকে আগত প্রতিনিধিদলে ছিলেন—লন্ডন ইস্ট একাডেমির সাবেক প্রিন্সিপাল, মুসলিম কমিউনিটি এসোসিয়েশনের বার বার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, লেখক ও গবেষক ড. মুসলেহ ফারাদী, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ইস্ট এন্ড চ্যারিটি সংস্থার প্রেসিডেন্ট সাংবাদিক নবাব উদ্দিন; যুক্তরাজ্যের সর্ববৃহৎ যুব সংগঠন ইয়াং মুসলিম অর্গানাইজেশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং ইস্ট লন্ডন মসজিদের সাবেক প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান; ব্রিটেনের উচ্চ আদালতের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার, লেখক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার নাজির আহমেদ; হেইবারিং কলেজের লেকচারার ও রেডব্রিজ কাউন্সিলের কাউন্সিলর ড. জামাল উদ্দিন; ব্রিট কলেজের চিফ এক্সিকিউটিভ ও ইস্ট লন্ডন মসজিদের সাবেক ট্রেজারার মুসাদ্দিক আহমেদ; লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য ও ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ বাব-উল-হক; ইস্ট লন্ডন মসজিদের হেড অব অ্যাসেট অ্যান্ড অপারেশন আসাদুজ্জ মোহাম্মদ জামান; ডাগেনহাম কমিউনিটি ফোরাম এর চেয়ারম্যান,কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব সুহেল সিরাজী; এবং লেখক ও কলামিস্ট, এলবি ২৪–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউরো বাংলা’র প্রধান সম্পাদক ও লন্ডন এডুকেশন ট্রাস্টের প্রেসিডেন্ট সাংবাদিক মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল।

এসময় আরো উপস্থিত স্থানীয় প্রতিনিধি শেখ ওয়াজির বক্স ও মুনতাজ আলী।

বৈঠকে উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি বৈশ্বিক বিষয়াবলিও গুরুত্ব পায়। প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক ঐক্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতি, জ্বালানি খাতের দায়িত্বশীল উন্নয়ন, বহুপাক্ষিক কূটনীতি, আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থান এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্লোবাল ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

এ সময় United Nations ও Commonwealth of Nations-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ক্ষুদ্র উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে গায়ানার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়।

বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দক্ষ মানবসম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি দেশ তখনই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে, যখন তার শ্রমশক্তি আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ হয়ে ওঠে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক দেশ এখনও চাকরির খাতে বিদ্যমান দক্ষতার ঘাটতি পূরণ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্পক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে একটি বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তবমুখী দক্ষতা, যেমন প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং যোগাযোগ দক্ষতা পর্যাপ্তভাবে অর্জন করতে পারে না। ফলে তারা চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।

দ্বিতীয়ত, দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন—যেমন অটোমেশন, ডিজিটালাইজেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার—নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি করছে। কিন্তু অনেক দেশেই এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি যথেষ্ট দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে না।

এই পরিস্থিতিতে দক্ষতার ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেমন—কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয় বৃদ্ধি, এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা। পাশাপাশি, সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে যাতে নতুন প্রজন্মকে সময়োপযোগী দক্ষতায় দক্ষ করে তোলা যায়।

অন্যদিকে, শিল্পক্ষেত্রের অংশীদার হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমরা চাইলে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। এতে শুধু শিল্পের উন্নয়নই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হবে।

সর্বোপরি, বলা যায় যে দক্ষতার ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এটি মোকাবিলা করা সম্ভব।

বৈঠকটি গায়ানার ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আমরা প্রেসিডেন্ট Irfaan Ali-এর সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করি। আমাদের সঙ্গে ছিলেন মুনতাজ আলী ও ওয়াজির বক্স। আমাদের অভ্যর্থনা জানান মার্সিয়া নাদির শর্মা, যিনি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের পরিচালক।

প্রেসিডেন্ট আমাদের সঙ্গে দেশের উন্নয়ন, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে গায়ানা এমন একটি দেশ, যা উৎপাদনের চেয়ে বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং কার্বন ক্রেডিট থেকেও আয় করে।

আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন Terrance Drew-এর, যা ছিল এক আনন্দদায়ক চমক।

গায়ানার ইতিহাস জানাও এই ভ্রমণকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ইউরোপীয়দের আগমনের আগে এখানে আরাওয়াক ও ক্যারিব আদিবাসীরা বসবাস করত। পরে ডাচ ও ব্রিটিশরা শাসন করে। দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর ভারত, পর্তুগাল ও চীন থেকে শ্রমিক আনা হয়, যা আজকের বহুজাতিক গায়ানিজ সমাজ গড়ে তোলে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর