আইনশৃঙ্খলা সংকট: রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ -আবু তালহা

প্রকাশিত: ১২:৩১ অপরাহ্ণ, জুন ১৭, ২০২৬

আইনশৃঙ্খলা সংকট: রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ -আবু তালহা

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রধান সূচক। এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তার প্রভাব কেবল অপরাধের পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সামগ্রিক জনবিশ্বাসের উপরও গভীর ছাপ ফেলে। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।রাষ্ট্রের কার্যকারিতা ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এ কারণেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা রাষ্ট্রের জন্য কোনো সাধারণ প্রশাসনিক দায়িত্ব নয় এটি রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও দায়িত্বশীলদের সার্বক্ষণিক সতর্কতা, কার্যকর তদারকি এবং দ্রুত পদক্ষেপই পারে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে অপরাধ প্রতিরোধে সক্ষম পরিবেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অবকাঠামো, উন্নয়ন কিংবা অর্থনৈতিক সূচকে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা কার্যকর, তার অন্যতম বড় মানদণ্ড হলো সেখানে মানুষ কতটা নিরাপদ বোধ করে। নাগরিক যখন নিশ্চিন্তে ঘর থেকে বের হতে পারে এবং নিরাপদে ফিরে আসার বিশ্বাস ধরে রাখতে পারে, তখনই বলা যায় রাষ্ট্র তার অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব পালনে সফল হয়েছে।

পতিত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে মানুষের জান মালের নিরাপত্তা ছিলনা, বাকস্বাধীনতা ছিলোনা,খুন, গুম, জেল, জুলুম ছিলো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করলে দেশের মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশার জন্ম হয়। মানুষ চেয়েছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে বসবাস করতে। তারা প্রত্যাশা করেছিল, জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার আরও সুদৃঢ় হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক আইনের সমান সুরক্ষা পাবে। মূলত জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ভয় নয়, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাই হবে নাগরিক জীবনের প্রধান ভিত্তি।

কিন্তু এরই মধ্যে TIB (Transparency International Bangladesh) ৭ জুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। TIB-এর তথ্য অনুযায়ী সরকারের ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ১০২টি ধর্ষণ, ৪৯-৭১টি শিশু ধর্ষণ, ৯০টি ডাকাতি, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ৮ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে দেশে প্রায় সব ধরনের অপরাধ কমেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। অথচ ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের কয়েক মাসে ৪৬৪টি হত্যাকাণ্ড এবং ৬৬৬টি ধর্ষণ মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।প্রশ্ন হলো, এপ্রিল মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া এই তথ্য কি কোনোভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবিকে সমর্থন করে?
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে যে বিএনপি সরকারের দুই মাসে (মার্চ-এপ্রিল) ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের যে তথ্য TIB তুলে ধরেছে তা স্বাভাবিক।

কিন্তু যত পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণই দেওয়া হোক না কেন, মাত্র দুই মাসে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড কীভাবে স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে পারে এ প্রশ্নের উত্তর আজ জাতির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

টিআইবি ৭ জুন তাদের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছ তার পরবর্তী এই কয়েক দিনের সংবাদপত্রে প্রকাশিত আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে আরও উদ্বেগজনক একটি চিত্র সামনে আসে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদরদপ্তরের আশাবাদী বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্টতই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের তথ্য মতে ৭ জুন পরবর্তী রাজধানীর রমনায় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ককে ছুরিকাঘাতে হত্যা, যশোরের মনিরামপুরে নাতনিকে উত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, পাবনায় এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা উত্তেজিত জনতার আগুনে পুড়ে তিনজনের মৃত্যু, কক্সবাজারে ডাকাতির সময় মা ও মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, মেয়ের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়ে মায়ের দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়া এবং সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ, রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে পুলিশের দুই সদস্য আহত হওয়া, রাজধানীর রামপুরায় এক যুবককে গুলি করে হত্যা, সোনারগাঁওয়ে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ,রাউজানে প্রকাশ্যে যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা,জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাইম হাসান কে ডিবি তুলে নিয়ে থানায় পুলিশের নির্যাতন এসব ঘটনা কি কোনোভাবেই প্রমাণ করে যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে?বা এগুলো স্বাস্বাভাবিক ঘটনা?প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললে সংবাদমাধ্যমগুলোতে এরকম লোমহর্ষক ঘটনা প্রকাশিত হচ্ছে যা রীতিমতো দেশের জনগণকে আতংকিত করছে,এবং মানুষের প্রাণের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় তৈরী হচ্ছে।

বগুড়ার আদমদীঘিতে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হওয়া ছয় বছরের শিশু রাকিকা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অথচ সম্প্রতি রাজধানীর সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এমন রায়গুলো কেন অপরাধীদের নিরুৎসাহিত করতে পারছে না? এর একটি বড় কারণ হলো, রাষ্ট্র এখনো আইনের শাসন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়নি। রামিসা হত্যার মামলার রায় দ্রুত হয়েছে মূলত ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়ার কারণে। কিন্তু একই সময়ে সংঘটিত অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই নতুন অপরাধকে উৎসাহিত করছে এবং আমাদের আবারও রাকিকার মতো শিশুদের লাশ দেখতে হচ্ছে।

এদিকে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলোও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ৭ জুন মাইকিং করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ছাত্রদলের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। ১০ জুন কুমিল্লায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ১১ জুন বিএনপির ছয় নেতাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বেধড়ক পিটিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে পতিত আওয়ামী লীগের কোনো ভূমিকা বা যোগসাজশ রয়েছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন ছিল।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছেন। বিষয়টি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে প্রশ্নও উঠে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, জুলাইয়ের গণহত্যা ও সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারপ্রক্রিয়া আগে নিশ্চিত করা হবে। বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগেই রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি হলে তা আওয়ামী লীগের জন্য পুনরায় সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে এবং প্রতিশোধমূলক রাজনীতির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন কেবল সরকারি দাবি বা পরিসংখ্যানে প্রমাণিত হয় না,এর প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে নাগরিকের নিরাপত্তা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায়বিচারের কার্যকর বাস্তবায়নে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, রাষ্ট্রের সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তাই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে অপরাধ দমন, বিচার নিশ্চিতকরণ এবং আইনের সমান প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী।
সেক্রেটারী – জাস্টিস ফর জুলাই ইউকে
যুক্তরাজ্য

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর