ঢাকা |
প্রকাশিত: 5:56 PM, July 24, 2026
যে হাতে বই থাকার কথা, সেই হাতে আজ বেঁচে থাকার সংগ্রাম “যখন সমাজ তার শিশুদের ভুলে যেতে শুরু করে, তখন ইতিহাসও সেই সমাজকে ক্ষমা করে না।
”দুই দিন ধরে ছেলেটিকে দেখছিলাম। সে প্রতিদিন একই জায়গায় দাঁড়াত। মানুষের ভিড় বাড়ত, কমত; গাড়ির শব্দে শহর কেঁপে উঠত ব্যস্ত মানুষগুলো একে একে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেত। কিন্তু ছেলেটি যেন সেই শহরেরই এক অদৃশ্য নাগরিক যাকে সবাই দেখে, অথচ কেউ দেখে না।
আজ আর নিজেকে থামাতে পারলাম না।
ডেকে বললাম, এই যে বাবা, তোমার নাম কী?
সে একটু ইতস্তত করল। তারপর মৃদু হেসে নাম বলল। সেই হাসি ছিল না কোনো শিশুর স্বাভাবিক হাসি ওটা ছিল অভাবের সঙ্গে আপস করে নিতে শেখা মানুষের হাসি।
আমি তাকিয়ে রইলাম।
একটি শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল নতুন বই, রঙিন খাতা, পেন্সিল আর স্বপ্নে ভরা আগামীকাল। অথচ সেই ছোট্ট হাত আজ আঁকড়ে ধরে আছে বেঁচে থাকার নির্মম সংগ্রাম। যে কাঁধে থাকার কথা ছিল স্কুলব্যাগ, সেই কাঁধে আজ ঝুলছে অনিশ্চয়তার অদৃশ্য বোঝা।
তার চোখে আমি ক্ষুধা দেখিনি।
ক্ষুধা মানুষকে কাঁদায়। কিন্তু তার চোখে যা দেখেছি, তা আরও ভয়ংকর একটি শিশুর ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে নিভে যাওয়ার নীরব দৃশ্য।
আমরা প্রায়ই মনে করি দারিদ্র্য মানেই খালি পেট।
না।
সবচেয়ে নিষ্ঠুর দারিদ্র্য হলো এমন একটি সকাল, যেখানে কোনো শিশুর ঘুম ভাঙে না স্কুলে যাওয়ার আনন্দে, ভাঙে এই চিন্তায় আজ কিছু খেতে পারবে তো?
আমি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে নিজের কাছেই প্রশ্ন করলাম?
আমি জীবনে কত কিছু পেয়েছি!
আর সে?
জীবনের শুরুতেই কত কিছু হারিয়ে ফেলেছে!
এই তো তার বয়স ছিল মাঠভর্তি রোদ মেখে ছুটে বেড়ানোর। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ধুলো উড়িয়ে ফুটবল খেলার। নতুন ক্লাসে উঠে নতুন বই হাতে পাওয়ার পর প্রথম পাতায় নিজের নাম লিখে মুগ্ধ হয়ে কাগজের গন্ধ শুঁকে দেখার। পুরোনো ক্যালেন্ডারের পাতা দিয়ে বইয়ের মলাট বানানোর। স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজার অপেক্ষায় থাকার। পরীক্ষার আগের রাতে ভয় পাওয়ার। শিক্ষকের বকুনি খেয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে নালিশ করার। বাবার কাঁধে চড়ে ঈদের বাজারে যাওয়ার।
শৈশবের তো এমনই হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু এই শিশুটি শিখছে অন্য এক পাঠ।
সে শিখছে কীভাবে ক্ষুধা চেপে রাখতে হয়।
কীভাবে মানুষের অবহেলার সামনে মুখে হাসি রাখতে হয়।
কীভাবে ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয়।
হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল মহানবী (সা:) এর একটি হাদিস।
“সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না।”সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৯২১ (সহিহ)
আমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের প্রতি দয়া করছি?
নাকি শুধু তাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার শিল্পটাই আয়ত্ত করেছি?
কবি মির্জা গালিব এক জায়গায় লিখেছিলেন “এ তো শুধু একটি হৃদয়, পাথর বা ইট নয়; তবে ব্যথায় ভরে উঠবে না কেন?”
সেদিন আমারও ঠিক তেমনই মনে হচ্ছিল।
কারণ আমি কোনো ভিক্ষুক শিশুকে দেখিনি।
আমি দেখেছিলাম একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎকে। একটি অপ্রকাশিত সম্ভাবনাকে।
একটি এমন গল্পকে, যার শেষ অধ্যায় এখনো লেখা হয়নি কিন্তু আমরা সবাই মিলে হয়তো সেই গল্পের কালি শুকিয়ে যেতে দিচ্ছি।
সমাজ কি সত্যিই তার দায় এড়াতে পারে?
ছেলেটির কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পরও তার চোখদুটি আমার পিছু ছাড়েনি।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো সে আমার কাছে কিছুই চায়নি।
না টাকা।
না খাবার।
না কোনো করুণা।
তবুও কেন যেন মনে হচ্ছিল, সে আমাকে একটি প্রশ্ন করে গেছে একটি এমন প্রশ্ন, যার উত্তর শুধু আমার নয়, আমাদের সবার দেওয়ার কথা।
সমাজ কি সত্যিই তার দায় এড়াতে পারে?
এই প্রশ্ন আমি অন্য কাউকে করার আগে নিজের বুকের ভেতর ছুড়ে দিয়েছি।
কারণ আমিও তো এই সমাজেরই একজন।
আমি যদি আজ তার হাতে একটি কলম তুলে দেওয়ার চেষ্টা না করি, তাহলে আগামীকাল তার হাতে অস্ত্র দেখে বিস্মিত হওয়ার নৈতিক অধিকার কি আমার আছে?
আমি যদি আজ তার জন্য একটি বিদ্যালয়ের দরজা খুলে না দিই, তাহলে কাল সে কারাগারের দরজায় দাঁড়ালে শুধু তাকেই দোষ দেব কীভাবে?
আজ যে শিশুটি ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে জীবনকে ভিক্ষা করছে, কাল সেই শিশুই হয়তো কোনো অপরাধচক্রের সহজ শিকার হবে। কেউ তাকে ব্যবহার করবে মাদক বহনে, কেউ চুরিতে, কেউ সহিংসতায়। পেটের ক্ষুধা, অবহেলার ক্ষত আর বেঁচে থাকার তাগিদ এই তিনটি জিনিস মানুষের বিবেককে নয়, তার অসহায়ত্বকে পরিচালিত করে।
আমরা তখন বলব “ছেলেটা নষ্ট হয়ে গেছে।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নষ্ট করেছে কে?
সে?
নাকি আমরা?
পৃথিবীর কোনো নবজাতক শিশুই জন্মের সময় অপরাধী হয়ে আসে না।
ইসলামও মানুষকে এই শিক্ষা দেয় না।
রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন
“প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাত (স্বাভাবিক ও পবিত্র প্রকৃতি)-এর ওপর জন্মগ্রহণ করে। তারপর তার পরিবেশই তাকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়। ”সহিহ আল-বুখারি (১৩৫৮), সহিহ মুসলিম (২৬৫৮)
এই হাদিস শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়; আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং অপরাধতত্ত্বের সঙ্গেও বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একটি শিশু প্রথমে মানুষ হতে শেখে।
তারপর সে শেখে সমাজকে।
সমাজ যদি তাকে ভালোবাসা শেখায়, সে ভালোবাসতে শেখে।
সমাজ যদি তাকে শিক্ষা দেয়, সে স্বপ্ন দেখতে শেখে।
সমাজ যদি তাকে সম্মান দেয়, সে অন্যকে সম্মান করতে শেখে।
কিন্তু সমাজ যদি তাকে শুধু অবহেলা দেয়, ক্ষুধা দেয়, অপমান দেয়, বঞ্চনা দেয় তবে সেই শিশুর ভেতরে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় ক্ষোভ, অবিশ্বাস এবং অন্ধকার।
আমরা প্রায়ই অপরাধের বিচার করি।
কিন্তু অপরাধ জন্ম নেওয়ার আগের ইতিহাসটি পড়ি না।
একটি অপরাধের বিচার আদালত করতে পারে।
কিন্তু একটি অপরাধী তৈরির বিচার ইতিহাস করে।
এই কারণেই উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো অপরাধ দমনে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে না তারা বিনিয়োগ করে শৈশব রক্ষায়।
ফিনল্যান্ডে কোনো শিশু অর্থের অভাবে স্কুল ছাড়ে না।
নরওয়েতে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যকে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা হয়।
জাপানে শিশুদের শুধু পড়াশোনা নয়, নাগরিক দায়িত্ব, শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়।
তারা জানে,
একটি শিশুর হাতে একটি বই তুলে দেওয়া, একটি কারাগার নির্মাণের চেয়ে অনেক কম ব্যয়বহুল।
আর আমরা?
আমরা এখনো শিশুশ্রমকে “অভাবের বাস্তবতা” বলে মেনে নিই।
রাস্তার ধারে ফুল বিক্রি করা শিশুকে দেখে ছবি তুলি, কিন্তু তার স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করার কথা খুব কমই ভাবি।
আমরা ঈদের আগে হাজার হাজার টাকার পোশাক কিনি, অথচ একটি শিশুর স্কুলব্যাগ কিনে দেওয়ার কথা মনে পড়ে না।
আমরা উন্নয়নের গল্প বলি।
কিন্তু সেই উন্নয়নের মানচিত্রে কতজন পথশিশুর নাম লেখা আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে।
আর সেই অস্বস্তিই প্রমাণ করে সমস্যাটা শুধু রাষ্ট্রের নয়।
সমস্যাটা আমাদেরও।
কারণ রাষ্ট্র গড়ে ওঠে আমাদের দিয়েই।
যে সমাজ তার শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ ভবিষ্যৎকে রক্ষা করার অধিকারও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে।
দারিদ্র্য শুধু ক্ষুধার নাম নয়, স্বপ্নহীনতারও নাম।
আমরা দারিদ্র্য বলতে সাধারণত একটি খালি থালা, ছেঁড়া জামা কিংবা ক্ষুধার্ত মুখ কল্পনা করি।
কিন্তু বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর দারিদ্র্য ক্ষুধা নয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর দারিদ্র্য হলো একটি শিশুর স্বপ্ন দেখার অধিকার কেড়ে নেওয়া।
দেখার অধিকার কেড়ে নেওয়া।
যে শিশুটি কখনো স্কুলের ঘণ্টা শোনেনি, নতুন বইয়ের গন্ধ নেয়নি, শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে নিজের নাম ডাকার আনন্দ পায়নি, সে শুধু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় না সে নিজের ভবিষ্যতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগটুকুও হারিয়ে ফেলে।
একটি শিশু যখন বলে “আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব।”
পৃথিবী তখন একটু বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে।
কিন্তু একটি শিশু যখন কোনো স্বপ্নই দেখে না, তখন বুঝতে হবে সমাজ তার কাছ থেকে শুধু একটি পেশা কেড়ে নেয়নি কেড়ে নিয়েছে তার আগামীকাল।
সেদিন ছেলেটির বয়স জিজ্ঞেস করেছিলাম।
মাথা নিচু করে বলল সাত কিংবা আট হবে।
তার উত্তর শুনে আমি আর কোনো প্রশ্ন করতে পারিনি।
সাত-আট বছরের একটি শিশু!
এই বয়সে তো পৃথিবীকে রঙিন মনে হওয়ার কথা।
এই বয়সে আকাশের মেঘে হাতি, ঘোড়া কিংবা নৌকা খুঁজে পাওয়ার কথা।
এই বয়সে পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়ে কাঁদার কথা।
ঈদের নতুন জামা লুকিয়ে রেখে বারবার বের করে দেখার কথা।
মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার কথা।
কিন্তু তার পৃথিবী যেন অনেক আগেই বুড়িয়ে গেছে।
তার চোখে আমি কোনো অভিযোগ দেখিনি।
দেখেছি এক গভীর নীরবতা।
সেই নীরবতা শব্দের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চস্বরে চিৎকার করছিল।
মনে হচ্ছিল, সে যেন বলছে “আমার অপরাধ কী ছিল? আমি কি ভুল পরিবারে জন্ম নিয়েছিলাম? নাকি ভুল সমাজে?”
আমি উত্তর দিতে পারিনি।
কারণ এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একক মানুষের কাছে নেই।
এই উত্তর লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রের নীতিতে, সমাজের বিবেকে, আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্বে এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে।
আজ আমরা যাকে “পথশিশু” বলে পরিচয় দিই, কাল ইতিহাস হয়তো তাকে অন্য নামে ডাকবে।
কেউ হবে হারিয়ে যাওয়া প্রতিভা।
কেউ হবে অপূর্ণ স্বপ্ন।
আবার কেউ হয়তো এমন এক মানুষ, যাকে আমরা নিজেরাই অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছি।
মনে রাখবেন একটি শিশুকে বাঁচিয়ে দেওয়া দান নয় এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রতি বিনিয়োগ।
একটি শিশুকে শিক্ষিত করা অনুগ্রহ নয় এটি সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ।
একটি শিশুর চোখে স্বপ্ন ফিরিয়ে দেওয়া মানবতা নয় শুধু এটি ইতিহাসের কাছে নিজের দায়িত্ব পালন।
ছেলেটির সেই নিষ্পাপ, স্বপ্নভরা চোখে আমি করুণা দেখিনি।
দেখেছি এক নীরব প্রতিবাদ।
যে প্রতিবাদ কোনো মিছিল করে না।
কোনো স্লোগান দেয় না।
কোনো আদালতে মামলা করে না।
তবুও সেই প্রতিবাদ একদিন সময়ের দেয়ালে লেখা থাকবে।
সেদিন হয়তো আদালত নীরব থাকবে।
মানুষও নীরব থাকবে।
কিন্তু প্রকৃতি নীরব থাকবে না।
ইতিহাসও নীরব থাকবে না।
কারণ ইতিহাসের একটি নির্মম অভ্যাস আছে সে সবকিছু মনে রাখে।
শেষ কথা একটি শিশুকে বাঁচানো মানে একটি জাতিকে বাঁচানো
ছেলেটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি অনেক দূর হেঁটেছিলাম।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, আমি নয় আমার বিবেকই যেন আমার পেছনে হাঁটছে।
বারবার মনে হচ্ছিল, এই শিশুটির জীবনের গল্প কি সত্যিই এমন হওয়ার কথা ছিল?
নাকি আমরা সবাই মিলে তার গল্পের প্রথম অধ্যায়টাই নষ্ট করে দিয়েছি?
আজ সে পথে দাঁড়িয়ে আছে।
আগামীকাল হয়তো তাকে আর এই মোড়ে দেখা যাবে না।
কেউ হয়তো বলবে, “ছেলেটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।”
কিন্তু মানুষ কি হঠাৎ হারিয়ে যায়?
না।
মানুষকে হারিয়ে ফেলা হয়।
অবহেলায়।
বৈষম্যে।
অন্যায়ে।
নীরবতায়।
আজ আমরা যে শিশুটিকে দেখে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি, সেই হয়তো আগামী দিনের একজন শিক্ষক হতে পারত। একজন চিকিৎসক, একজন প্রকৌশলী, একজন বিজ্ঞানী, একজন কবি, একজন সৈনিক অথবা শুধু একজন সৎ মানুষ।
আমরা জানি না, কারণ আমরা তাকে সেই সুযোগটাই দিইনি।
সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি যুদ্ধ নয়।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি তখনই ঘটে, যখন একটি সমাজ তার শিশুদের সম্ভাবনা চিনতে ব্যর্থ হয়।
কারণ ভেঙে পড়া একটি সেতু আবার নির্মাণ করা যায়।
ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি ভবনও আবার দাঁড় করানো যায়।
কিন্তু হারিয়ে যাওয়া একটি শৈশব কোনো দিন ফিরিয়ে আনা যায় না।
আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা একদিন থাকবেন না।
আজ যারা সম্পদের মালিক, একদিন তারাও চলে যাবেন।
আজ যারা নীরব, ইতিহাস একদিন তাদেরও প্রশ্ন করবে।
সেদিন প্রশ্নটি খুব সহজ হবে “তোমাদের সময়ে হাজারো শিশু কেন শৈশব হারিয়েছিল?”
সেদিন কোনো অজুহাতই যথেষ্ট হবে না।
আমি এ দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কাছে একটি অনুরোধ রেখে যেতে চাই কোনো শিশুকে করুণা করবেন না।
তার পাশে দাঁড়ান।
তার হাতে ভিক্ষার বাটি নয়, শিক্ষার আলো তুলে দিন।
কারণ দান একজন মানুষের একটি দিনের ক্ষুধা মেটায়।
কিন্তু শিক্ষা একটি প্রজন্মের ভাগ্য বদলে দেয়।
মনে রাখবেন একটি জাতির ভবিষ্যৎ সংসদ ভবনে লেখা হয় না।
শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের নকশাতেও লেখা হয় না।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ লেখা হয় একটি শিশুর হাতে ধরা প্রথম বইয়ের পাতায়।
আর যে সমাজ সেই বইটি তার শিশুর হাতে তুলে দিতে ব্যর্থ হয়, সেই সমাজ ধীরে ধীরে নিজের ভবিষ্যতের দরজাই বন্ধ করে দেয়।
আমি আজও সেই সাত-আট বছরের শিশুটির চোখ দুটো ভুলতে পারিনি।
সেখানে ক্ষুধার চেয়ে বড় ছিল অপেক্ষা।
অভাবের চেয়ে বড় ছিল নীরবতা।
আর সেই নীরবতার ভেতরে আমি যেন শুনতে পেয়েছিলাম একটি জাতির ভবিষ্যতের কান্না।
শেষ করার আগে শুধু একটি কথাই বলতে চাই একদিন এই পৃথিবীতে আমাদের কেউ থাকবে না। থাকবে আমাদের কর্ম, আমাদের সিদ্ধান্ত, আর আমাদের নীরবতার ইতিহাস।
সেদিন যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের দিকে আঙুল তুলে বলতে না পারে “তোমরা উন্নয়নের গল্প লিখেছিলে, কিন্তু শিশুদের গল্প লিখতে ভুলে গিয়েছিলে।”
এ জাতির বিবেকবান মানুষদের প্রতি আমার বিনীত নিবেদন আজই একটি শিশুর পাশে দাঁড়ান।
কারণ আগামী দিনের সবচেয়ে ভয়ংকর সংকট অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয় সবচেয়ে ভয়ংকর সংকট হবে সেই সমাজ, যে নিজের শিশুদের হারিয়ে ফেলেছে।
যে জাতি তার শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে জাতি তার ভবিষ্যৎও রক্ষা করতে পারে না।
আর যে পাপের বোঝা আমরা আজ উদাসীনতার নামে জমিয়ে চলেছি, তার ভার বহন করতে হবে আগামী প্রজন্মকে।
সেদিন হয়তো তারা আমাদের ক্ষমা করবে না। –
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host