ঢাকা |
প্রকাশিত: 1:31 PM, August 29, 2026
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিপ্লব, অর্ধলক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখিয়ে সিলেটে যাত্রা শুরু করেছিল ‘হাইটেক পার্ক’। তবে ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা সেই মেগা প্রকল্প এখন অনেকটাই স্থবির। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গ্যাস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই কার্যক্রম শুরু করতে পারেননি।
১৮টি প্রতিষ্ঠানকে জমি ও স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু করেছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্ণি এলাকায় ১৬২ দশমিক ৮৩ একর জায়গাজুড়ে হাইটেক পার্কটি গড়ে তোলা হয়েছে। মাটিভরাট থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ৩৩৬ কোটি টাকা। ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়।
হাইটেক পার্কে বিভিন্ন ধরনের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি গ্রাফিক্স ডিজাইন, অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল অপারেশন, জাভা এসই-৮ প্রোগ্রামিং, ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট, নেটওয়ার্ক অ্যান্ড সার্ভার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, কোর হার্ডওয়্যার অ্যান্ড অপারেটিং সিস্টেম, বিপিও, ই-কমার্স, এসকিউএল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও ওরাকলসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়।
আগামীর প্রযুক্তিবিদ তৈরির লক্ষ্যে প্রকল্পটিতে একটি আইটি সেন্টারসহ দুটি প্রশিক্ষণ সেন্টার স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী হাইটেক পার্কটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে অর্ধলক্ষাধিক দক্ষ ও অদক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি পার্কে উৎপাদিত পণ্য ও সেবা দেশের বাজারের পাশাপাশি সিলেট সীমান্তসংলগ্ন ভারতের ‘সেভেন সিস্টার’ রাজ্যগুলোতে রপ্তানির প্রত্যাশাও ছিল।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে পার্কে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে ৭১ দশমিক ৩৯৯ একর জমি এবং ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ১৪ হাজার ৭৬০ বর্গফুট স্পেস ৪০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। তবে বরাদ্দ পাওয়ার পরও বিভিন্ন সমস্যায় অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ থেকে সরে দাঁড়ায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেকে ব্যাংকঋণ না পাওয়ায় প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারেননি। আবার গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা না থাকায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে।
এর মধ্যে নোহা অ্যান্ড সোহান এন্টারপ্রাইজ পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ নিয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকঋণ না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি চুক্তি বাতিল করে। একই কারণে সিমেড লিমিটেডও তাদের বরাদ্দ পাওয়া জমি ছেড়ে দিয়েছে।
এদিকে প্রকল্পটি সচল করতে সরকারিভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকল্পটি স্থগিত বা বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে বরাদ্দ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর প্রকল্পটির অগ্রগতি ও অর্থায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ সরকারকে পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার হাইটেক পার্কগুলোকে কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে কবে নাগাদ বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
হাইটেক পার্কের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মোরশেদুল আলম বলেন, প্রকল্পের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা ছিল। সিলেটে দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা কম—এমন ধারণা থেকে বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখন পর্যন্ত হাইটেক পার্কে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীরা তাদের শিল্পকারখানা স্থাপনে পিছিয়ে গেছেন।’
বর্তমানে র্যাংগস গ্রুপ তাদের ফ্রিজ ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট চালু করেছে। তবে গ্যাসের অভাবে প্রতিষ্ঠানটির অন্য ইউনিটগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করে কারখানা পরিচালনা করা বেশ ব্যয়বহুল বলেও জানান তিনি।
মোরশেদুল আলম আরও বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কয়েকবার বৈঠক হয়েছে। তারা গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা চাচ্ছেন। কিন্তু আমরা তা দিতে পারছি না। অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা সিলেট হাইটেক পার্কে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু পেট্রোবাংলা সেটি আটকে দেয়।’
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব হলে বিনিয়োগকারীরা আবারও পার্কে ফিরতে পারেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত হাইটেক পার্কটি ঘিরে যে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে তা এখনো বাস্তব রূপ পায়নি। ফলে প্রকল্পটি কবে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সম্পাদক : জে.এ কাজল খান
স্বত্ত্ব: দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ (প্রিন্ট ভার্সন)
০১৭১৮৩২৩২৩৯
Design and developed by Yellow Host