দুই বছরেও চাকরি ফিরে পাননি মবের শিকার ব্লু বার্ড স্কুলের সেই শিক্ষক

প্রকাশিত: 11:37 PM, October 6, 2026

দুই বছরেও চাকরি ফিরে পাননি মবের শিকার ব্লু বার্ড স্কুলের সেই শিক্ষক

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

২০২৪ সালের পাটপরিবর্তনের পর সিলেটের ব্লু বার্ড স্কুল এন্ড কলেজের ইতিহাসে ঘটে এক লজ্জ্বাজনক ঘটনা। ওই বছরের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। আর ২৫ আগস্ট নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের হাতে লাঞ্চিত হন ব্লু-বার্ড স্কুলের গণিতের শিক্ষক দীপককান্তি চৌধুরী। ওইদিন পদত্যাগও করেন তিনি।

ওই সময়ে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শিক্ষকদের পুণরায় কর্মস্থলে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। লাঞ্চিত হওয়া এসব শিক্ষকদের বেতন-ভাতাও অব্যাহত রাখা হয়েছে।

তবে মবের হামলার শিকার হওয়ার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখন চাকরি ফিরে পাননি ব্লু বার্ড স্কুলের শিক্ষক দীপককান্তি চৌধুরী। তার বেতন-ভাতাও বন্ধ রয়েছে। আদালতের দ্বারাস্থ হয়ে চাকরি ফিরে পাচ্ছেন না দীপক।

জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে ব্লু-বার্ড স্কলে প্রাঙ্গণে জড়ো হন প্রাক্তন ও বর্তমান কিছু শিক্ষার্থী। তারা দীপক চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, অসাদাচরণসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে তার পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন।

বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে একপর্যায়ে পদত্যাগ করেন দীপক চৌধুরী। তবে এই শিক্ষকের দাবি, তাকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে সাক্ষর করানা হয়।

পদত্যাগের পর ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের হাতে হেনস্তার শিকার হন দীপককান্তি চৌধুরী। সেই সময়ে ওই ঘটনার ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দীপক চৌধুরী ব্লু-বার্ড স্কুলের ভেতরের ফটক থেকে বের হওয়া সময় একদল শিক্ষার্থী তাকে তাড়া করে। এসময় তিনি দৌড়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে ঘিরে ধরে শারিরীকভাবে হেনস্তা করা হয়, মারধর করা হয়। এমনকি রাস্তায় যাওয়ার পরও তাকে শারিরীকভাবে আঘাত করা হয়।

তবে ওই সময়ও হেনস্তার হাত থেকে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন কয়েকজন। তারা দীপককান্তি চৌধুরীকে একটি রিকশায় তুলে দিয়ে আক্রমণকারীদের হাত থেকে রক্ষা করেন।

গণিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা দীপক চৌধুরী ২০০৭ সালে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজে। ২০২০ সালে তিনি এমপিওভুক্ত হন। এরআগে ১৯৯০ সাল থেকে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত। নিজের শিক্ষার্থীদের কাছেই হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে ৫৩ বছর বয়সী এই শিক্ষককে। সেদিনের সেই ঘটনা আজও তাড়িয়ে বেরায় প্রবীণ এই শিক্ষককে।

এরপর কর্মস্থলে ফেরার জন্য বারবার আবেদন জানিয়েও সফল হননি বলে জানান দীপক চৌধুরী।

তিনি বলেন, ব্লু-বার্ড স্কুলে ফেরার জন্য আমি প্রতিষ্ঠানটির গভর্ণিং বডির কাছে বারবার আবদন করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন সদুত্তর পাইনি। তারা বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছেন।

দীপক চৌধুরী সিলেটটুডেকে বলেন, সবশেষ আমি চাকরি ফিরে পেতে আদালতের দ্বারস্থ হই। গত মাসে উচ্চ আদালত থেকে একমাসের মধ্যে বিষয়টির সুরাহা করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও কোন সরাহা হয়নি।

এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন মঙ্গলবার সিলেটটুডেকে বলেন, তার (দীপক চৌধুরীর) বিষয়টা একটু জটিল। উনি স্বেচ্ছায় পদত্যগে করেছিলেন। পদত্যাগপত্রের এমনটি লেখা আছে। কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে তো ইচ্ছে করলেই তাকে ফেরানো যায় না।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, সম্প্রতি আদালত একটা আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু তাতে কোন ম্পষ্ট নির্দেশনা নেই। উনার বিষয়ে আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে ভালা হতো। আমরা এবিষয়টি আদলতকে জানাবো।

তবে দীপক কান্তি চৌধুরীর দাবি, স্বেচ্ছায় নয়, বরং জোর করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

ওইদিন আমার কলমে ধরে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে, বলেন তিনি।

তাকে হেনস্তা ও কর্মস্থলে ফিরতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির পেছনে ব্লু বার্ড স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষকদের কারো কারো ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ দীপক চৌধুরীর।

তবে মবের শিকার হয়ে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শিক্ষকদের পুনর্বহালের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সিলেট অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. দিদার চৌধুরী।

তিনি বলেন, যেসব শিক্ষক মবের শিকার হয়ে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি এসব বিষয় দেখছে।

দিদার চৌধুরী আরও বলেন, কিছু শিক্ষক কর্মস্থলের বাইরে থাকলেও সরকারি বেতনের অংশ পাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ তা পাচ্ছেন না। বিষয়গুলো শিক্ষা প্রশাসনের নজরে রয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর