জলবায়ু প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও আইএমইডি

প্রকাশিত: ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ১১, ২০২৬

জলবায়ু প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও আইএমইডি

অর্থনীতি প্রতিবেদক:

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানির কার্যকর ব্যবহার এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বিত প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীরগতির মুখে পড়েছে। ‘ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট (সিএসএডব্লিউএম)’ নামের এই প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থায়নের দায়িত্ব আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের হলেও, নানামুখী প্রশাসনিক জটিলতায় এর মূল লক্ষ্য পূরণ এখন শঙ্কার মুখে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাম্প্রতিক এক খসড়া সমীক্ষা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও অডিট আপত্তি: আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ১৮২ কোটি টাকার এই প্রকল্পটির মেয়াদ চলতি মাসেই (৩০ জুন) শেষ হতে চললেও এর বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৮.৫৬ শতাংশ এবং এখন পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ২০৩ কোটি টাকা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ অংশ ৮৫০ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পের সেবা ক্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ ‘প্যাকেজ-১’ (কনসালটেন্সি সার্ভিস ফর ডিজাইন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন)-এর দরপত্র আহ্বান ও পরামর্শক নিয়োগ অনুমোদন পেতেই প্রায় ২ বছর ৫ মাস সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে।

পরামর্শক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের শুরুতে অন্য কোনো প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ দরপত্র ২০২৪ ও ২০২৫ সালের দিকে আহ্বান করতে হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পটিতে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারি ক্রয় বিধিমালার ব্যত্যয় ও অনুমোদনহীন ব্যয়সহ মোট ১৪টি অডিট আপত্তি উঠেছে, যার একটিরও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

আইএমইডির সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণ: আইএমইডির খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেবা প্যাকেজ-৩ এর আওতায় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী ২০২২ সালের মার্চে চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও ক্রয় বিশেষজ্ঞ বা প্রকিউরমেন্ট এক্সপার্ট নিয়োগ দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। অর্থাৎ, গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের আগেই প্রকল্পের এক বছর সময় পার হয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতে যেকোনো বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অনুমোদনের প্রথম ৯০ দিনের মধ্যে প্রকিউরমেন্ট এক্সপার্ট নিয়োগ এবং সমান্তরাল কার্যপদ্ধতি নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে আইএমইডি। যদিও বিশ্বব্যাংকের সাথে ঋণচুক্তি ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে, তবে বর্তমান ধীরগতির কারণে ঋণের পূর্ণ ও কার্যকর ব্যবহার ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য: এই জটিলতার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, উন্নয়ন সহযোগীদের ঢালাওভাবে দোষারোপ করার আগে ভেতরের প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি মনে করেন, সম্ভবত বিশ্বব্যাংকের নির্দিষ্ট প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন অনুযায়ী মন্ত্রণালয় পরামর্শক নিয়োগ না করায় এই অমতের সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাংক প্রতিটি প্রকল্পের কান্ট্রি ডিরেক্টর ও টাস্ক টিম লিডার পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং ও দ্বিমুখী জবাবদিহি নিশ্চিত করে। তাই কেন এই চিঠি চালাচালিতে এত সময় লেগেছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রকল্পের পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা: পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং মৎস্য অধিদপ্তর যৌথভাবে প্রকল্পটি দেশের ৮টি বিভাগের ১৭টি জেলার ২৮টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাপাউবোর সমাপ্ত করা বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং আধুনিকীকরণ করা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও পণ্য ও কার্যের বেশ কিছু প্যাকেজের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তবে মূল কার্যক্রমের মধ্যে ইনলেট/আউটলেট পুনর্বাসন, পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণ, নদী ড্রেজিং এবং বাঁধ পুনর্বাসনের কাজ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংলগ্ন এলাকায় জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটি ও জায়গার স্বল্পতার কারণে মাঠপর্যায়ে নির্মাণকাজ বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আইএমইডি আগামী ৩০ জুনের মধ্যে এই সমীক্ষা প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর