সংকটে দেশ, উত্তরণে সদিচ্ছা আছে কি? আবু তালহা

প্রকাশিত: 11:15 PM, October 6, 2026

সংকটে দেশ, উত্তরণে সদিচ্ছা আছে কি? আবু তালহা

ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল স্পষ্ট দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট কাটিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করবে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় আট মাস পরও আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, নিখোঁজের ঘটনা ও চাঁদাবাজি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এখনো কাটেনি।তাই প্রশ্ন এখন শুধু সরকারের সক্ষমতা নিয়ে নয়, প্রশ্ন হচ্ছে সংকট উত্তরণে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা আছে? সরকার কি সত্যিই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটছে?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অন্যতম উদ্বেগজনক উদাহরণ মেরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। এপ্রিল থেকে তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কোস্টগার্ড সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। কোস্টগার্ড অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং হাইকোর্ট তাঁকে খুঁজে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।একজন নাগরিক দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়, এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। রাষ্ট্র যদি একজন নিখোঁজ নাগরিকের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কতটা নিশ্চিন্ত থাকবে?
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্চের শেষ দিকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট শেয়ারের অভিযোগে আজিজুল হককে গ্রেপ্তারের খবর আসে। এপ্রিল মাসে ঢাকায় এ. এম. হাসান নাসিম, ভোলায় সাওদা সুমিসহ আরও কয়েকজনকে সরকারবিরোধী মন্তব্যের অভিযোগে গ্রেপ্তারের কথা মানবাধিকার সংগঠন Human Rights Watch-এর প্রতিবেদনে উঠে আসে। শ্রীনগরে শাওন মাহমুদও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মন্তব্যের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সমালোচনা করার অভিযোগে গাজীপুরের সিফাত আব্দুল্লাহকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর খবরও এসেছে। আগস্টে সাবেক এনসিপি নেতা সালাউদ্দিন তানভীরকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুক পোস্টের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। সেপ্টেম্বরে সিলেটের মেহেদী আহমেদ, গাইবান্ধার হুমায়ুন কবির ডিউক এবং মেহেরপুরের সঞ্জয়কে একই ধরনের অভিযোগে গ্রেপ্তারের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
অবশ্য এসব ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অপরাধ করেছেন কি না তা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো সরকারের সমালোচনা রাজনৈতিক মতামত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগের সীমারেখা কোথায়? গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের শক্তি অনেকাংশেই নির্ভর করে ভিন্নমত কতটা নিরাপদে প্রকাশ করা যায় তার ওপর।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনামূলক একটি ভিডিওতে লাইক দেওয়ার অভিযোগে শিক্ষক মো. মামুন-অর-রশিদ তালুকদারকে সাময়িক বরখাস্ত করার খবর প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের প্রাগপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে শ্রেণিকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলা উচ্চারণ নিয়ে মন্তব্যের অভিযোগে পুলিশ আটক করেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। প্রশ্নটি মৌলিক একজন নাগরিকের রাজনৈতিক মতামত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক কিংবা কোনো মন্তব্য যদি চাকরি হারানো বা গ্রেপ্তারের কারণ হয়, তাহলে আমরা কোন ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি? আইনের প্রয়োগ অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু সেই প্রয়োগ যেন রাজনৈতিক মত দমন বা ভিন্নমতকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার না হয়, সেটিই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বড় পরীক্ষা।
বর্তমান বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বেশ উদ্বেগ তৈরী হয়েছে । রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা MCH-FP স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এক রাতের মধ্যে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর দখলের অভিযোগ উঠেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনাও আইনশৃংখলার অবনতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।বাংলাদেশের বিমানবন্দরে লাগেজ ট্রলি সংকট ও হয়রানি, অব্যাবস্থাপনা দীর্ঘদিনের,এসব অব্যাবস্থাপনা নিয়ে প্রতিবাদ করায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তার এবং তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনাও আলোচিত হয়েছে। তাঁকে হেলমেট পরিয়ে আদালতে হাজির করার ঘটনাও ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা আদালত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই কি একজন নাগরিককে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে?
শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব ও সহিংসতার ঘটনা খুবই অশনী সংকেত আমাদের জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের উপর হামলার অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে উঠেছিল। কয়েক মাস পরও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এরই মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের হামলায় সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর এসেছে।বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত মুক্ত চিন্তা, জ্ঞানচর্চা ও মতপ্রকাশের নিরাপদ জায়গা। কোনো রাজনৈতিক দলের শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ অপরাধ করলে তার রাজনৈতিক পরিচয় যেন তাকে আইনের বাইরে থাকার সুযোগ না দেয় এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক পরীক্ষা।
এদিকে দেশে চাঁদাবাজি সন্ত্রাস এক মহামারীর আকার ধারণ করেছে, ডিএমপির মার্চের তালিকায় রাজধানীতে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত প্রায় ১,২৮০ জন এবং আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে ৩১৪ জনের নাম থাকার কথা প্রকাশিত হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রকাশিত পুলিশ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে রাজনৈতিক পরিচয় থাকা চাঁদাবাজদের বড় একটি অংশ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম আলোর ডিএমপি-তালিকা ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানেও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বর্তমান ও সাবেক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠে এসেছে। ৫ অক্টোবর বিএনপির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের এক নেতাকে ঢাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক করার খবরও এসেছে।
প্রশ্নটি তাই সরল সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি শুধু চাঁদাবাজের রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়, কিন্তু চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বন্ধ না হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনটি আসলে কোথায়?বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংঘাত, দখল, চাঁদাবাজি, বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাবের সংস্কৃতি দেখে আসছে। একটি সরকার পরিবর্তনের পর প্রত্যাশা ছিল, সেই পুরোনো সংস্কৃতির অবসান হবে।মানুষ এক দলের পরিবর্তে আরেক দলের দখলদারিত্ব চায় না। এক পক্ষের চাঁদাবাজের জায়গায় অন্য পক্ষের চাঁদাবাজও চায় না। রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী আইন প্রয়োগও চায় না। মানুষ চায় নিরাপদ রাষ্ট্র, স্বাধীন মতপ্রকাশ, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ন্যায়বিচার।
বিএনপি সরকারের সামনে এখনও সময় আছে। একটি সরকারের সাফল্য শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে বিচার হয় না। শেষ পর্যন্ত মানুষ জানতে চায় সে নিরাপদ কি না, তার কথা বলার অধিকার আছে কি না, তার ব্যবসা চাঁদাবাজদের হাত থেকে নিরাপদ কি না এবং রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই সে ন্যায়বিচার পাবে কি না।মেরাজ শেখের মতো নিখোঁজ মানুষের সন্ধান নিশ্চিত করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া এবং চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের দল-মত নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা এসবই হবে সরকারের সদিচ্ছার বাস্তব পরীক্ষা।রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে পারে, তাহলেই জনগণের আস্থা ফিরবে। কারণ মানুষ আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, তারা ফলাফল দেখতে চায়।

লেখক: কলাম লেখক ও মানবাধিকার কর্মী সেক্রেটারী – জাস্টিস ফর জুলাই ইউকে।

তথ্য সুত্র :
https://share.google/fuNL9YiEHk256sGLL
https://share.google/WKSmJpwICfpcWqbsy
https://share.google/wdach0XHJbdElpjNA
https://share.google/MHEUTr6QFn8YWySVZ
https://share.google/1araAX4zJMVFnq026
https://share.google/VwzKUkrAXlGyaJ4d2
https://share.google/dHTsxWFPZgebNYl3X
https://amp.dw.com/bn/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%B0-%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%8F%E0%A6%A4-%E0%A6%95%E0%A6%A0%E0%A7%8B%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A8/a-79373290

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর