প্রতিকূলতা জয় করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়: ওসমানীনগরে তরুণ উদ্যোক্তা সাদিকুজ্জামানের সংগ্রাম

প্রকাশিত: 10:55 PM, July 28, 2026

প্রতিকূলতা জয় করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়: ওসমানীনগরে তরুণ উদ্যোক্তা সাদিকুজ্জামানের সংগ্রাম

 

মোঃ আব্দুর রকিব আনু
​ওসমানীনগর (সিলেট) প্রতিনিধি:
শিক্ষিত তরুণদের চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানানো হলেও বাস্তবে এই পথ কতটা কঠিন, তার জলন্ত উদাহরণ সিলেটের ওসমানীনগরের তরুণ সাদিকুজ্জামান। পুঁজি সংকট, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর বাজারের অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে সফলতার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এই সংগ্রামী উদ্যোক্তা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ধাক্কা খাওয়ার পরও নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

ছোট পরিসরে হাঁস পালন করে ভালো অভিজ্ঞতা অর্জনের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বড় খামার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন সাদিকুজ্জামান। নিজের বাড়ির পাশে মোবারকপুর গ্রামে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা বিনিয়োগ করে গড়ে তোলেন ‘আমিরা ওসমান গ্রিন প্যারাডাইস’ নামের একটি খামার। ৫ হাজার ৬০০ হাঁস নিয়ে শুরু করা এই খামারটির মূল লক্ষ্য ছিল—নিজের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয়দের কর্মসংস্থান তৈরি এবং তরুণদের আধুনিক উপায়ে হাঁস পালনে অনুপ্রাণিত করা। প্রশিক্ষিত জনবল ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় শুরুতেই খামারটি বেশ সম্ভাবনার আলো দেখাতে শুরু করেছিল।

কিন্তু সেই সম্ভাবনায় বড় ধাক্কা দেয় প্রকৃতির বৈরী রূপ। গত জুন মাসে হাঁসগুলোকে প্রাকৃতিক খাদ্য দেওয়ার উদ্দেশ্যে বানাইয়ার হাওরে অস্থায়ী শেড তৈরি করা হয়। হঠাৎ তীব্র ঝড় ও খারাপ আবহাওয়ায় সেই শেডটি ধসে পড়ে। প্রবল বাতাস, প্রতিকূল পরিবেশ ও অতিরিক্ত পানির কারণে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ হাঁস মারা যায়। এই হঠাৎ বিপর্যয়ে আর্থিকভাবে বিশাল লোকসানের মুখে পড়েন এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সাদিকুজ্জামান।

বিপর্যয়ের পর স্থান পরিবর্তন করে বর্তমানে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের মংলাপুরে অস্থায়ী শেডে হাঁস নিয়ে অবস্থান করছেন তিনি। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চারজন নিয়মিত শ্রমিকের সহায়তায় প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁসগুলোর পরিচর্যা করা হচ্ছে। তবে প্রাকৃতিক খাবারের ওপর নির্ভর করলেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে অন্যান্য পরিচালনা ব্যয়।

সাদিকুজ্জামান জানান, বর্তমানে হাঁসের খাদ্য ও ওষুধের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় খামার পরিচালনা দুরুহ হয়ে পড়েছে। শুধু হাঁসের খাদ্যের পেছনেই প্রতিদিন দেড় হাজার টাকার বেশি (মাসে প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা) খরচ হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকদের মজুরি, চিকিৎসা ও পরিবহন খরচ।
​তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে খামারের প্রায় ১ হাজার ৫০০ হাঁস ডিম দেওয়া শুরু করেছে, যা তাকে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। বাজারদর ভালো থাকলে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলে ধীরে ধীরে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করছেন তিনি।

স্থানীয় খামারিদের মতে, হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ হাঁস পালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তবে দফায় দফায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাই ঝরে পড়ছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা পেলে এ খাতের ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব।
​এ বিষয়ে ওসমানীনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সুমন আহমদ জানান, “সাদিকুজ্জামানকে নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ভ্যাকসিন প্রদান করা হচ্ছে। আমরা সার্বিক খোঁজখবর রাখছি। হাঁসগুলো পুরোদমে ডিম দেওয়া শুরু করলে তিনি দ্রুতই এই ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে আশা করছি।”

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর