২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, নতুন ১১৮ সন্দেহজনক রোগী; ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৮২
সিলেটে হামের ভয়াবহতা অব্যাহত, বাড়ছে ডেঙ্গুর শঙ্কাও

প্রকাশিত: 1:22 PM, August 29, 2026

<span style='color:#077D05;font-size:19px;'>২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, নতুন ১১৮ সন্দেহজনক রোগী; ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৮২</span> <br/> সিলেটে হামের ভয়াবহতা অব্যাহত, বাড়ছে ডেঙ্গুর শঙ্কাও

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

সিলেটে হামের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। প্রতিদিনই নতুন করে সন্দেহজনক হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, একই সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫১ জনে।

একই সময়ে নতুন করে ১১৮ জন সন্দেহজনক হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩৩৬ জন। আক্রান্ত ও মৃতদের বড় অংশই শিশু।

হামের এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেই সিলেটে ডেঙ্গুর সংক্রমণও অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও একজন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ফলে চলতি বছরে বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮২ জনে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছিলেন সাতজন। একই সময়ে দুই সংক্রামক রোগের চাপ সিলেটের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুল আলম।

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১১৮ জন সন্দেহজনক হাম রোগীর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৫৯ জন, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬০ জন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ৯ জন ভর্তি হয়েছেন।

বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৩৩৬ জনের মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৪০ জন, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১০ জন, রাজীব রাবেয়া মেডিকেল হাসপাতালে ১১ জন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে চারজন, পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৪ জন, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন, জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ২০ জন, জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে আটজন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া তিন শিশুর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে দুজন এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন মারা গেছেন।

শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে মারা যাওয়া ৫ মাস বয়সী উদ্ভব বিশ্বাস সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার এবং ১১ মাস বয়সী হুমায়রা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বাসিন্দা। অন্যদিকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া ৯ মাস বয়সী শিশু আদিল সিলেটের টুকেরবাজারের বাসিন্দা।

জেলাভিত্তিক হিসাবে এখন পর্যন্ত সিলেটে ৫৯ জন, হবিগঞ্জে ২০ জন, মৌলভীবাজারে ১৩ জন এবং সুনামগঞ্জে ৫৯ জন মারা গেছেন। মৃত ১৫১ জনের মধ্যে ১৪১ জন সন্দেহজনক হাম বা হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। বাকি ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হাম রোগে।

স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কোনো নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে নিশ্চিত রোগীর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সন্দেহজনক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।

স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসার অন্যতম কারণ শিশুদের টিকাদানে অনীহা।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন উদ্যোগের পরও সিলেটে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। বরং আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এর প্রধান কারণ শিশুদের ভ্যাকসিন না নেওয়া।

তিনি বলেন, এখনো অনেক অভিভাবক শিশুদের হামের ভ্যাকসিন দিতে আগ্রহী নন। এমনকি সিসিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়েও অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ভ্যাকসিন দিতে পারছেন না।

ডা. জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশই ভ্যাকসিন নেয়নি। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। হামের প্রকোপ বাড়ায় শিশুদের পাশাপাশি বয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ঝুঁকি বেশি।

হামের পাশাপাশি সিলেটে ডেঙ্গু সংক্রমণও অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও একজন শনাক্ত হওয়ায় চলতি বছরে বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮২ জনে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছিলেন সাতজন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ১৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, আক্রান্তদের মধ্যে সিলেটে ৩৭ জন, সুনামগঞ্জে ৩৭ জন, হবিগঞ্জে ৮১ জন, মৌলভীবাজারে ২০ জন এবং অন্যান্য জেলা থেকে আসা ছয়জন রয়েছেন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যু হয়েছে।

বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নয়জন, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে দুজন, লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজন, মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে একজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, সিলেটে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ে। সেই হিসাবে সিলেটেও আগামী মাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে পারে।

তিনি জানান, আক্রান্ত অনেকেরই ভ্রমণের ইতিহাস রয়েছে। পরিবারের কোনো একজনের ভ্রমণের ইতিহাস থাকায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর অন্য সদস্যরাও স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিসিকের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় সিলেটে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি কিছুটা কমেছে। চলতি মৌসুমে নগরীর ১৯ হাজার ৫০০ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৯৯০টি বাড়িতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে, যা প্রায় ৫ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৬ শতাংশের বেশি।

তিনি বলেন, এডিস মশা নিধনে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।

হামের মৃত্যুর ঘটনা এবং হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ডেঙ্গুর সংক্রমণও অব্যাহত থাকায় সিলেটের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া এবং হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সময়ে দুটি সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ ২৪ খবর