ঢাকা ১০ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:১০ অপরাহ্ণ, মার্চ ৯, ২০২৬
হারুন রশিদ
সাম্য, সহমর্মিতা ও মানবিকতার অনন্য শিক্ষা বহন করে ঈদ, ধনী-দরিদ্র বৈষম্য দূর করেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে প্রকৃত ঈদোৎসব।
ঈদ নিছক একটি উৎসবের নাম নয়, এটি মানবিক সংহতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক। যুগে যুগে এই পবিত্র উৎসব মানুষের অন্তরে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বীজ বপন করে এসেছে। ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নীচ কিংবা পেশাগত বিভাজনের সব কৃত্রিম প্রাচীর ভেঙে মানুষকে এক অভিন্ন কাতারে সমবেত করাই ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে দেখা যায়, সমাজের আর্থসামাজিক বৈষম্য অনেক সময় এই সার্বজনীন আনন্দকে আংশিক করে তোলে। তাই সমাজের সচ্ছল ও বিত্তবান মানুষের দায়িত্ব তাদের সম্পদে নিহিত দরিদ্র মানুষের ন্যায্য অধিকার যথাযথভাবে পরিশোধ করা।
ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা, যা ব্যক্তিগত কল্যাণের পাশাপাশি সমষ্টিগত কল্যাণের প্রতিও সমান গুরুত্বারোপ করে। মানবকল্যাণের এই চিরন্তন দর্শনই ঈদের উৎসবকে কেবল আনন্দোৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং এটিকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার এক কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এজন্যই ঈদের নামাজ আদায়ের পূর্বে জাকাত ও ফিতরা পরিশোধের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতর-এর অন্যতম তাৎপর্যই হলো সমাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে আনন্দের সমবণ্টন নিশ্চিত করা। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, বরং এটি দরিদ্র মানুষের বৈধ অধিকার। সচ্ছল মানুষের কর্তব্য হলো সমাজের অভাবগ্রস্ত মানুষদের অনুসন্ধান করা এবং তাদের সম্মান অক্ষুণ্ন রেখে প্রাপ্য অধিকার পৌঁছে দেওয়া। দরিদ্র মানুষ ধনীর দরজায় এসে ভিক্ষা করবে এমন অবমাননাকর পরিস্থিতি ইসলাম সমর্থন করে না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইসলামী ন্যায়বিচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন মহান সাহাবি উমর ইবন আল-খাত্তাব। তিনি খলিফা হওয়া সত্ত্বেও নিজ কাঁধে খাদ্য বহন করে ক্ষুধার্ত মানুষের দ্বারে পৌঁছে দিতেন। তাঁর এই মানবিক দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে সম্পদ ও ক্ষমতা মানুষের অহংকার বাড়ানোর জন্য নয়, বরং দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার জন্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের পরীক্ষা।
রমজানের সংযম, আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের দীর্ঘ সাধনার পর যখন ঈদের প্রভাত উদিত হয়, তখন তা মানুষের হৃদয়ে নতুন আশার সঞ্চার করে। ঈদ মানে অনাবিল আনন্দ, ঈদ মানে হৃদয়ের প্রসারতা। ধনী-গরিব, বড়-ছোট সব ভেদাভেদ ভুলে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মমত্ববোধের সেতুবন্ধন গড়ে তোলার এক অনন্য উপলক্ষ এই উৎসব।
কিন্তু আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, যাদের জীবনে ঈদের আনন্দ অনেক সময় অধরাই থেকে যায়। দারিদ্র্েযর কঠোর বাস্তবতায় তারা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলেছেন। কেউ দু’বেলা আহার জোগাতে ব্যর্থ, কেউ আবার ন্যূনতম প্রয়োজনীয় বস্ত্র কিংবা খাদ্য সংগ্রহ করতেও হিমশিম খান। তাদের এই বেদনাময় বাস্তবতা আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
দেশের নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ কিংবা পথের ধারে দেখা যায় অগণিত পথশিশু যারা অকালেই জীবনের কঠিন সংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত হয়ে পড়ে। অল্প বয়সেই তারা শ্রমের ভার কাঁধে তুলে নেয়, অথচ তাদের প্রাপ্য ছিল শিক্ষা, স্নেহ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ। ঈদের এই আনন্দঘন মুহূর্তে তাদের প্রতিও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে।
একইভাবে আমাদের আশপাশে এমন অনেক বৃদ্ধ, অসহায় ও কর্মহীন মানুষ রয়েছেন, যারা বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে জীবনের সংগ্রামে ক্লান্ত। তাদের প্রতি সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক কর্তব্য। কারণ সমাজের প্রতিটি মানুষই একই মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ।
সমাজে এমন অনেক বিত্তশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা ঈদ উদযাপনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। তাদের প্রতি বিনীত আহ্বান ঈদের আনন্দ যেন কেবল ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং সেই আনন্দের একটি অংশ যেন সমাজের অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে।
অতএব আসুন, আমরা প্রত্যেকে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই। ঈদের পূর্বেই তাদের ন্যায্য অধিকার পৌঁছে দিই। তবেই ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য বাস্তবায়িত হবে এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্য, ন্যায় ও মানবিকতার সুদৃঢ় ভিত্তি।
লেখক : সাংবাদিক।
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host