ভূমিধসে নিখোঁজ দেড় হাজার, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত ৪৩০ মেগাওয়াট
নেপালে প্রকৃতির ভয়াল রুদ্ররূপে ৩৫৯ প্রাণহানি

প্রকাশিত: 5:43 PM, August 28, 2026

<span style='color:#077D05;font-size:19px;'>ভূমিধসে নিখোঁজ দেড় হাজার, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত ৪৩০ মেগাওয়াট</span> <br/> নেপালে প্রকৃতির ভয়াল রুদ্ররূপে ৩৫৯ প্রাণহানি

বিজয়ের কন্ঠ ডেস্কঃ

প্রকৃতির ভয়ংকর রুদ্ররূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে হিমালয়কন্যা নেপাল। টানা ভারী বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫৯ জনে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। ফলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাটিচাপা ঘরবাড়ি ও নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে দুর্গত এলাকায় চলছে হৃদয়বিদারক আহাজারি। রয়টার্সের খবরে নেপালের পর্যটন কর্মকর্তা ও পুলিশ জানিয়েছে, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৮০০ জনের বেশি বিদেশি পর্যটক। নেপাল সরকারের তথ্যমতে, নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ১৭৮ জন ভারতীয়, ১২৭ জন নেপালি, ৬৫ জন মার্কিন নাগরিক এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন নাগরিক। এ ছাড়া বহু সেনা ও পুলিশ সদস্যেরও এখন পর্যন্ত কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বুধবারের আকস্মিক এই দুর্যোগে পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা, পাথর ও পানির প্রবল স্রোত ছিল অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো। এত দ্রুতগতির এই ঢল আগে থেকে অনুমান করা প্রায় অসম্ভব এবং দৌড়ে কিংবা গাড়িতে পালিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রাণ বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নেপালে অন্তত ৫৪ জন মার্কিন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। রাসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যায় প্রাণ হারানোদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে দেশটি। পাশাপাশি নেপালের দুর্গত মানুষের জন্য ৫ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অর্থ জরুরি আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও ত্রাণসামগ্রী সরবরাহে ব্যয় করা হবে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। একই ঘটনায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ১০৫ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যাঁদের মধ্যে কলকাতার বাসিন্দা ৩২ জন। নিখোঁজদের তালিকায় ২৮ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। নেপাল পুলিশের প্রকাশিত বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেছে, নদীর প্রবল স্রোতে মুহূর্তেই ভেসে যাচ্ছে বাড়িঘর ও স্থাপনা। বার্তা সংস্থা এএফপির একটি ছবিতে দেখা যায়, কাদামাটির বিশাল স্তূপের নিচে চাপা পড়া একটি বাড়ির শুধু উপরের অংশ দৃশ্যমান রয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই দুর্যোগে জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নেপাল সেনাবাহিনী দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার ও বিশেষ দুর্যোগ মোকাবিলা দল মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। হড়পা বানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলা। তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নুয়াকোট ও ধারিং জেলাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে নেপাল সীমান্ত লাগোয়া তিব্বতের স্থলবন্দর জিরঙ এলাকাতেও কাদামাটির ঢলে বিপর্যয় ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নেপালের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম আশঙ্কা করছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও দীর্ঘ হতে পারে। কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরের রাসুয়া জেলায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। তিব্বত থেকে নেপালে প্রবেশ করা ভোটেকোশী নদী এ জেলার মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার কিছু সময় পর আচমকা নদীর পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসনের ধারণা, তিব্বতের দিক থেকে প্রবল বন্যার পানি প্রবেশ করে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তিমুরে ও স্যাব্রুবেসী এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। রাসুয়ার জেলাশাসক নগেন্দ্র পারিয়ার রয়টার্সকে জানিয়েছেন, জেলার বেশ কয়েকটি গ্রামীণ এলাকা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভেসে গেছে। তাঁর আশঙ্কা, ব্যাপক সম্পদহানি ও প্রাণহানির প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে। বুধবার নেপালের পার্লামেন্টে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খনাল জানান, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে একটি ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর তুষারধস ঘটে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই নেমে আসে ভয়াবহ হড়পা বান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ওই সময় নেপাল-তিব্বত সীমান্তে কোনো ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেনি। যেটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূকম্পন মনে করা হয়েছিল, সেটি মূলত একটি হিমবাহধস এবং এর ফলে সৃষ্ট কাদা-পাথরের প্রবল স্রোত। ভূবিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তুষারধসের কারণে পাথর ও বরফের স্তূপ নদীর গতিপথ বন্ধ করে দেয়। পরে জমে থাকা বিপুল পানির চাপে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ হঠাৎ ভেঙে গেলে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ হড়পা বান। এই দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ‘পৃথিবীর ছাদ’খ্যাত হিমালয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে পরিবেশগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে তাঁদের মত। কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) প্রাথমিক মূল্যায়নে সীমান্তের চীনা অংশে কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির রিমোট সেন্সিং ও ভূবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠ এএফপিকে বলেন, তাঁদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী নেপাল অংশে একটি পাথুরে বরফধসের ঘটনা ঘটে। এতে লেন্দে নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। ঘটনার আগে ওই অঞ্চল ও আশপাশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি, যা গবেষকদের বিস্মিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটি সান আন্তোনিওর জলবিজ্ঞানী হাতিম শরিফ বলেন, এ ধরনের ঘটনা বিশ্বের প্রায় সব কার্যকর বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থাকেও অকার্যকর করে দিতে পারে। তাঁর ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু ঘটে যায়। দৌড়ে কিংবা গাড়িতে পালানোর সুযোগও অনেক সময় থাকে না, কারণ কাদা ও পানির দ্রুতগতির ঢল অত্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে এবং তা অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো আচরণ করে। হাতিম শরিফের মতে, এ ধরনের আকস্মিক ঢল থেকে প্রাণ বাঁচাতে পারলে দ্রুত পাহাড়ের উঁচু স্থানে উঠে যাওয়া সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী, অন্তত ২০ ফুট উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডরোথি হাইনরিচ বলেন, নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক নদী অত্যন্ত সংকীর্ণ। তুষারধস বা ভূমিধসের কারণে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি জমে যায়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে মুহূর্তেই সৃষ্টি হতে পারে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, যার ধ্বংসক্ষমতা অত্যন্ত বেশি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর