ফুটপাত ভাড়া দিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে অসাধু চক্র
সিলেট নগরের স্টেশন রোড ও বঙ্গবীর রোড প্রভাবশালীদের দখলে

প্রকাশিত: ১০:২৯ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২৬

<span style='color:#077D05;font-size:19px;'>ফুটপাত ভাড়া দিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে অসাধু চক্র</span> <br/> সিলেট নগরের স্টেশন রোড ও বঙ্গবীর রোড প্রভাবশালীদের দখলে

ইসমাঈল আলী টিপু
ফুটপাতের পাশাপাশি খোদ রাজপথ অবৈধ দখলের কারণে দুর্ভোগকবলিত সিলেট নগরবাসীর সমস্যা অনেক পুরোনো। বিগত সময়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়ররা রাজপথ ও ফুটপাত হকার এবং দখলমুক্ত করার অভিপ্রায়ে নানামূখী প্রয়াস চালিয়েছিলেন। কার্যতঃ তারা কিছুটা সফল হলেও তা ছিল স্বল্পস্থায়ী। ফলে নাগরিকদের নিরাপত্তাহীন অবস্থায় নগরির রাজপথে চলাচলের বঞ্চনার শেষ হয়নি।

বর্তমান সিটি প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যে কোনভাবে হউক না কেন, তিনি সিলেট নগরির ফুটপাত-রাজপথ দখল ও হকারমুক্ত করবেন। সেভাবে তিনি উদ্যোগও গ্রহণ করেন। তাঁর উদ্যোগে সিলেটবাসী বেশ আশাবাদীও হয়েছিল। কিন্তু তাঁর উদ্যোগটি সত্যিকার অর্থেই প্রশংসনীয় হলেও বেপরোয়া হকার, ভাসমান ব্যবসায়ী এবং পরিবহণ শ্রমিকদের গোয়ার্তুমী এবং অসহযোগিতার কারণে কার্যত নগরবাসী তা থেকে সুফল পাচ্ছে না। যা গত ঈদ-উল আযহার সময় দেখা গেছে।

সাবেক মেয়ররা এর পাশাপাশি স্থায়ী ব্যবসায়ী বা দোকানদের ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধেও অভিযান চালিয়েছিলেন। যে কারণে কিছুদিন দোকানের সামনের ফুটপাত দখল করে পসরা সাজাতে স্থায়ী দোকানদাররা বিরত ছিলেন। কিন্তু নিয়মিত তদারকির অভাব আর পোশাকী ও পেশাদার চাঁদাবাজদের অব্যাহত চাঁদাবাজির কারণে এ অবস্থাও বেশীদিন থাকেনি।

সাবেক মেয়র ও বর্তমান সিটি প্রশাসক শত চেষ্টা করেও যেটা পারেননি, তা হলো অবৈধ স্ট্যান্ড। এই অবৈধ স্ট্যান্ড-এর যন্ত্রণায় নগরবাসী ক্ষুব্দ ও হতাশ। যেখানে-সেখানে পরিবহন শ্রমিকরা যানবাহন রেখে যাত্রী উঠা-নামা করতে থাকেন। এরফলে নগরে সৃষ্টি হয় অনাকাঙ্খিত যানজট। নগরবাসীর প্রত্যাশা, সরকারের উচ্চমহলের খুব কাছের মানুষ, অত্যন্ত প্রভাবশালী বর্তমান সিটি প্রশাসক বলিষ্ট পদক্ষেপ নিলে হয়তো তারও একটা সুরাহা হতে পারে।

এদিকে, সুরমা নদীর ‘এপাড়-ওপাড় দুপাড়’ মিলে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) গঠিত হলেও নদীর উত্তরপাড়কে সময়ে সময়ে হকারমুক্ত রাখতে অভিযান পরিচালিত হয়ে থাকে। কিন্তু দক্ষিণ পাড়ে সেভাবে তেমন কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়না। ফলে নগরির সুরমা নদীর দক্ষিণ পাড়ের ৯টি ওয়ার্ড তথা দক্ষিণ সুরমা এলাকার ব্যস্ততম সড়কগুলো ভাসমান ব্যবসায়ী বা হকারদের দখলে চলে যায়। একই সাথে বিভিন্ন মার্কেট ও স্থায়ী দোকানের ব্যবসায়ীরা ফুটপাত দখল করে পসরা সাজিয়ে জনগণের নিরাপদ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। সেদিকে তেমন নজরদারী আছে বলে সিসিকের কার্যক্রমে পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

এর পাশাপাশি এসএমপি’র দক্ষিণ সুরমা থানার অন্তর্গত বাস টার্মিনাল পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরাও এ ব্যাপারে নিরব। মাঝে-মধ্যে লোকদেখানো অভিযান চালালেও কিছুক্ষণ পর সেই আগের অবস্থায় ফিরে আসে। স্থায়ী কোন সমাধান আর হয় না। এতে করে নগরির দক্ষিণাংশের নাগরিকরা চরম ক্ষুব্দ। নাগরিকদের প্রশ্ন, উত্তর সুরমায় ফুটপাতগুলো মাঝে-মধ্যে দখলমুক্ত করা হলেও দক্ষিণ সুরমার ফুটপাতগুলো কী লিজ দেয়া হয়েছে?

সরেজমিনে নগরির প্রবেশদ্বার বলে পরিচিত ব্যস্ততম স্টেশন রোড ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় আধ কিলোমিটার সড়কটির দু’পাশে সিসিকের উদ্যোগে বক্স-ড্রেন নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। যাতে বর্ষার পানি নিস্কাশনের পাশাপাশি উপর দিয়ে পথচারীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারেন। কিন্তু ড্রেনের উপরের ফুটপাত দখল করে বসে রয়েছেন মার্কেটগুলোর ব্যবসায়ীরা। তারা দোকানের মালামাল ফুটপাতে সাজিয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু কী তাই? অনেকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি(?) মনে করে মার্কেট বা দোকানের সামনের ফুটপাত বা রাজপথ হকারদের কাছে ভাড়া দিয়ে মুফতে কামাই করছেন।

এছাড়া প্রভাবশালী একটি অসাধু চক্র রাজনৈতিক পরিচয়ে ফুটপাত ভাড়া দিয়ে নিয়মিত চাঁদাবাজি করছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ অবগত হলেও অজ্ঞাত কারণে সমস্যার সমাধানে উদাসীন। ফলে জনদুর্ভোগ লাঘবে কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা নিয়ে জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।

এ সুযোগে সড়কের দু’পাশের অর্ধেকেরও বেশী জায়গা দখল করে বসেছেন হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীরা। রাজপথে বসে নির্বিঘ্নে সবজি, মাছ, শুটকি থেকে শুরু করে ফলমূল সব কিছুই বিক্রি করছেন তারা। এতে করে দিনের বেশীরভাগ সময়গুরুত্বপূর্ণ অথচ স্বল্প পরিসরের এই সড়কে যানজট লেগেই থাকে। যানজটের কারণে ৫ মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিতে ২৫ মিনিট, ক্ষেত্রবিশেষে ঘন্টাখানেক সময়ও লেগে যায়।

সম্প্রতি স্টেশন রোডের বাবনা মোড়ে যানজটে আটকেপড়া জনৈক যাত্রী ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘সরকার সড়ক তৈরি করেছে যানবাহন চলাচলের জন্য, কিন্তু তা যদি হকাররা দখল করে রাখে, তবে তো যানজট হবেই।’
সড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া অপর এক পথচারী বলেন, ‘কী করবো ভাই, ফুটপাত ওতো আর আমাদের জন্য না, দেখেন না-দোকানদাররা ফুটপাতে মালামাল রেখে দেদারছে ব্যবসা করছে? অথচ দেখার যেন কেউ নেই?’

ফুটপাত ও রাজপথ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা হকারদের কাছে ভাড়া দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন খোদ স্টেশন রোড ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ফয়ছল আহমদ মাছুম। তিনি বলেন, সবাই নয়, ব্যবসায়ী নামধারী একটি অসাধু চক্র এই অপকর্মের সাথে জড়িত। ‘আমরা বারবার স্থায়ী ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছি, যাতে মানুষের হাঁটাচলার জায়গাটা ছেড়ে দেন, তারা না শুনলে আমাদের তো কিছু করার নেই।’

তিনি বলেন, ‘বিগত সময় আমরা তৎকালীন মেয়রদেরকে অনুরোধ করেছিলাম, নগরির দক্ষিণ সুরমা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সড়কগুলো পরিস্কার করে দিতে। কিন্তু তাতে তারা তেমন কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেননি(!)। বর্তমান সিটি প্রশাসক এ রকম কোন উদ্যোগ নিলে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছি।’

এ বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের জনৈক কর্মকর্তা বলেন, ‘সিসিকের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে। অভিযানের সময় ভাসমান ব্যবসায়ী ও হকাররা তাৎক্ষণিক সটকে পড়ে, পরে আবার দখল করে নেয়। বর্তমানে সিসিকের ম্যাজিস্ট্রেটরা পবিত্র ঈদ-উল আযহার ছুটিতে আছেন। উনারা ফিরে এলে আবারও জোরদার অভিযান চালানো হবে।’

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর